‘কম্বল পাঠানোর কথা ছিল এখন বাবাই আসছে লাশ হয়ে’

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৭:২৬ পিএম

শীতের সকাল বাড়ির উঠানে মানুষের জটলা। কেউ মাটিতে কেউ ভাঙা চেয়ারে বসে। সবাই আফসোস করছে আর পরিবারের সদস্যদের শান্ত্বনা দিচ্ছে। অন্যদিকে বাড়ির এক কোণে শিশু নাসিমা আক্তার মাছুমা চুপচাপ বসে আছে। তিনি বলছিলেন এ শীতে বাবা আমার ও দাদীর জন্য কম্বল পাঠাবে। কিন্তু এখন আমরা কম্বলের কথা ভুলে বাবার লাশের জন্য অপেক্ষা করছি।

এ দিকে গত সোমবার সৌদি আরবের আম্বারিয়া শহরে বাংলাদেশী দুই শ্রমিক শোবার কক্ষে রুম হিটারের ধুয়ায় অক্সিজেন আটকে দম বন্ধ হয়ে মারা যায়।

নিহত দুই প্রবাসী হলেন- মাসুম আহাম্মেদ (৩৫) ও মাকসুদুল হোসেন (২৫)। তারা দুজনই গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গোসিংগা ইউনিয়নের পটকা ও গোসিংগা ফকিরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। মাকসুদুল হোসেন প্রায় ৩ বছর ধরে প্রবাস জীবনে আছেন। অপর দিকে মাসুম আহাম্মেদ সাত মাস হয়েছে সৌদি আরবে গেছেন। সৌদিতে তারা দুজন একই রুমে থাকতেন। একই এলাকার মানুষ হওয়ার বন্ধুত্বও গড়ে উঠে।

নিহত মাসুম আহাম্মেদ পটাকা গ্রামের মৃত শাহজাহান মিয়ার ছেলে। অপরদিকে গোসিংগা ফকিরপাড়া গ্রামের মোকলেছুর রহমানের ছেলে মাকসুদুল হোসেন।  

নিহত প্রবাসী মাসুম আহাম্মেদের বড় মেয়ে শিশু নাসিমা আক্তার মাছুমা। তিনি স্থানীয় একটি স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়েন। তিনি বলেন, প্রতিদিন রাতে কাজ শেষ করে  বাবা সবার সাথে ফোনে কথা বলতেন। মৃত্যুর আগের দিনও কথা হয়েছে। বাবা এ শীতে আমার ও দাদীর জন্য কম্বল কিনে পাঠাবে বলেছিল। এখন কম্বলের পরিবর্তে আমরা বাবার নিথর মরদেহের জন্য অপেক্ষা করছি। এখন আমাদের বাবার লাশটি পেলেই হবে।

নিহতের মাসুম আহাম্মেদ মা পেয়ারা বেগম বলেন, অনেক কষ্ট করে ঋণের টাকায় বিদেশ গেছে আমার ছেলে। বিদেশ যাওয়ার পর ভালো কাজ না পেয়ে অবৈধভাবে নানা দুর্ভোগে কেটেছে তার ৬ মাস। দালাল যে কাজের কথা বলে নিয়ে গেছে সেখানে গিয়ে সে কাজ দেওয়া হয়নি। 

তিনি বলেন,আমাদের সংসারে অর্থ কষ্ট বহু আগে থেকেই। তাই ঋণ করে ছেলেকে বিদেশ পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সাত মাসের মধ্যেই আমার পুত মারা গেল। তিনি অভিযোগ করে বলেন দালাল মিথ্যা কথা বলে ৫ লাখ টাকা নিয়ে আমার ছেলেকে ভালো কাজের ব্যবস্থা করে দেয়নি। আমার ছেলে খেয়ে না খেয়ে ৬ টা মাস কষ্ট করেছে। গত এক মাসে সে কাজ পেয়ে বাড়িতে ২৩ হাজার টাকা পাঠিয়েছে। 

তিনি আরও বলেন, আমার ছেলের দুটি সন্তান আছে। তার ছেলে সন্তানটি শারীরিক প্রতিবন্ধী। মেয়ে স্কুলে পড়ে। আমরা অথৈ সাগরে পড়ে গেলাম। ছেলের লাশটি যেন নিরাপদভাবেই বাড়ি আনার ব্যবস্থা করা হয়।

অপরদিকে নিহত মাকসুদুল হোসেনেন ছোট ভাই রাতুল হাসান বলেন, প্রায় তিন বছর হয়েছে ভাই বিদেশ গেছে। প্রথম দুবছর চরম কষ্ট করেছে অবৈধভাবে থেকে। দালাল ভালো কাজের আশ্বাস দিয়ে ভালো কাজের ব্যবস্থা করে দেয়নি। লুকিয়ে লুকিয়ে দুই বছর চানাচুর বিক্রি করে খেয়ে না খেয়ে চলছে তার প্রবাস জীবন।

তিনি বলেন, ভাই বিয়ের একমাস পরই বিদেশ চলে গেছেন। আমরা ঋণ করে তাকে বিদেশ পাঠিয়েছিলাম। আসছে জানুয়ারিতে ভাই বাড়িতে আসার প্রস্তুতি নিয়েছিল। মৃত্যুর আগের রাতেও বাড়ির সবার সথে ভিডিও কলে কথা বলেছে। বাড়িতে সব ভাই-বোন ছিল তাই সবার সাথে কথা বলেছে। এটি আমাদের সাথে ভাইয়ের শেষে কথা ছিল।  কিন্তু আমাদের ভাগ্য এখন চরম খারাপ। এখন তার মৃত্যুর খবর শুনে তার বাড়ি আসার আনন্দের বদলে দুচোখে পানি নিয়ে তার লাশের অপেক্ষায় আছি। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন কবে লাশ পাবো তাও ঠিন নাই। কী করে দ্রুত লাশ বাড়ি আনা যাবে সেটাও ভালো জানি না। আশা করছি সরকার আমাদের সহযোগিতা করবে।

 স্বজনরা ও প্রতিবেশীরা জানান, সৌদি আরবের আম্বারিয়া শহরের একটি বাসায় তারা এক রুমেই থাকতেন। তারা দুজনেই সম্প্রতি রিসোর্টে কাজ পেয়েছিলেন। সোমবার রাতে ঘরে ঢুকে রুম হিটার দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। এ সময় ঘরের ভিতরে অতিরিক্ত তাপ জমে অক্সিজেন কমে তারা শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যান। সোমবার তাদের মৃত্যু হলেও বুধবার আমাদের (পরিবারের) কাছে খবর আসে। এরপর থেকেই দুই বাড়িতে শোকের মাতম বইছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য তাজউদ্দীন বলেন, নিরীহ স্বভারে ছেলে ছিল মাসুম আহাম্মেদ। অনেক টাকা ঋণ করে বিদেশ গিয়ে এখন লাশ হয়ে বাড়ি ফিরবে। গরীব পরিবারটি চরম বিপদে পড়ে গেল।

শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ব্যারিস্টার সজিব আহাম্মেদ বলেন, খবর পেয়েছি দুজন প্রবাসী সৌদি আরবে মৃত্যু বরণ করেছেন। তবে কোনো পরিবার আারে সাথে যোগাযোগ করেনি। কোনো জটিলা বা বিরম্বনা ছাড়াই যেন সরকারিভাবে নিহতদের মরদেহ যেন দেশে আসে সে ব্যাপারে সহযোগিতা করা হবে। পরিবারের সদস্যরা যেন আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখেন। আশা করি ঝামেলা ছাড়াই পরিবার তাদের স্বজনের মরদেহটি বুঝে পাবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত