বেসরকারি বিনিয়োগ

কর্ণফুলী ড্রাইডক জেটি হতে পারে মডেল

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:১৬ এএম

চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়নে বেসরকারি বিনিয়োগের মডেল হতে যাচ্ছে কর্ণফুলী ড্রাইডক জেটি। চট্টগ্রাম বন্দরে যখন জাহাজের জট দেখা দেয়, তখন এই কর্ণফুলী ড্রাইডকের জেটিতে জাহাজ ভেড়ানোর সংখ্যা বেড়ে যায়। আগামীতে এই জেটি আরও আধুনিকায়ন হতে যাচ্ছে এবং বাল্ক জাহাজের পাশাপাশি কনটেইনার জাহাজ থেকেও পণ্য ওঠা-নামানোর পরিমাণ বাড়বে। সবচেয়ে বড় বিষয়, কর্ণফুলীর মোহনায় হওয়ায় এখানে নদীর গভীরতা বেশি, প্রায় সাড়ে ১১ মিটার ড্রাফটের (পানির নিচে জাহাজের গভীরতা) জাহাজ ভিড়তে পারবে এই জেটিতে।

চট্টগ্রাম বন্দরে যেখানে ১০ মিটার ড্রাফট ও ১৯০ মিটার দৈর্ঘ্যরে জাহাজ ভিড়ে, সেখানে কর্ণফুলী জেটিতে যেকোনো দৈর্ঘ্যরে প্রায় ১১ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়লে বেশি পণ্য নিয়ে ভিড়তে পারবে। এতে পণ্যের খরচও কমে আসবে। এ বিষয়ে কর্ণফুলী ড্রাইডকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার আবদুর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে বর্তমানে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ কনটেইনার নিয়ে একটি জাহাজ ভিড়তে পারে। কিন্তু আমাদের এই জেটিতে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কনটেইনার নিয়ে বড় জাহাজগুলো ভিড়তে পারবে। এতে জাহাজের ভাড়া কমে আসবে এবং ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন।

তিনি আরও বলেন, আমাদের জেটির ড্রাফট বেশি হওয়ায় মাদারভেসেলগুলো (বড় জাহাজ) সরাসরি আমাদের জেটিতে ভিড়তে পারবে। এতে লাইটারিং (ছোট জাহাজ দিয়ে পণ্য খালাস) করতে হবে না। ফলে পণ্য পরিবহনের খরচ কমে আসবে।

বেসরকারি বিনিয়োগে নির্মিত এই জেটি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমোডর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ বলেন, ‘বন্দরে বেসরকারি বিনিয়োগ যত বাড়বে, বন্দরের প্রবৃদ্ধি তত বাড়বে। একইসঙ্গে কর্ণফুলী ড্রাইডকের ইয়ার্ডে যদি বেশি জাহাজ ভেড়ার সুযোগ পায় এর সুবিধা তো চট্টগ্রাম বন্দরই পাবে।’

বেসরকারি এই জেটিতে প্রথম জাহাজ ভেড়ানো হয় ২০২১ সালের ৩০ মার্চ। পানামা পতাকাবাহী দিনা ওশেন নামের জাহাজটি ১৫ হাজার ২২১ টন স্ক্র্যাপ নিয়ে জেটিতে ভিড়ে। এর পরদিন থেকেই জেটিতে পণ্য খালাস শুরু হয়। সাড়ে ৯ মিটার ড্রাফটের (পানির নিচের অংশ) জাহাজটি ১৫৪ ফুট লম্বা। ইস্পাত তৈরির দেশীয় প্রতিষ্ঠান বিএসআরএমের স্ক্র্যাপ নিয়ে জাপানের চিবা বন্দর থেকে ছেড়ে আসা জাহাজটি ওই বছরের ২৩ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে প্রবেশ করে। এরপর থেকেই বেসরকারি এই জেটিতে জাহাজ ভেড়ানো ও পণ্য খালাস কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

কর্ণফুলী নদীর বাম তীরে আনোয়ারা উপজেলার বদলপুরা মৌজায়, সাগরের মোহনা থেকে ২ কিলোমিটার উজানে ব্যক্তি মালিকানাধীন এই ড্রাইডক তৈরি করা হয়। এখানে ১৪০ ও ১০০ মিটার দীর্ঘ দুইটি জেটিতে জাহাজের পণ্য খালাস কার্যক্রম চলমান। পুরোপুরি নির্মাণকাজ শেষ হলে এখানকার জেটির দৈর্ঘ্য হবে ৫৭০ মিটার, যেখানে একসঙ্গে তিনটি মাদার ভেসেল ভিড়তে পারবে। এই জেটি দিয়ে বিভিন্ন ইস্পাত তৈরি কারখানার স্ক্র্যাপ, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে ব্যবহৃত পাথর ও বিভিন্ন পণ্যবাহী কনটেইনার খালাস করতে সক্ষম হয়েছে। এ ছাড়া জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতের জন্য ১৬ মিটার গভীর ও ৩০৫ মিটার দৈর্ঘ্যরে একটি ড্রাই ডক তৈরি করা হয়েছে। যেখানে ২৬০ মিটার দৈর্ঘ্যরে জাহাজ ঢুকতে পারবে। তবে ড্রাইডকটি এখনো চালু করা হয়নি। এই ড্রাইডকের জন্য ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

বেসরকারি এই ইয়ার্ডটি পুরোদমে চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের আমূল পরিবর্তন হবে। এই পরিবর্তনের অর্থনৈতিক প্রভাব বহুমাত্রিক। প্রথমত, আমদানি ও রপ্তানির কার্যকারিতা বাড়লে ব্যবসায়ীরা কাঁচামাল ও উপকরণ সময় মতো পেয়ে উৎপাদন ও রপ্তানি শিডিউল মেনে চলতে পারবে। এর ফলে উৎপাদন খরচ কমে আসবে এবং ভোক্তা বাজারে স্থিতিশীল থাকবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক অর্ডার সময় মতো সরবরাহের ফলে বাংলাদেশি পণ্য বিশ^বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে এবং তাতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বাড়বে। তৃতীয়ত,পুরো বাণিজ্যিক চেইনের গতি ত্বরান্বিত হবে, যা শিল্প উৎপাদন চক্রকে সমর্থন করে এবং অর্থনীতিতে সামগ্রিক গতিশীলতা আনবে। বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যিক মানচিত্রে নতুন উচ্চতায় তুলে ধরবে বলে ব্যবসায়ীদের ধারণা।

এদিকে, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দেশের প্রথম টানেলটি ২০২৩ সালের অক্টোবরে চালু হওয়ার পর থেকেই লোকসান গুণছে। সেক্ষেত্রে কর্ণফুলী ড্রাইডকের জেটিগুলো পুরোদমে চালু হলে টানেলের লোকসান এড়িয়ে লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। এরই মধ্যে বেসরকারি পর্যায়ের এই জেটিতে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পণ্য খালাস শুরু হয়েছে, যা কর্ণফুলী টানেল দিয়ে চট্টগ্রাম শহর হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরাসরি পরিবহন করা হচ্ছে। এ কারণে টানেলের আয় আগের তুলনায় অনেকগুণ বেড়েছে। এই ড্রাইডকের সবগুলো জেটি চালু হলে টানেলের দৈনিক আয় লোকসান ছাড়িয়ে লাভের ধারায় ফেরার আশা রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত