এবার যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে বল ঠেলল রাশিয়া

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৩:১৮ এএম

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে আক্ষরিক অর্থে না হলেও মিত্রশক্তির হয়ে লড়াই করেছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। তাদের সঙ্গে যুক্তরাজ্য, চীনসহ আরও কয়েকটি দেশও ছিল। দীর্ঘ লড়াইয়েই একপর্যায়ে জাপানে ফেলা যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা সব হিসাব বদলে দেয়। ওই হামলার পর মাঠের যুদ্ধ তাৎক্ষণিকভাবে থেকে গেলেও শুরু হয় নতুন এক যুদ্ধ, স্নায়ুযুদ্ধ বা শীতল যুদ্ধ। আর তাদের পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা রাশিয়া এবং পৃথিবীর নতুন মোড়ল হয়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্র। এরপর কয়েক দশক ধরে মহাকাশ থেকে শুরু করে মহাসমুদ্রেও চলেছে দেশ দুটির কর্র্তৃত্ব দেখানোর প্রতিযোগিতা। অবশ্য গেল শতকের শেষ দশকে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হলে দুই দেশের সম্পর্কের বরফ কিছুটা গলতে শুরু করে। তবে দেশ দুটির সম্পর্ক আর স্বাভাবিক হয়নি কখনো। এরপর থেকে নানান সময়ে, নানান ইস্যুতে রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নানা চড়াই-উতরাই গেছে। তবে সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা ভøাদিমির পুতিন যখন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হলেন তখন থেকে দেশ দুটির সম্পর্ক খুব ভালো যায়নি। ২০২২ সালে ফেব্রুয়ারিতে চরম অবনতির শুরু হয় রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করল। গেল প্রায় তিন বছর ধরেই ইউক্রেন যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মাথাব্যথা হয়ে আছে। ন্যাটোসহ নানা ইস্যুতে ওই যুদ্ধে ইউক্রেনকে হারতে দিতে চান না প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ফলে তিনি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সহায়তা ইউক্রেনকে দিয়ে যাচ্ছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চান এ যুদ্ধ বন্ধ হোক। নির্বাচনের আগে একাধিক ভার ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পরদিনই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নেবে। অবশ্য ট্রাম্প কী উদ্যোগ নেবেন সেটি খোলাসা করেননি। ফলে আগামী ২০ জানুয়ারি তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পরই সেটি জানা যাবে। তবে এর মধ্যে পুতিন একাধিকবার বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা, এমনকি আপসেও রাজি আছেন। গেল সপ্তাহেও তিনি দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক সংবাদ সম্মেলনে বার্ষিক প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি ফের একই কথা বলেন। গত বুধবার দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভও বলেছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে আগ্রহী। তবে এ ক্ষেত্রে তিনি শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। বলেছেন, তেমন কিছুর জন্য প্রথম পদক্ষেপটি ওয়াশিংটনকেই নিতে হবে। ল্যাভরভ সাংবাদিকদের বলেছেন, যদি ওয়াশিংটন থেকে যে সংকেতগুলো আসছে তা সংলাপ পুনরুদ্ধারের জন্য আন্তরিক হয়, তবে আমরা অবশ্যই সাড়া দেব। মার্কিনিরাই প্রথম এই সংলাপ বন্ধ করেছিল, তাই তাদেরই প্রথম পদক্ষেপ নিতে হবে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন কর্মকর্তারা রাশিয়াকে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখেন। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ ও মার্কিন নাগরিকদের মিথ্যা অভিযোগে কারাগারে পাঠানো এবং মিত্র দেশগুলোর বিরুদ্ধে নাশকতা চালানোর অভিযোগ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।

অন্যদিকে, রাশিয়া বলছে, যুক্তরাষ্ট্র একটি পতনশীল শক্তি যা ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে রাশিয়ার স্বার্থকে উপেক্ষা করে এসেছে। তারা আরও অভিযোগ করে আসছে যে, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার অভ্যন্তরে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে এবং এর মাধ্যমে নিজের স্বার্থ রক্ষা করছে। দুই দেশের মধ্যকার এই বৈরিতা চরমে পৌঁছায় ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে।

ল্যাভরভ বলেছেন, রাশিয়া সাময়িক যুদ্ধবিরতির কোনো উদ্দেশ দেখছে না। বরং মস্কো একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তি চায়, যা রাশিয়া এবং তার প্রতিবেশীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

তিনি বলেন, একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কোথাও নিয়ে যাবে না। আমাদের একটি আইনি চুক্তি প্রয়োজন, যা এই অঞ্চলের নিরাপত্তার শর্তগুলো স্থায়ীভাবে নির্ধারণ করবে।

পশ্চিমারা বলছে, ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ একটি সাম্রাজ্যবাদী ভূমি দখলের প্রচেষ্টা। তবে এই আক্রমণ ন্যাটোকে শক্তিশালী করেছে এবং রাশিয়াকে দুর্বল করেছে।

তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েও খুব বেশি লাভ হয়নি যুক্তরাষ্ট্রসহ তার ইউরোপীয় মিত্রদের তারপরও জিদ বা ইগোর বশে তারা ইউক্রেনের পাশে দাঁড়িয়ে ‘ছায় যুদ্ধ’ চালিয়ে যাচ্ছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে। এ যুদ্ধ জারি রাখতে গিয়ে দেশগুলোকে অর্থনৈতিক ধাক্কার মুখেও পড়তে হচ্ছে। কিন্তু ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ায় তাদের হিসাবনিকাশ বদলে গেছে। নিজেকে চুক্তি সম্পাদনে দক্ষ কারিগর হিসেবে তুলে ধরে ট্রাম্প ইউক্রেন যুদ্ধ দ্রুত সমাপ্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। রয়টার্স বলছে, ট্রাম্পের পরিকল্পনার মূল উপাদান হলো রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে আলোচনার টেবিলে বসানো।

ট্রাম্পের মনোনীত ইউক্রেন-বিষয়ক দূত অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল কিথ কেলগ ১৮ ডিসেম্বর ফক্স নিউজকে জানিয়েছেন, উভয়পক্ষ শান্তিআলোচনার জন্য প্রস্তুত। তার মতে, ট্রাম্প এই যুদ্ধ বন্ধে চুক্তি করার জন্য আদর্শ অবস্থানে রয়েছেন। সেটি গত কয়েক দিন রুশ কর্মকর্তা বা নেতাদের বক্তব্যেও মনে হয়েছে। তবে রাশিয়া এবার আলোচনার বল পাঠিয়ে দিল যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে। এখন দেখার বিষয় ট্রাম্প প্রশাসন গোল করতে পারে কি-না?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত