ইসলাম ধর্মের সমস্ত মৌলিকত্ব একমাত্র আরবি ভাষায়। ইসলাম ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ কোরআন আরবি ভাষায় নাজিল হয়েছে। সুরা ইউসুফের দুই নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি আরবি ভাষায়, যাতে তোমরা বুঝতে পারো।’ পবিত্র কোরআন যেহেতু সর্বপ্রথম আরববাসীদের লক্ষ্য করে অবতীর্ণ করা হয়েছে, সেহেতু তা আরবি ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। ন্যূনতম আরবি জানা না থাকলে ব্যক্তির পক্ষে ধর্মীয় জীবনযাপন করা সম্ভব নয়। কেননা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম হলো নামাজ। বিশুদ্ধ তেলাওয়াত ছাড়া নামাজ শুদ্ধ হয় না। সঙ্গে সঙ্গে নামাজে বিভিন্ন দোয়া-দরুদ, তসবিহ-তাহলিল আরবিতেই আদায় করতে হয়। পৃথিবীর লাখ লাখ মসজিদে প্রতিদিন পাঁচবার আরবিতে আজান দেওয়া হয়। জুমার নামাজের খুতবা, দুই ঈদের জামাতে খুতবা আরবিতে দেওয়া হয়। তাছাড়া আরবি ভাষার সাহিত্য-শৈলী, শব্দালংকার ও অর্থ প্রকাশের দিক থেকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষা। আর তৎকালীন জাহেলি যুগে সাহিত্য জগতে সারা বিশ্বে আরবি সাহিত্যের ছিল সবচেয়ে বেশি প্রভাব। এর ধারে কাছেও তেমন কোনো উন্নত মানের সাহিত্য ছিল না। তাই আরবিতেই কোরআন নাজিল করা হয়েছে।
ইসলামের দ্বিতীয় মৌলিক উৎস হাদিসের ভাষাও আরবি। তাছাড়া ইসলামের মৌলিক ফিকহি কিতাব বেশিরভাগই আরবিতে রচিত। তাই ইসলামকে বুঝতে হলে আরবি ভাষার গভীর জ্ঞান প্রয়োজন। অন্যথায় ইসলামকে গভীরভাবে বোঝা অসম্ভব।
সাহিত্য জগতে আরবি সাহিত্যের প্রভাব অনস্বীকার্য। আরবি সাহিত্য যেমন একটি সমৃদ্ধতম সাহিত্য তেমনি আরবি সাহিত্যের ইতিহাসও অনেক সমৃদ্ধ। আরবি ভাষার মিষ্টতা পেতে চাইলে পড়তে হবে আরবি সাহিত্য। আরবে ইসলামপূর্ব যুগ জাহেলি যুগ হলেও আরবি সাহিত্য ছিল পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্য। বেশিরভাগ শ্রেষ্ঠ সাহিত্য রচনাগুলো রচিত হয়েছে সেই জাহেলি যুগেই। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি শব্দ ভা-ার আছে একমাত্র আরবি ভাষাতেই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সিংহ শব্দটির আরবি প্রতিশব্দ রয়েছে প্রায় ৫০০টিরও বেশি। আরবি ভাষার বাচনভঙ্গি ও অর্থ প্রকাশ অত্যন্ত সূক্ষ্ম। ইসলামপূর্ব যুগের উল্লেখযোগ্য সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যের কথা বলতে গেলে প্রথমে বলতে হবে বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘আল মুয়াল্লাকাত’। জাহেলি যুগে আরবের ওকাজ মেলায় আরবের কবিরা তাদের কবিতা আবৃত্তি করতেন এবং সেখান থেকে সাতটি শ্রেষ্ঠ কাব্যের স্বর্ণখচিত সংকলনই হলো আল মুয়াল্লাকাত।
ইসলামি সংস্কৃতির ওপর আরবি ভাষার প্রভাব অত্যন্ত নিবিড়। আরবি ভাষা ইসলামি সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু। বর্তমান পৃথিবীতে প্রায় বাইশটি দেশের মাতৃভাষা আরবি। মধ্যপ্রাচ্যের পুরোটা জুড়ে আরবিভাষী দেশ। আফ্রিকার দশটির মতো দেশের ভাষা আরবি। ভারতীয় উপমহাদেশের ভাষাগুলোর ওপর আরবি ভাষার প্রভাব আমরা স্পষ্টভাবে দেখতে পাই। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ব্রুনাইসহ আরও কয়েকটি দেশের দ্বিতীয় চর্চিত ভাষা আরবি। আফ্রিকান অনেক দেশ আরবি সংস্কৃতি চর্চা করেন এখন পর্যন্ত এবং অনেক ভাষা আরবি বর্ণমালা গ্রহণ করেছে তাদের ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে।
ভারতীয় উপমহাদেশে আমরা আরবি ভাষা চর্চার গুরুত্ব দেখতে পাই সুস্পষ্টভাবে। এ দেশগুলোতে আরবি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাব এবং এর চর্চা প্রায় এক হাজার বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে চর্চিত হয়ে আসছে। প্রাচীন এ ভাষার রয়েছে সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ধারা, গৌরবের ইতিহাস, সুসমৃদ্ধ সাহিত্য ভা-ার। আমরা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখতে পাই বাংলাদেশের ৯০ ভাগ মুসলিম বসবাস করে। বেশির ভাগ মুসলিম আরবি ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চা করে। ওমর (রা.) বলেন, ‘তোমরা আরবি ভাষা ভালোভাবে শেখো। কারণ তা জ্ঞানকে সুদৃঢ় করে এবং ব্যক্তিত্ব বৃদ্ধি করে।’ ইসলামি জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে আরবি ভাষা চর্চার কোনো বিকল্প নেই। আধুনিক যুগে শুধু মুসলিম বিশ্ব না পশ্চিমারাও আরবি ভাষা ও সংস্কৃতির দিকে অধিক মাত্রায় ঝুঁকতে শুরু করেছে।
কোরআন, সুন্নাহ ও ফিকহের ভাষা আরবি। তাই এ ভাষা ছাড়া গভীরভাবে এগুলো চর্চা করার বিকল্প কোনা পথ নেই। ইসলামের হুকুম-আহকাম, নামাজ, রোজা, দোয়া সব কিছুই আরবি ভাষায়। তাই ইসলাম চর্চার ক্ষেত্রে আরবি ভাষার বিকল্প কল্পনা করা যায় না। মহান আল্লাহ আমাদের খুব গুরুত্বের সঙ্গে আরবি শেখার তওফিক দান করুন। যেন আমরা ইসলামকে ভালোভাবে জানতে পারি, কোরআন-হাদিস পড়ে বুঝতে পারি এবং সেই অনুযায়ী যথাযথ আমল করতে পারি।
