ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়া ও অবস্থান করাসহ নানা কারণেই দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উষ্ণ নয়। কয়েকদিন আগেই বাংলাদেশ সফরে আসেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি। তবে তার সে সফরও দুই দেশের মধ্য চলমান শীতল সম্পর্ককেও উষ্ণ করতে পারেনি। ভারতের সংসদেও আলোচনা হচ্ছে ইস্যুটি নিয়ে। ঠিক এমন সময়ই গত শুক্রবার দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ত্রিপুরায় দুই শিশুসহ অন্তত ছয় বাংলাদেশি নারী ও পুরুষকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অবৈধ বাংলাদেশি ছাত্রদের চিহ্নিত করতে দিল্লির সব স্কুলকে নির্দেশ দিয়েছে দিল্লি মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন (এমসিডি)। এছাড়া অবৈধ বাংলাদেশিদের জন্য ভারতে ডিটেনশন সেন্টার বা আটক কেন্দ্র তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিস।
তিনি বলেছেন, অবৈধ বাংলাদেশিদের জন্য মুম্বাইয়ে ভালো ডিটেনশন সেন্টার তৈরি করা হবে।
ত্রিপুরায় ছয় বাংলাদেশি গ্রেপ্তার : ত্রিপুরায় দুই শিশুসহ অন্তত ছয় বাংলাদেশি নারী ও পুরুষকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দেশটির রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে ফেরার পথে ত্রিপুরা পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করেছে। গত শুক্রবার ত্রিপুরা পুলিশ ওই বাংলাদেশিদের গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছে।
ত্রিপুরা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, শুক্রবার রাজ্যের খোয়াই জেলার একটি বেসরকারি গেস্ট হাউজ থেকে ছয় বাংলাদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশি নাগরিকরা দিল্লি থেকে সীমান্তবর্তী খোয়াই জেলায় এসেছিলেন এবং ভারতীয় দালালদের সহায়তায় বাংলাদেশে ফেরার আগে গেস্ট হাউজে অবস্থান করছিলেন। তারা বাংলাদেশের ফেনী জেলার বাসিন্দা।’
তিনি বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাংলাদেশি নাগরিকরা কয়েক মাস আগে চাকরির সন্ধানে দিল্লিতে গিয়ে অবৈধভাবে আধার, প্যান এবং ইপিআইসি কার্ড তৈরি করেন বলে স্বীকার করেছেন। পুলিশ এসব ভুয়া কার্ড জব্দ করেছে।
গ্রেপ্তারকৃত বাংলাদেশিরা হলেনÑ মোহাম্মদ কবির (৩৭), মোহাম্মদ মুমিন (২৩), আয়েশা খাতুন (৭০), তানিয়া বেগম (৩৫)। তাদের সঙ্গে দুই শিশুও ছিল।
অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের অভিযোগে গত পাঁচ মাসে ৫৭০ জনেরও বেশি বাংলাদেশি ও ৬৩ জন রোহিঙ্গাকে আগরতলা রেলস্টেশন এবং ত্রিপুরার অন্যান্য স্থান থেকে রাজ্যের রেলওয়ে পুলিশ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ এবং ত্রিপুরা পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
অবৈধ বাংলাদেশি ছাত্রদের চিহ্নিত করতে দিল্লির সব স্কুলকে নির্দেশ অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করতে ভারতের রাজধানী দিল্লির সব স্কুলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তির সময় সব স্কুলকে শিক্ষার্থীদের পরিচয় যথাযথভাবে শনাক্ত ও যাচাইয়ের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। গতকাল শনিবার পৃথক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে ভারতীয় বার্তা সংস্থা পিটিআই এবং সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ডেকান হেরাল্ড।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের জাতীয় রাজধানী দিল্লির সমস্ত স্কুলকে শিক্ষার্থী ভর্তির সময় অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী শিশুদের শনাক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে দিল্লি মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন (এমসিডি)। একই সঙ্গে ভর্তির সময় শিক্ষার্থীদের পরিচয় সঠিকভাবে শনাক্তকরণ এবং যাচাইকরণ করতেও নির্দেশ দিয়েছে সংস্থাটি।
সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিএনসিটিডি’র (দিল্লি সরকার) প্রিন্সিপাল সেক্রেটারির (স্বরাষ্ট্র) সভাপতিত্বে গত ১২ ডিসেম্বর একটি ভার্চুয়াল বৈঠক করে দিল্লি মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন (এমসিডি)। ওই বৈঠকে তারা অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ‘প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা’ বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা করেন, যার মধ্যে তাদের স্কুলে স্কুলে চিহ্নিত করাসহ তাদের জন্ম সনদ প্রদান না করার কথাও বলা হয়েছে।
এছাড়া সংবাদমাধ্যম ডেকান হেরাল্ড বলছে, বাংলাদেশ থেকে আসা কোনো অবৈধ অভিবাসীকে জন্মসনদ না দেওয়ার জন্য ভারতের জনস্বাস্থ্য বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরে এমসিডি-ও তাদের এ বিষয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে বলে এবং তাদেরও শিক্ষার্থীদের পরিচয় সঠিকভাবে শনাক্তকরণ এবং যাচাইকরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর পাশাপাশি এই জাতীয় অভিবাসীদের দখলে থাকা বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও তাদের অপসারণ করতেও বলা হয়েছে।
ডিটেনশন সেন্টার তৈরির ঘোষণা : অবৈধ বাংলাদেশিদের জন্য ভারতে ডিটেনশন সেন্টার বা আটক কেন্দ্র তৈরির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিস এই ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অবৈধ বাংলাদেশিদের জন্য মুম্বাইয়ে ভালো ডিটেনশন সেন্টার তৈরি করা হবে।
ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআই এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিস বলেছেন অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের আটক রাখার জন্য মুম্বাইয়ে একটি ভালো ডিটেনশন সেন্টার বা আটক কেন্দ্র তৈরি করা হবে, কারণ তাদের সরাসরি কারাগারে রাখা যাবে না।
দেবেন্দ্র ফড়নবিস বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছিÑ অনেকে মাদকের মামলায়, অনেকে অবৈধ প্রবেশের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পাশাপাশি অবৈধ বাংলাদেশিরাও গ্রেপ্তার হচ্ছেন। তারা সবাই বিদেশি নাগরিক এবং তাদের সরাসরি আমাদের জেলে রাখা যায় না। তাদের ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখতে হয়, তাই মুম্বাই মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের (বিএমসি) আমাদের ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরির জন্য জমি দিয়েছে। কিন্তু সেই জমি ডিটেনশন ক্যাম্পের নিয়ম মেনে চলে না। তাই আমরা বিএমসি’র কাছে অন্য জমি চেয়েছি। যেন মুম্বাইয়ে একটি ভালো ডিটেনশন সেন্টার তৈরি করা যায়।
এর আগে থানা পুলিশের মানব পাচারবিরোধী সেল রাজ্যটির কল্যাণে অবৈধভাবে বসবাসকারী এক বাংলাদেশি দম্পতিকে গ্রেপ্তার করে বলে কর্মকর্তারা শুক্রবার জানিয়েছেন।
