জাতীয় প্রবাসী দিবস আজ

শ্রমবাজারে দালালদের দৌরাত্ম্য ঘুচবে কবে?

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ১১:২২ এএম

আন্তর্জাতিক অভিবাসী ও জাতীয় প্রবাসী দিবস আজ। দিবসটি উপলক্ষ্যে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘প্রবাসীর অধিকার, আমাদের অঙ্গীকার। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ, আমাদের সবার।’ তবে দিনটি সম্পর্কে কতটুকু জানেন বিদেশগামী কর্মীরা। আজ বুধবার (১৮ ডিসেম্বর) প্রায় ৫০ জন বিদেশগামী কর্মীর সঙ্গে দিবসটি সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা কিছুই বলতে পারেননি। বরং আজকের দিনেও তাদের নানা ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে।

ঝিনাইদহের জিয়ারুল ইসলাম ও আতাউর রহমান কাতারের মেডিকেল করার জন্য ঢাকায় এসেছেন। আজ তাদের মেডিকেল হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলামোটরের কাতার ভিসা সেন্টারে এসে জানতে পেরেছেন তাদের মেডিকেল কাগজটি ভুয়া। দালাল এই দুইজনের কাছ  েথকে ৪ লাখ টাকা নিলেও মেডিকেল কাগজটি ফটোকপি করে দিয়েছেন। পড়াশোনা না থাকায় এই দুই ভুক্তভোগী বিষয়টি বুঝতে পারেননি। ফলে এখন বিপাকে পড়েছেন।

ভুক্তভোগী মো. জিয়ারুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্থানীয় দালাল কাতারে পাঠানোর কথা বলে আমার কাছ থেকে দুই লাখ টাকা নিয়েছে। কয়েকদিন আগে একটি কাগজ দিয়ে আমাদের মেডিকেল করার জন্য ঢাকায় পাঠিয়েছে। আজ আমরা মেডিকেল করার জন্য বাংলামোটরে আসি। এখানে এসে জানতে পারি আমাদের যে কাগজটি দেওয়া হয়েছে সেটি ভুয়া। বিষয়টি জানার পর দালালকে ফোন দিলে তিনি রিসিভ করেননি। এখন আমরা কী করবো কিছুই বুঝতে পারছি না। আমাদের কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ অঞ্চলে এরকম দালালের সংখ্যা অনেক।’

জানা গেছে, দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের ভূমিকা অনেক। নিজের ভাগ্য বদলের পাশাপাশি প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে। তবে দেশের স্বার্থে তাদের ভূমিকা থাকলেও এই প্রবাসীদের ভোগান্তির শেষ নেই। সেটি যাওয়া প্রক্রিয়া থেকে ফেরত আসা পর্যন্ত সবখানেই তাদের ভোগান্তি। দালালদের দৌরাত্ম্য এই খাতকে নানাভাবে প্রভাবিত করছে। হাজার হাজার বিদেশগামী শুধুমাত্র দালালদের কারণেই বিদেশে যেতে পারেন না। বিদেশে যাওয়ার বদলে তাদের দালালদের পিছনে টাকার জন্য ছুটতে হয়। এই ভোগান্তির নিয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় নানা উদ্যোগ নিলেও সেগুলো তেমন কার্যকরী হয় না। বরং যতই দিন যাচ্ছে ততই এই খাতে দালালদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে।

অভিবাসন খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নানা সিন্ডিকেট ও দালালদের কারণে বিশ্বশ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কারণ ভিসা জালিয়াতিসহ নানা উপায়ে বিদেশগামীদের সঙ্গে প্রতারণা করে দালালরা। বিশেষ করে সৌদি আরবের শ্রমবাজার ঘিরে বিষয়টি বেশি হচ্ছে। আর সিন্ডিকেটের কারণে মালয়েশিয়া শ্রমবাজার তো এখন বন্ধই। তাই বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও দালালমুক্ত হওয়া প্রয়োজন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রবাসীদের অধিকার আদায়ে নানা পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। তবে মূল সমস্যা রয়েই গেছে। তাই সবার আগে প্রয়োজন এই খাত দালালমুক্ত করা।’

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) আর্থ-সামাজিক ও জনমিতিক জরিপ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিদেশে যাওয়া ব্যক্তিদের ৫২.০৩ শতাংশ দালালকে টাকা দিয়েছেন। এই হার শহরাঞ্চলের (৪৮.২৫ শতাংশ) তুলনায় গ্রামাঞ্চলে (৫৩.১০ শতাংশ) বেশি। রংপুর ছাড়া বেশির ভাগ বিভাগে অভিবাসন খরচের জন্য দালালদের ওপর ব্যাপক নির্ভর করতে হয়।

এদিকে ভোগান্তি কমাতে নানা উদ্যোগ নেওয়ার পরও সরকারিভাবে খুব বেশি মানুষ বিদেশে যাচ্ছেন না। সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গেছেন মাত্র ৩.০৪ শতাংশ মানুষ। আর দালালের বাইরে বেসরকারি কোম্পানি বা এজেন্সিগুলোকে টাকা দিয়ে বিদেশে গেছে ৪২.০৯ শতাংশ। অন্যান্যভাবে বিদেশ গেছে ২.৮০ শতাংশ।

জরিপ অনুযায়ী, বিদেশ গমনে সবচেয়ে বেশি দালালনির্ভর সিলেট বিভাগের মানুষ। বিভাগটির ৫৮.৫৩ শতাংশ মানুষ বিদেশে গেছেন দালালের মাধ্যমে। এর পরই ময়মনসিংহ (৫৭.৪৪ শতাংশ) বিভাগের অবস্থান। শুধু বরিশাল (২৮.৮২ শতাংশ) ও খুলনা বিভাগে (৪৫.৩৮) এই হার ৫০ শতাংশের কম।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিবাসনের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় সমস্যা। শ্রম অভিবাসন প্রক্রিয়ায় মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালদের সম্পৃক্ততা দরিদ্র কর্মীদের খরচ বাড়িয়ে দেয়। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ‘সাধারণত আমাদের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো ঢাকানির্ভর। এ কারণে গ্রামাঞ্চলের কোনো মানুষ যখন চিন্তা করে বিদেশ যাবে, তখন কোন দেশে যাবে, চাহিদা কেমন, কী কাজ করবে—এসব বিষয়ে সেবা দেওয়ার কেউ থাকে না। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মধ্যস্বত্বভোগী গড়ে উঠেছে। শুধু যে দেশে তা নয়, বিদেশ থেকে আনার ক্ষেত্রেও মধ্যস্বত্বভোগী গড়ে উঠেছে। এদের কারণে বাংলাদেশ থেকে বিদেশ যাওয়ার খরচ সবচেয়ে বেশি এবং আয় সবচেয়ে কম। এ সমস্যা সমাধানে সবচেয়ে জরুরি সচেতনতা।’ 

বিবিএসের তথ্যে দেখা যায়, ৫৮.২৪ শতাংশ মানুষ বিদেশ যেতে ঋণের ওপর নির্ভর করেন। শহরের ৫১.৮৩ শতাংশ ও গ্রামের ৬০.০৭ শতাংশ মানুষ ঋণ নিয়েছেন। নারীদের (৩৭.৯৮ শতাংশ) তুলনায় পুরুষরা (৫৮.৭৪ শতাংশ) বেশি ঋণ নেন।
যুক্তরাজ্য ও কানাডা বাদে বেশির ভাগ দেশে বাংলাদেশি অভিবাসীরা শ্রমিক হিসেবে গেছেন। শ্রমিক হিসেবে মালদ্বীপে ৯৮.০৫ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৯৬.৮৬ শতাংশ ও সৌদি আরবে ৯৪.৫৭ শতাংশ গেছেন। কারণ এই দেশগুলোতে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা বেশি। এসব দেশে পুরুষ বেশি গেছেন। নারী বেশি গেছেন কুয়েতে, ৭২.৩৮ শতাংশ। এরপর ওমানে ৫৫.২২ শতাংশ ও সৌদি আরবে ৫০.৬৭ শতাংশ নারী গেছেন। 


এদিকে বিদেশে যাওয়ার পাশাপাশি স্থায়ীভাবে ফেরতও আসছেন অনেকে। সবচেয়ে বেশি ফেরত এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকে ৩৮.৩৭ শতাংশ, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ১৪.০২ ও মালয়েশিয়া থেকে ১৩.১৫ শতাংশ দেশে ফেরত এসেছেন। সবচেয়ে বেশি ফেরত এসেছেন চট্টগ্রামের মানুষ।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত