দ্বীনি শিক্ষা বিস্তারে অনন্য আলেম

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৩:০৫ এএম

মাওলানা নুরুল হুদা একজন বিদগ্ধ আলেম। এছাড়া তিনি একাধারে সফল শিক্ষক, গবেষক, চিন্তক ও হাদিস বিশারদ। কর্মজীবনের শুরু থেকেই তিনি শিক্ষাদীক্ষা ও তালিম-তরবিয়ত নিয়ে ব্যস্ত আছেন। চিন্তা, গবেষণা, জ্ঞানার্জন ও জ্ঞান বিতরণই তার মূল কাজ। তিনি যোগ্য আলেম গড়ার কারিগর। এক্ষেত্রে মেধা ও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন বারবার। 

সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর জীবনযাপনে অভ্যস্ত তিনি। চারিত্রিক মাধুর্য ও নম্রতা তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সততা ও আমানতদারিতা তার মহৎ গুণ। লেনদেনে যথেষ্ট স্বচ্ছতার কারণে তিনি সবার কাছে সমানভাবে সমাদৃত। সামাজিক সৌহার্দ্যে তিনি অনন্য। অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে থাকেন সব সময়। সুধী সমাজের কাছে তিনি অত্যন্ত প্রিয়ভাজন ব্যক্তিত্ব। তিনি দীর্ঘ চার দশক ধরে নববী ইলমের অসামান্য খেদমত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। ইলমের খেদমতরত অবস্থায় রবের ডাকে সাড়া দেবেন এমনই তার কামনা। শিক্ষার্থীরা তার কাছে

সন্তানতুল্য। অধীনস্তদের তিনি সহোদর ভাইয়ের মতো জানেন। মেধাবী এই আলেম লক্ষ্মীপুরের দত্তপাড়া ইউনিয়নের বরপাড়া গ্রামে ১৯৬০ সালের ২৪ ডিসেম্বর এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম আবদুল ওয়াহাব ও দাদা আবদুল কাদের মুন্সি। পারিবারিকভাবেই তারা দ্বীনদার ও ধর্মের প্রতি অনুরাগী। দশ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি অষ্টম। তিন ছেলেসন্তানের জনক তিনি। তার প্রত্যেক ছেলেই হাফেজ ও আলেম। মাওলানা নুরুল হুদা ছোটবেলা থেকেই পিতা-মাতার নিবিড় তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন এবং নিজ বাবার কাছে পবিত্র কোরআন শেখার মধ্য দিয়ে পড়ালেখার জগতে প্রবেশ করেন। তিনি নিজ গ্রামের প্রবীণ আলেম মাওলানা আবদুল জাব্বার কাসেমি (রহ.)-এর কাছে মক্তবের শিক্ষালাভ করেন। গ্রামের বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন। তার বাবা ও মেজো ভাই পরামর্শ করে তাকে বটতলির মাওলানা আবদুল কবির (রহ.)-এর সান্নিধ্যে নিয়ে যান। মাওলানা আবদুল কবির নিজ তত্ত্বাবধানে বটতলি মাদ্রাসায় ভর্তি করান। সেখান থেকেই তার ইলমে নববী অর্জনের মোবারক সফর শুরু হয়। বটতলি মাদ্রাসায় কওমি শিক্ষার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর শেষ করে ফেনী ছাগলনাইয়া আযিযিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে উচ্চমাধ্যমিক স্তর সমাপ্ত করেন। এ সময় তিনি মাওলানা বজলুর রহমান ও মুফতি সাঈদ আহমদ (রহ.)-এর শিষ্যত্ব লাভ করেন। অতঃপর উচ্চশিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিখ্যাত দ্বীনি বিদ্যাপীঠ জামেয়া ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় পাড়ি জমান এবং সেখানে যথাক্রমে মেশকাত (স্নাতক) এবং দাওরায়ে হাদিস (স্নাতকোত্তর) সমাপ্ত করেন। হাদিস বিষয়ক উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য জামেয়া বাবুনগরের উলুমে হাদিস (উচ্চতর হাদিস গবেষণা) বিভাগে আরও এক বছর নিজেকে অধ্যয়নের কাজে নিয়োজিত রাখেন। অধ্যয়ন শেষে তিনি গবেষণামূলক দুটি প্রবন্ধ (থিসিস) লিখে নিজের মেধা ও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। বাবুনগরে অধ্যয়নকালে তিনি ধন্য হয়েছেন যুগশ্রেষ্ঠ ওলামা-মাশায়েখের শিষ্যত্ব লাভ করে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আল্লামা হারুন বাবুনগরী (রহ.), আল্লামা ইসহাক আল-গাজি (রহ.), আল্লামা ইউনুস (রহ.), আল্লামা উবাইদুর রহমান (রহ.), আল্লামা আবুল হাসান (রহ.), আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী (রহ.), আল্লাম মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী প্রমুখ। পড়ালেখা শেষে এই মনীষী শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে নিজের কর্মজীবনের বর্ণাঢ্য অধ্যায় রচনা করেন। কর্মজীবনের শুরু থেকেই নববী শিক্ষা বিস্তারে নিজেকে ব্রত রেখেছেন। খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলাধীন তবলছড়ী কওমি মাদ্রাসা তার প্রথম কর্মস্থল। সেখানে সুনামের সঙ্গে তিন বছর পাঠদান করেন। কুমিল্লা চৌদ্দগ্রামের নারানকরা মাদ্রাসায় দুই বছর হাদিসের শিক্ষকতাও করেন। এ সময় তিনি সহিহ মুসলিমসহ হাদিস শাস্ত্রের বিভিন্ন কিতাবের দরস প্রদান করেন। ফেনী পরশুরাম গুথুমা দারুস সুন্নাহ মাদ্রাসায় তিন বছর পাঠদান করেন। বটতলির মাওলানা আবদুল কবির (রহ.)-এর আহ্বানে বটতলি মাদ্রাসায় এসে দীর্ঘ দশ বছর কওমি সিলেবাসের গুরুত্বপূর্ণ কিতাবাদির পাঠদান করেন।

২০০৩ সালে দত্তপড়ায় যুগান্তকারী দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমিরুল মুমিনিন মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। কিছুদিন বটতলি মাদ্রাসায় থেকে আমিরুল মুমিনিন মাদ্রাসা পরিচালনা করেন। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এবং এলাকাবাসীর আবেদনে তিনি স্থায়ীভাবে আমিরুল মুমিনিন মাদ্রাসায় চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। তাই অনেকের সঙ্গে এ বিষয়ে পরামর্শ করেন। বিশেষ করে তার আধ্যাত্মিক শায়েখ ও ওস্তাদ মুফতি সাঈদ (রহ.)-এর সঙ্গে পরামর্শ করেন। তার পরামর্শ অনুযায়ী বটতলি মাদ্রাসার আবদুল কবির (রহ.)-এর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে ২০০৫ সালে আমিরুল মুমিনিন মাদ্রাসায় চলে আসেন। অতঃপর এ মাদ্রাসাকে একটি যুগান্তকারী দ্বীনি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ার লক্ষ্যে পুরোদমে মেহনত শুরু করেন। অদ্যাবধি অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমান মাদ্রাসার সার্বিক উন্নতি চোখে পড়ার মতো। বরাবরই তার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা বোর্ড ফলাফলে শীর্ষে রয়েছে। মাওলানা নুরুল হুদা আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধনের লক্ষ্যে স্বীয় ওস্তাদ মুফতি সাঈদ আহমদ (রহ.)-এর মাধ্যমে শাহ সুলতান আহমদ নানুপুরীর কাছে বাইয়াত হন। নানুপুরী (রহ.)-এর ইন্তিকালের পর সাঈদ আহমদ (রহ.)-এর কাছে বাইয়াত হন। সর্বশেষ তার ইজাজত ও খেলাফত লাভ করেন। মহান আল্লাহ দ্বীনের এই একনিষ্ঠ আলেমের সব কার্যক্রমকে সফল করুন এবং তাকে দীর্ঘ নেক হায়াত দান করুন। আমিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত