দীর্ঘ অপেক্ষা অবশেষে ফুরাল। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ তারকা হামজা চৌধুরীর বাংলাদেশের হয়ে খেলতে আর বাধা নেই। গতকাল বৃহস্পতিবার নিজের ইনস্টাগ্রামে ছোট্ট ভিডিও বার্তায় এই সুসংবাদটি দিয়েছেন হামজা নিজেই। এর কয়েক মিনিট পর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনও তাকে খেলানোর ব্যাপারে ফিফার ছাড়পত্র পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্যপ্রবাসী হামজা অনেক দিন ধরেই চাইছিলেন বাংলাদেশের হয়ে খেলতে। বাফুফেও তাকে পেতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছিল। বাংলাদেশি মা ও গ্রানাডিয়ান বাবার সন্তান হামজা লাল-সবুজ জার্সিতে খেলার স্বপ্নে নিয়েছিলেন বাংলাদেশের পাসপোর্ট। বাফুফেও নিয়ম মেনে ফিফায় আবেদন করে তাকে পেতে। প্রথমত বাধা ছিল ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের অনুমতি পাওয়া। ২০১৮-১৯ মৌসুমে ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-২১ ও ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-২৩ দলের হয়ে খেলার ফলে তার বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার বিষয়টি কিছুটা হলেও জটিল হয়ে পড়ে। এফএ অবশ্য ছাড়পত্র দিয়ে দেয় হামজাকে। এরপরই বিষয়টি যায় ফিফার কোর্টে। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্তা সংস্থার সব শর্ত পূরণে হামজা ও বাফুফে চেষ্টা চালিয়ে গেছে, জমা দিয়েছে সব প্রয়োজনীয় কাগজাদি। এসবকিছু বিবেচনায় এনে অবশেষে ফিফার ফুটবল ট্রাইব্যুনালের প্লেয়ার স্ট্যাটাস চেম্বার হামজাকে দিয়েছে বাংলাদেশের হয়ে খেলার ছাড়পত্র।
মাত্র সাত বছর বয়সে লেস্টার সিটির একাডেমিতে ফুটবল দীক্ষা নিতে যোগ দিয়েছিলেন হামজা। এরপর থেকে লেস্টারের ঘরের ছেলেতে রূপ নেন এই হোল্ডিং মিডফিল্ডার। ২০১৫ সালে তার সুযোগ হয় লেস্টারের সিনিয়র দলে। এরপর অবশ্য ধারে তিনি খেলেছেন বার্টন এলবিয়ন, বর্তমানে খেলছেন ওয়াটফোর্ডের হয়ে লিগ ওয়ানে। ২০১৮ সালের ২৬ মে ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-২১ দলে অভিষেক হয় হামজার। পরের বছর তিনি জায়গা পান অনূর্ধ্ব-২৩ দলে। তবে এই দলে অভিষেকেই ফ্রান্সের বিপক্ষে সরাসরি লাল কার্ড দেখতে হয়েছিল তাকে। তার সামনে ছিল বাংলাদেশ অথবা গ্রানাডার হয়ে খেলার সুযোগ। তবে ইংল্যান্ড বয়সভিত্তিক দলে খেলার কারণেই তিনি স্বপ্ন দেখছেন ইংল্যান্ড সিনিয়র দলে খেলার। যখন বুঝতে পারলেন ইংল্যান্ড দলে ডাক পাওয়া হবে না, তখনই তিনি বেছে নেন বাংলাদেশকে। এ বছর শুরু থেকেই শুরু হয় তার পুরোপুরি বাংলাদেশি হওয়ার প্রক্রিয়া। ২৭ ফেব্রুয়ারি জানা যায়, বাংলাদেশের সঙ্গে তার আনুষ্ঠানিক কথা চলছে। ২৩ আগস্ট তিনি হাতে পান বাংলাদেশি পাসপোর্ট। এর এক মাস পর ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন তাকে দেয় অনাপত্তিপত্র। যেটা হাতে পেয়ে ফিফা গতকাল বাংলাদেশের হয়ে হামজাকে খেলার অনুমতি দেয়।
বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টায় ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগেই অবশ্য নিজের ইনস্টাগ্রাম পেজে একটা ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছিলেন হামজা। জানিয়েছিলেন একটা ঘোষণা দেওয়ার জন্য তিনি মুখিয়ে আছেন। তখনই বোঝা যাচ্ছিল ভালো কোনো সংবাদই শোনাবেন তিনি। এরপর সন্ধ্যা ৭টায় যুক্তরাজ্যে গাড়ির সিটে বসে দেন ছোট্ট ভিডিও বার্তা, ‘সবাইকে শুভেচ্ছা, আমি হামজা বলছি। আমি খুবই আনন্দিত, পরিকল্পনামাফিক সবকিছু হয়েছে। বাংলাদেশের হয়ে খেলার জন্য আমার তর সইছে না। আশা করি, অচিরেই সবার সঙ্গে দেখা হবে।’
হামজার টিমমেট হতে যাওয়া বাংলাদেশ জাতীয় দলের ফুটবলাররাই ভীষণ রোমাঞ্চিত। জাতীয় দলের সর্বশেষ ম্যাচে অধিনায়কত্ব করা তপু বর্মণ মনে করেন, হামজা সংযুক্তিতে দলের শক্তি যেমন বাড়বে, সেই সঙ্গে দেশ জুড়েই ফুটবল নিয়ে একটা উন্মাদনার সৃষ্টি হবে। তপু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা দারুণ একটা অনুভূতি। সে অনেক অভিজ্ঞ ও সবচেয়ে শক্তিশালী লিগে খেলা খেলোয়াড়। বাংলাদেশের জন্য অনেক ইতিবাচক ব্যাপার হবে। আমি অনেক বেশি রোমাঞ্চিত। হামজা যেই পর্যায়ে খেলে, সেটা আমাদের খেলোয়াড়দের জন্য স্বপ্নের মতো। তাই তার সঙ্গে ড্রেসিং রুম শেয়ার করা ও খেলা বিশাল ব্যাপার। হামজা যখন বাংলাদেশের জার্সিতে খেলবে, তখন দেশ জুড়ে একটা উন্মাদনা সৃষ্টি হবে। কয়েক বছর ধরেই হামজাকে ঘিরে ফুটবলভক্তদের মধ্যে যে আগ্রহ দেখেছি, তাতে আমার বিশ্বাস দেশের ফুটবলেই একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
ব্যক্তিগত কারণে এখন ডেনমার্ক আছেন নিয়মিত অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া। সেখান থেকেই হামজাকে নিয়ে নিজের প্রতিক্রিয়া দেশ রূপান্তরকে জানালেন তিনি, ‘আমাদের জন্য এটা অনেক আনন্দের খবর। এমন একটা খবরের জন্য দেড় বছরের বেশি সময় ধরে অপেক্ষায় ছিলাম। সে আমাদের দলের জন্য অনেক বড় শক্তি হয়ে আসছে, তাতে দলও ভীষণভাবে উজ্জীবিত হবে। আমি তো চাই তাকে মার্চেই সঙ্গী হিসেবে পেতে। ভারতের বিপক্ষে ২৫ মার্চ ম্যাচে সে দলের হয়ে খেললে দারুণ হবে।’
হামজার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার আগেই আগামী মার্চে তাকে পাওয়ার ইচ্ছের কথা জানিয়েছিলেন স্প্যানিশ কোচ হাভিয়ের কাবরেরা। এ মাসেই চুক্তি শেষ হবে তার। তবে চুক্তি নবায়নের ব্যাপারে ভীষণ আশাবাদী কারবেরা এখন আছেন স্পেনে। চুক্তি বাড়লে তিনি চান হামজা যেন এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের শুরু থেকেই খেলেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে কাবরেরা বলেন, ‘সবচেয়ে ইতিবাচক হলো, সে অচিরেই আমাদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে। আমি তো চাইব এখনই ও যোগ দিক। তবে সেটা তো সম্ভব নয়। তবে আমাদের চেষ্টা করতে হবে, যাতে সে মার্চে বাছাইয়ের আগেই দলের সঙ্গী হয়ে যায়। তবে যখনই খেলুক, সবচেয়ে বড় খবর হলো সে বাংলাদেশের হয়ে খেলতে সম্মত হয়েছে।’
হামজার ঘোষণাটি মুহূর্তে ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ফুটবল ভক্তরাও তাকে জানাতে শুরু করেছেন আগাম অভ্যর্থনা। এখন সময়ই বলে দেবে হামজা কত দ্রুত বাংলাদেশের জল-হাওয়া মানিয়ে নিতে পারেন। তবে তার আগমনী বার্তায় বাছাইয়ের সি গ্রুপের অন্যদের একটু নড়েচড়ে বসতেই হচ্ছে বৈকি।
