মুসলমানরা পরস্পর ভাই ভাই। এরপরও মুসলমানদের মধ্যে পরস্পর ঝগড়া-বিবাদ, মনোমালিন্য এবং আদর্শের অমিল ছাড়াও অনেক মতবিরোধ দেখা যায়। আবহমান কাল থেকে আজ পর্যন্ত এ অবস্থা আমরা অবলোকন করছি। এমন সংঘাত নিরসনের জন্য যারা ভূমিকা পালন করবে তাদের মর্যাদা হবে অনবরত নফল রোজা পালনকারী এবং রাত জেগে নফল নামাজ আদায়কারীর মুমিনের চেয়েও বেশি। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আমি কি তোমাদেরকে রোজা, নামাজ ও সদকার চেয়েও উত্তম কোনো বিষয়ের খবর দেব? সাহাবিরা বললেন, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসুল! তিনি বললেন তা হলো, বিবাদ মীমাংসা করে দেওয়া। কেননা বিবাদ মানুষের দ্বীনকে শেষ করে দেয়।’ (তিরমিজি)
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের বেশিরভাগ গোপন পরামর্শে কোনো কল্যাণ নেই। কিন্তু দান-সদকা, সৎকাজ অথবা মানুষের মধ্যে আপস করার নির্দেশ দেওয়ার মধ্যে কল্যাণ রয়েছে। আর যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় এ কাজ করবে আমি তাকে অতি শিগগির মহা প্রতিদান দেব।’ (সুরা নিসা ১১৪) হজরত সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কুবাবাসী পরস্পরে লড়াইয়ে লিপ্ত হলো। এক পর্যায়ে তারা পরস্পরের প্রতি পাথর নিক্ষেপ শুরু করল। খবর পেয়ে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) সবাইকে বললেন, তোমরা আমাদের সঙ্গে চলো। আমরা তাদের মধ্যে সন্ধি করে দেব। অতঃপর তিনি সেখানে গেলেন এবং তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিলেন। (সহিহ বুখারি)
মুমিনদের মধ্যে সংঘাত নিরসনের চমৎকার নীতিমালা আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বর্ণনা করেছেন। পবিত্র কোরআনের সুরা হুজুরাতের ৯ নম্বর আয়াত যদি আমরা অনুসরণ করি তাহলে সংঘাত সহজে সমাধান করতে পারব। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যদি মুমিনদের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তাহলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের ওপর বাড়াবাড়ি করে, তাহলে যে দলটি বাড়াবাড়ি করবে, তার বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ করো, যতক্ষণ না সে দলটি আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। তারপর যদি দলটি ফিরে আসে তাহলে তাদের মধ্যে ইনসাফের সঙ্গে মীমাংসা করো এবং ন্যায়বিচার করো। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন।’
এ আয়াতের মূল কথা হচ্ছে, যদি মুমিনদের দুই পক্ষের মধ্যে মতানৈক্য বা মতভেদ দেখা দেয় তখন তৃতীয় আরেকটি মুমিন দল তাদের মধ্যে মীমাংসা করবে। আর মীমাংসা করার বিষয়ে যদি সন্ধি অথবা শর্ত একপক্ষ অমান্য করে তাহলে বিদ্রোহী পক্ষকে শায়েস্তা করবে। এরপর এই বিদ্রোহী পক্ষ যদি ফিরে আসে, তওবা করে তখন তাকে গ্রহণ করবে, তার সমস্ত ভুল ক্ষমা করে দেবে। তাদের ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। এতে আরও ঝগড়া বাড়বে। এমনকি খুন-খারাবিও হবে। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ইচ্ছাকৃত কোনো মুমিনকে হত্যা করবে, তার প্রতিদান হচ্ছে জাহান্নাম, সেখানে সে স্থায়ী হবে। আর আল্লাহ তার ওপর ক্রুদ্ধ হবেন, তাকে লানত করবেন এবং তার জন্য বিশাল আজাব প্রস্তুত করে রাখবেন।’ (সুরা নিসা ৯৩)
তবে বিদ্রোহী ও সমাজ বিরোধীদের ছাড় দেওয়া যাবে না। তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কেননা হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী অন্যায়ভাবে যে বিদ্রোহ করে, সে আর মুসলিম সমাজভুক্ত থাকে না। তাকে শাস্তি পেতেই হবে। আর এটা না থাকলে তো পাপীরা পাপ করেই যাবে। অতএব সামাজিক শৃঙ্খখলা রক্ষার জন্য ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন’ নীতি বজায় রাখতে হবে। তাদের ওপর দণ্ডবিধি কার্যকর করতে হবে। মূল কথা হচ্ছে, একপক্ষ হঠকারী হলে তাকে দমনের জন্য শক্তিশালী তৃতীয় পক্ষ থাকতে হবে এবং তাদের অবশ্যই নিরপেক্ষভাবে সুবিচার করতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদের সব ধরনের ঝগড়া-ফ্যাসাদ থেকে বেঁচে থাকার তওফিক দান করুন। এর সঙ্গে সঙ্গে যদি কেউ ঝগড়া-ফ্যাসাদে লিপ্ত হয় তাহলে তাদের পরস্পরের মধ্যে মীমাংসা করে দেওয়ার তওফিক দান করুন। আমিন।
