বিদায়ী স্যালুট, ‘প্রিয়তম শত্রু’

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৪, ১০:৫৮ এএম

আমরা তিনজন দাঁড়িয়ে আছি হাতিরপুলে একটা বাসার সামনে। অপেক্ষায়। কারও বাসার সামনে মানুষজন দল বেঁধে ওত পেতে থাকে দুটো কারণে। এক. পাওনা টাকা আদায়। দুই. জবরদস্তি করে কোথাও নিয়ে যাওয়া বা অপহরণ। এবং এই দাঁড়িয়ে থাকা তিনজনকে আপনার অপহরণকারী মনে হবে না; এদের শরীর ও চেহারা অপহরণকারী হিসেবে অযোগ্য। পাওনাদারও মনে হবে না, পোশাক-আশাকে ধার দেওয়ার ক্ষমতার কোনো চিহ্নই নেই। সাদামাটা, চোখে না পড়ার মতোই একেকজন। তাহলে এরা কারা?

রাত। তাই অন্ধকার। কত বছর পেরিয়ে গেল মাঝে। ২৫-২৬ হবে। তবু এই গভীর অস্পষ্টতাও কী স্পষ্ট হয়ে আসছে লিখতে বসে। আমরা তিন ক্রীড়া সাংবাদিক তাদের আরেক সতীর্থের বাসায় তাকে তাড়া করতে গিয়েছি এজন্য যে, সেই চতুর্থ মানুষটি যেন অবশ্যই আমাদের সঙ্গে নতুন মিশনে যোগ দেয়। নতুন মিশন বলতে নতুন চাকরি। প্রকাশিত হতে যাওয়া একটি দৈনিকে সে সঙ্গে না থাকলে তার খেলার পাতা জমবে না।

যখন জানবেন তিনজনের একজনের নাম উৎপল শুভ্র, তখন একটু থামবেন। উৎপল শুভ্র, সেই ১৯৯৮ সালে যিনি দেশসেরা ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে প্রায় জাতীয় পর্যায়ের সেলিব্রেটি, তিনি কি না মনে করছেন, এই একজনকে না পেলে তার চলবে না। সেই মানুষটি কে?

নাম অঘোর মন্ডল। অনেকেই চেনেন। যারা চেনেন না তারা এই লেখায় ধীরে ধীরে চিনবেন। যদিও ঠিক নিশ্চিত না যে চেনানো যাবে না। আমার নিজের চিনতেই অনেক বছর লেগেছে, যদিও পাশের টেবিলে বসে কাজ করেছি, কত দিন-রাত এক করেছি, তবু হাতের তালুতে থেকেও অপার রহস্য হয়েছিলেন বহুকাল। এমন রহস্য যে, সতীর্থরা মজা করে নানা নামে ডাকতেন। সেগুলোর অনেকগুলোই সম্মানজনক ছিল না। তিনি পাত্তা দিতেন না। শুধু ওদের হারাতেন। হারে জ্বালাতন বাড়ত। দলবদ্ধভাবে তৈরি হতো অঘোরবিরোধী তীব্র হাওয়া। হারাদের সংখ্যা এবং স্বর দুটোই জোরালো হয়ে থাকে। ফলে, এই বিরোধিতার তীব্রতায় ঢাকা পড়ে যেত অঘোরকীর্তি। এ কীর্তিগাথা তার মৃত্যুর মাস দুয়েক পর ওল্টাতে গিয়ে দেখি প্রত্যেকটা পাতাই এমন উজ্জ্বল যে, মনে হয় এখানেই আটকে রই এবং তখন এও মনে হয়, হয়তো প্রাপ্য মর্যাদা না পাওয়ার দুঃখেই সবাইকে রেখে এত আগে চলে যাওয়া। হয়তো না বলেও বলে গেলেন, তোমরা আমার বিরোধিতা করতেই থাকো। জীবনে বাধা দিইনি কোনোদিন। এখন তো কাজ আরও সহজ। 

আবার একভাবে দেখলে সেটারও দরকার ছিল না কোনো। কারণ, শেষ কয়েক বছর তো আসলে সেই বিরোধী হাওয়াটা ছিলই না। অঘোর মন্ডল বছর দশেক আগেই মূলধারার ক্রীড়া সাংবাদিকতা থেকে সরে গিয়ে খানিকটা আলোচনার বাইরেই চলে গিয়েছিলেন। গত ১০ বছর আলোচনার বাইরে, তার আগে আরও অন্তত ১০ বছর ফ্যাকাশে; পত্রিকা থেকে টিভিতে যাওয়ার পর হয়ে গেলেন দশজনের একজন। যোগ করে প্রায় ২০ বছর। দুই দশক আলোয় না থাকা একজন মানুষ কী করে আজও লেখার বিষয় হতে পারে! হয়, কারণ এর আগের ১০ বছর। সেই ১০ বছরেই... এবং সেই ১০ বছর তিনি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন। তার মতো করে আমাকে কেউ হারায়নি। তার মতো করে এ জীবনে কেউ আমাকে ভোগায়নি।

অসমাপ্ত গল্পে ফিরি। অঘোর মন্ডল ফিরছেন না। রাত বাড়ে। কিন্তু ফিরে যাওয়া যাবে না বলে গেড়ে বসি। মশা খুব বিরক্ত করছিল বলে তিনজনের একজন, সাইফুর রহমান খোকন একটা মশার কয়েল জোগাড় করে জ্বালিয়ে দিলেন। এক রিকশা ড্রাইভার বিষয়টার মধ্যে বিনোদন খুঁজে পেয়ে রিকশাসহ অবস্থান নিল। সেই রিকশায় বসে অপেক্ষা চলে। 
১১টা। ১২টা। একসময় অঘোর দাকে দেখা গেল। হাউসমেটের সঙ্গে এক রিকশায়। আর আমাদের দেখেই নেমে দৌড়। সঙ্গে সঙ্গে শুভ্রদাও দৌড়, ‘অঘোর... এই অঘোর...’
একজনকে তাড়া করছে আরেকজন। যথেষ্ট সন্দেহজনক দৃশ্য। পেছনে পেছনে দৌড়াল আরও কয়েকজন। ভাগ্যিস দেশ তখন এখনকার মতো অত কঠিন হয়ে যায়নি। নইলে সন্দেহবশত গণপিটুনি জাতীয় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাও সম্ভব ছিল।
এদিকে, খোকন ভাইয়ের চোখে পুরু চশমা। দূরের জিনিস খুব ভালো দেখেন না। তিনি সন্দিগ্ধ, ‘অঘোর না মনে হয়...’
আমি নিশ্চিত অঘোর দা। কিন্তু রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বাধ্য হয়ে খুব জরুরি একটা সারছিলাম বলে তখনই পিছু ধাওয়ায় অংশ নিতে পারলাম না। অতএব শুভ্রদা একাই দৌড়ালেন।

মিনিট দশেক পর হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে এসে ব্যর্থতার কথা জানালেন। অঘোর দা হাওয়া হয়ে গেছেন। এও অঘোর মন্ডল স্পেশাল। হাওয়া হয়ে যেতে পারতেন যখন-তখন। বিশেষত যখন রিপোর্টের স্বার্থে প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছ থেকে লুকানোর দরকার হতো তখন হয় পাখা ছড়িয়ে উড়ে যেতেন কিংবা সবার চোখে ধুলো মাখিয়ে দিতেন।

যাই হোক, আমরা তখন শুভ্রদাকে নিয়ে মজা করার একটা সুযোগ পেলাম। শুভ্রদার বিশ্বাস ছিল, পৃথিবীতে তার প্রেমিকা তাকে ছেড়ে যেতে পারলেও অঘোর দা ছেড়ে যাবেন না। তাই যখন তিনি শুনলেন যে, প্রকাশিতব্য প্রথম আলোতে যোগ না দিয়ে তিনি পুরনো প্রতিষ্ঠান ভোরের কাগজেই থেকে যেতে চান তখন রীতিমতো বাংলা সিনেমার ডায়লগের মতো করে বললেন, ‘আমি বিশ্বাস করি না।’

আমরা মাঠে-ঘাটে থাকারা জানি জল অনেক দূর গড়িয়েছে। কিন্তু দাদার এক কথা, ‘অসম্ভব, হতেই পারে না।’
‘পারে দাদা। অঘোর দাকে গভীর রাতে ভোরের কাগজে দেখা গেছে।’
‘সেটা হয়তো এমনিই গেছে।’
‘তাই বলে রাত ২টায় যাবে?’
শুভ্রদা একটু থামলেন। ‘তবু আমার মনে হয় একবার আমি কথা বললে...’
সেই কথা বলার জন্যই নৈশ অভিযান। ব্যর্থতায় শেষ হলো। ভাবলাম শুভ্রদার অঘোরপ্রীতি গেল। আসলে আরও তীব্র হয়ে ফিরল।

তিনি ঘোষণা করলেন, ‘অঘোর আসেনি। কাজেই ওর জায়গায় আমাদের দুজন নিতে হবে। অঘোর মন্ডলের কাজ এই শহরের কোনো রিপোর্টার একা পারবে না। দুজন নিতে হবে।’
দুজনের খোঁজ শুরু হলো। দুজন নেওয়াও হলো। এবং তারা ঠিক অঘোরের শূন্যস্থান পূরণ করতে পারলেন না। ভয় হচ্ছিল, শুভ্রদা না কখন ঘোষণা করেন, দুজনে তো হলো না, এবার তাহলে তিনজন নিয়ে দেখি।

ততদিনে প্রথম আলো বেরিয়ে গেছে। অঘোর মন্ডলের প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রচণ্ড উৎপাত সত্ত্বেও আমরা অন্যান্য দিক থেকে সামলে নিচ্ছি বলে সেই আলোচনা আর উঠল না। তাছাড়া শুভ্রদার কিছু ব্যক্তিগত সমস্যা তৈরি হয়েছিল বলে মনোযোগটা তখন একটু অন্যদিকে। আর এ সুবাদেই শুরু আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর ভোগান্তির অধ্যায়।

শুভ্রদা পত্রিকার সামগ্রিক বিন্যাস এবং অন্যান্য বিষয়ে ব্যস্ত। পবিত্র কুণ্ডুর ফুটবলে দক্ষতার কারণে তিনি ফুটবলমুখী এবং তখনো মুন্নারা আছেন বলে ফুটবলও একটা সেলিং পয়েন্ট ছিল। আমার সরু কাঁধে চাপল স্থানীয় ক্রিকেটের গুরু দায়িত্ব। উপভোগ্য ব্যাপার। পারলাম না। অঘোর মন্ডল আছেন যে। হয়তো কোনো একটা খবর অনেক খুঁজে পেতে বের করে এনে ভাবলাম, যাক আজ অন্তত একটা কিছু হলো। পরদিন জানা গেল কিছুই হলো না।

আমি হয়তো একটা খবর দিয়েছি। দেখা গেল, ভোরের কাগজে এর কয়েকগুণ বেশি এবং বিস্তারিত তথ্য।
এক রাতে বুলবুল ভাই, আমিনুল ইসলাম বুলবুল ইঙ্গিত দিয়ে বললেন, ‘শান্তর বিষয়ে একটু খোঁজ নিতে পারেন। শান্ত মোহামেডান ছাড়তে পারে।’
সেই সময়ে দেশের সেরা পেস বোলারের মোহামেডান ছেড়ে যাওয়া এত অবিশ্বাস্য খবর যে, বললাম- ‘আপনি নিশ্চিত?’
‘হুম।’
‘যাচ্ছেন কোথায়?’
‘ঠিক নিশ্চিত না। অনেকেই চেষ্টা করছে। বিমান-ব্রাদার্স-আবাহনীও আছে।’
লিখলাম। মোহামেডান ছাড়তে পারেন শান্ত। বিরাট খবর।
পরদিন ভোরের কাগজে তার চেয়েও অনেক বিরাট খবর, ‘মোহামেডান ছেড়ে আবাহনীতে শান্ত।’
সঙ্গে ছবিও আছে। আবাহনী ক্রিকেটে কমিটির চেয়ারম্যান মোস্তফা কামালের অফিসে বসে শান্ত।

কয়েক মাস পর পাকিস্তানের ভারত সফর। এক যুগ পর পাকিস্তান আসছে ভারতে। দুই দেশের মধ্যে সবসময়ই যুদ্ধ-যুদ্ধ ভাব। সেই সিরিজ যেখানে কুম্বলে ১০ উইকেট পেলেন। শোয়েব আখতার শূন্য রানে শচীনের স্টাম্প উড়িয়ে দিয়ে ইডেনকে শ্মশান বানালেন। তখন প্রথম আলো নতুন পত্রিকা। নতুনের উত্তেজনা বেশি থাকে। তাছাড়া তখনকার তারুণ্যের কাছে ভারত-পাকিস্তানটা এত বড় যে, ঠিক হলো রিপোর্টার পাঠানো হবে। কথা ছিল না কিন্তু নানান তালেগোলে সুযোগ পেয়ে গেলাম আমি। সেই আমি, তখন মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় বর্ষে উঠেছি, বয়সের কারণে অযোগ্য, লিকলিকে শরীরের কারণে আরও অযোগ্য, বিদেশে যাওয়ার আশু কোনো সম্ভাবনা না থাকায় পাসপোর্ট পর্যন্ত নেই। তবু চেন্নাইগামী বিমানে উঠলাম। সঙ্গে এই স্বস্তিও যে, এবার অঘোর মন্ডল নেই। নিশ্চিন্তে রিপোর্ট করা যাবে। অনেক স্কোর করব।

চেন্নাইতে খুব ঝামেলা হলো। প্রথম দুদিন ফোন-ফ্যাক্সে ন্যূনতম যোগাযোগ না করতে পারায় অফিস ভয়ই পেল। ছোড়াটা পৌঁছেছে তো। তৃতীয় দিনে ফোনের লাইন মিলল। কিন্তু ফ্যাক্স আর আসে না। শেষে বহু কায়দা করে ব্যবস্থা একটা হলো। কিন্তু এত অশান্তির মধ্যে শান্তি একটাই, অঘোর মন্ডল তো নেই! শান্তি বেশি দিন টিকল না। পরের টেস্ট দিল্লিতে। মাঠে গিয়েই দেখি সেই দুঃস্বপ্ন। অঘোর মন্ডল। তিনি দেখে হাসলেন। আমার হাসি গেল। 

২০০৩ বা ০৪ সালে অস্ট্রেলিয়া গেছি। ততদিনে প্রথম আলো অনেক এগিয়ে গেছে। ভোরের কাগজ নানান আর্থিক সংকটে এতটাই পিছিয়ে গেছে যে, অনেকে পত্রিকা ছেড়ে দিয়েছেন। যারা আছেন তারাও হালছাড়া। ঠিক লড়াইয়েই নেই। অঘোরদা ঠিকই আছেন। অফিস এখন আর ব্যয় বহন করতে পারে না কিন্তু তিনি নিজেই স্পন্সর জোগাড় করে সেই পৃথিবীর ও মাথায় গিয়ে আমার ঘুম হারাম করে রাখেন। তবে টাকা-পয়সা হাতে আসতে দেরি হয় বলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সিরিজ শুরুর পর গিয়ে পৌঁছান। সেবারও তাই। 

অস্ট্রেলিয়া সফরের ঠিক আগে ডেভিড হুকস নামের এক উচ্চম্মন্য ক্রিকেট ভাষ্যকার অদ্ভুত অপমানজনক এক থিওরি দিলেন। কীভাবে অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশকে একদিনেই হারাতে পারে। গিয়েই তাই খুঁজছিলাম হুকসকে। অনেক দূরের জায়গা ডারউইনে খেলা ছিল বলে হুকসকে পাওয়া গেল না। জানা গেল, সমান দুর্গম কেয়ার্নসেও তিনি আসবেন না। ধরার উপায়, ফোন। ফোন নাম্বার জোগাড়ের চেষ্টা করছি। এর মধ্যেই ঢাকা থেকে ফোন, ‘অঘোর তো হুকস মেরে দিল।’

এই ‘অঘোর মেরে দিল, অঘোর করে ফেলল’- বাক্যগুলো একবারে বিষবাক্য হয়ে কানের কাছে বাজত। ঘুম আসত না। মাঝে মাঝে মনে হতো, দূর ছাই। সব ছেড়েছুড়ে চলে যাই। সুবিধা একটাই, আমি একা তো আর হারি না। একবার পাকিস্তান সফরের সময় অবস্থা এমন হলো, প্রায় প্রতিদিন সকালে পুরো প্রেস বক্সের সবার মুখ ভার। কারণ, অঘোর মন্ডল এমন একটা খবর করেছে যে, বড় সব পত্রিকা পরাজিত। 

প্রতিদিনের পত্রিকায় নিয়ম করে ছয় কলাম বক্স, যাতে ভেতরের বিচিত্র খবর, যার আশপাশের তথ্যও নেই অন্য কোনো কাগজে। যার নাম হয়েছিল ‘অঘোরের আন্ডার আর্ম’। এই কখনো আন্ডার আর্ম, কখনো বাউন্সার, কখনো গুগলি খেয়ে খেয়ে সবার অবস্থা এমন যে, একটা অঘোরবিরোধী জোরালো জোট তৈরি হয়ে গেল। সচেতনে নয় কিন্তু খুবই সংঘবদ্ধ। রিপোর্ট নিয়ে খুব কিছু পারা যায় না, আবার থেমে থাকলেও চলে না। তাই ‘এমন কী রিপোর্ট এগুলো’ ‘আমি আগেই জানতাম’ জাতীয় কোরাস উঠত বিরোধী সভায়। এতেও খুব সুবিধা না হওয়াতে ব্যক্তি আচরণের দিকে গড়াত আড্ডা। তাতে অঘোরদার দোষ বের করা এমন কিছু সমস্যা নয়। বরং নানান অদ্ভুত কাণ্ডে সেগুলোকে সহজ করে দিতেন তিনি।

খুব বেশি মানুষের সঙ্গে মিশতেন না বা মিশলেও তার মধ্যে একটা লুকানোর ব্যাপার থাকত। আবার লুকাতে গিয়ে ধরাও পড়তেন। সেসব গল্প নানা রঙ ডালপালা ছড়াত আর তাতে ঢাকা পড়ে যেতে রিপোর্টজনিত কৃতিত্ব। অঘোরদাবিরোধী প্রচারণায় কাঁচামাল জোগান দিত তার শিষ্যরা। প্রধানত তার সঙ্গে কোনো একসময় কাজ করারা। সাধারণত এরা অঘোরবিরোধী। কবে কাকে কী বলতে গিয়ে ধরা খেলেন। কারও ফোন নম্বর চাইলে দেন না, কোনো সোর্সের সঙ্গে সতীর্থের ঘনিষ্ঠতায় বাধা হয়ে দাঁড়ান- এসব দূষণীয় ব্যক্তিচরিত্র প্রকাশ করে অঘোরীয় কীর্তিকে ছোট করে দিত বা দেওয়ার চেষ্টা করত।

তখন ভাবিনি, সময়ে বুঝেছি, সঙ্গে যারা কাজ করত তাদের ক্ষোভের অনেক কারণের মধ্যে এটাও ছিল যে, তিনি কাজের জন্য খুব চাপ দিতেন। সেই চাপ অনেকে সামলাতে পারত না। তাছাড়া ভোরের কাগজে বেতন-ভাতা অনিয়মিত হওয়াতে কেউ থাকতেও চাইত না। ফলে ভোরের কাগজ ছেড়ে আসা অনেক লোক। অনেক বিরুদ্ধবাদী।
দোষ ছিল আরেকটা। খুব সকালে হাঁটতে বেরোতেন। তারপর সেই সাতসকালে অফিসে ঢুকে বসতেন পত্রিকার ফাইল নিয়ে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব পত্রিকা পড়েন এবং এটুকুতেই থেমে না থেকে কোন পত্রিকায় কে কী ভুল করল সেটা ধরে মনে রেখে দিতেন। তারপর সুবিধাজনক সময়ে তাকে বলতেন, ‘তোমার ওই রিপোর্টে তো অনেক ভুল। কী লিখেছ?’
কখনো আবার তার বসকে হয়তো দেখা হলে বলে দিচ্ছেন, ‘ওর দিকে একটু খেয়াল রাখবেন। অনেক সময় ভুল লিখে দেয়।’

ভুল ধরা কেউ ভালোবাসে না। কাজেই একেকটা ভুলে একেকজন বিরুদ্ধ পক্ষে যেত এবং অঘোরবিরোধী হাওয়া রীতিমতো ঝড়ের আকার নেয়। সম্পর্ক বা সহকর্মীদের মূল্যায়ন পরবর্তী ক্যারিয়ার তৈরিতে একটা ভূমিকা রাখে। অঘোরদার ক্ষেত্রে এরাই হয়ে গেলেন বাধা। তাই পরে যে বড় বা ভালো কোনো পত্রিকায় যেতে পারলেন না তার কারণ বোধহয় এটাই। তার নাম সম্ভাব্য তালিকায় উঠলেই কেউ না কেউ বাধা দিত, ‘আরে সাংবাদিক ভালো। কিন্তু কারও সঙ্গে বনে না...’

ব্যস, তালিকা থেকে বাদ পড়ে যেতেন। কত পত্রিকা বেরোয় নতুন আয়োজনে কিন্তু অঘোর মন্ডল আর নিজেকে প্রকাশের বড় কোনো প্ল্যাটফর্ম পেলেন না। বাধ্য হয়ে শেষে গেলেন টেলিভিশনে। অন্য কেউ অন্যরকম মত দিতে পারেন কিন্তু আমার মনে হয়, রিপোর্টার অঘোর মন্ডলের মৃত্যুও হলো তাতে। একে তো বাংলাদেশের টেলিভিশন সেই ২০০৬-০৭ সালে অতটা পেশাদার হয়নি যে তার মতো রিপোর্টারকে ধারণ করতে পারবে। তাছাড়া টেলিভিশনের জায়গাটা অনেকটা ফরম্যাটেড, ঠিক তার নিজেকে প্রকাশ করার মতো নয়। ওদিকে বাগেরহাট বাড়ি হওয়ায় খুলনা অঞ্চলের টানও ছিল ভাষায়। নতুন আসা প্রযুক্তির কাছে আমরা তখন শিশু, অঘোরদা তারও পেছনে, প্রায় নবজাতক। ২০০৭ বিশ্বকাপে টিভি লাইভ করার জন্য কিছু ডিভাইস-টিভাইস বহন করলেন। এক রাতে নিচে নেমেছি, অঘোরদা চিৎকার করে ডাকলেন, ‘মামুন আসেন, একটু দেখেন তো’...
‘কী হয়েছে দাদা।’
‘দেখেন তো, আমার লেখা সব কালো হয়ে গেছে।’
কাছে গিয়ে দেখি, কোনো একটা বাটনে টিপ গেলে লেখা সব সিলেক্ট হয়ে গেছে। তাকেই তিনি মনে করছেন কালো হয়ে যাওয়া। এবং তাতেই গভীর জলে। নিজে এমন কোনো পণ্ডিত নয়। তবু পাণ্ডিত্য দেখিয়ে সিলেক্ট, ফাইল সেভসহ আরও কিছু দেখিয়ে দিলাম এবং জীবনে সেই একবার বিনা প্রতিবাদে অঘোরদা সব মেনে নিলেন।

অঘোরদা মানেই সব বিষয়ে অন্যের চেয়ে একটু বেশি জানার ভান করা, তর্কে লিপ্ত হওয়া- সেই তিনি চুপ ও অসহায়। সেই রাতেই মনে হলো, আমার ‘শত্রুর’ মৃত্যু হয়েছে। অঘোরদা আর লড়াইয়ে নেই। ক্রিজ ছেড়ে প্যাভিলিয়নে।
‘মৃত্যুর’ আগে যন্ত্রণা করেছেন আরও বহু। সফরে গেলে তার গতিবিধির দিকে নজর রাখতে হতো। রাতে ঘুমানোর সময়ও মনে হতো, কখন কোথায় চলে যান। তাই ঠিক করলাম, এবার সঙ্গে রাখতে হবে। রুমমেট বানিয়ে নেব প্রয়োজনে। বানিয়ে ফেললাম। ২০০২ শ্রীলঙ্কা সফরে ঠিক রুমমেট না হলেও এক হোটেলে পাশাপাশি রুমে থাকি।
একদিন দেখি একটা রঙচঙা কেডস কিনে নিয়ে এসেছেন। কেডসের প্রতি একটা আকর্ষণ ছিল জানতাম। নিজে থেকেই বললেন, ‘সকালে হাঁটব ভাবছি। সাগরপাড়ে হাঁটতে ভালোই লাগল।’ পরদিন সকাল থেকে তুমুল উদ্যমে হাঁটতে লেগে গেলেন।

সেবার আমাদের সবার আকর্ষণ অর্জুনা রানাতুঙ্গা। ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপ জেতা পুরনো হয়ে গেছে কিন্তু এর মধ্যে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে তিনি তখন ক্রীড়ামন্ত্রীই সম্ভবত। সবাই যার যার মতো চেষ্টা করছি তার সাক্ষাৎ পেতে। স্থানীয় সাংবাদিকদের ধরাধরি চলছে।

এর মধ্যে একদিন ভোরের কাগজে অর্জুনার সাক্ষাৎকার। সবাই যথারীতি পরাজিত। কিন্তু পেলেন কীভাবে? আমরাও তো চেষ্টা করেছি, যেখানে রানাতুঙ্গা তরফে জবাবটা ছিল, তিনি বাংলাদেশের সব সাংবাদিককে একসঙ্গে দেখা দেবেন। সময়টা দুয়েক দিনের মধ্যে চূড়ান্ত হবে।
তাহলে! কোনো কারসাজি আছে হয়তো। ধরলাম গিয়ে।
‘রানাতুঙ্গাকে পেলেন কোথায়?’
‘সকালে মর্নিং ওয়াক করতে গিয়ে।’
‘মানে?’
‘সেও সকালে একটা পার্কে হাঁটে।’
ঠিক বিশ্বাস হলো না। বানিয়ে লিখেছেন কি না, এমন কিছু ইঙ্গিতও থাকল কথায়। 
প্রেস বক্সে গিয়ে জানলাম ঘটনা। আমরা রানাতুঙ্গাকে পেতে চেষ্টা করেছিলাম স্বাভাবিক রিপোর্টারসুলভ নিয়মে কিন্তু তিনি হেঁটেছেন যথারীতি নিজের আবিষ্কৃত গলিপথে। স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, রানাতুঙ্গা সকালে মর্নিং ওয়াকে বেরোন। তাই কেডস কেনা। তার সঙ্গে পার্কে হাঁটতে যাওয়া। 

একে হার। তার ওপর এভাবে ফাঁকি দেওয়া। মেজাজ ঠিক থাকল না। মনে হলো, প্রতারণা করেছে সবার সঙ্গে। কিন্তু পরে সেই লড়াইয়ের কাল পেরিয়ে আসার পর ঘটনাটা মনে হলে মাথা নুয়ে আসে। আর মুখে আসে একটাই শব্দ, ‘স্যালুট’। হেরেছি কিন্তু যে জিতেছিল সে ছিল জয়েরই যোগ্য। 

একভাবে দেখলে আমাদের অঘোরদা হারাননি, শিখিয়ে গেছেন। কীভাবে রিপোর্ট-কাজের জন্য নিজেকে সঁপে দিতে হয়। আর তাই এখন সাংবাদিকতা সম্পর্কে, নতুন প্রজন্মের রিপোর্টারদের টিপস দিতে গেলে মনে হয়, মোটা মোটা জ্ঞানের বই পড়া কিংবা লাইব্রেরি ঘাঁটার চেয়ে বরং আইডিয়াল ম্যানুয়াল হলো, অঘোর মন্ডলের দিনলিপি পাঠ। তার দৈনিক সূচি জেনে সেইমতো চললেই হবে শুধু।

পরের প্রজন্মের জন্য অঘোর মন্ডল পাঠ আরও জরুরি এজন্য যে, অঘোরদা একভাবে দেখলে খুব অক্ষম ছিলেন। বলার মতো তেমন কিছু পারতেন না। কথায় আঞ্চলিকতা, খুব কোনো কারিশমা ছিল না যে আলাদা করে চোখে পড়ে যাবেন। সাজপোশাকও সাধারণ, মাঝেমধ্যে খুব গোছালো সাজতে গিয়ে একটু বেখাপ্পাও। একসময় পুরু গোঁফ ছিল যে, আমরা তাকে চেনাতে গেলে বলতাম, যার মুখের আগে গোঁফ দেখা যাবে তিনিই অঘোর মন্ডল। পরে গোঁফ ছেঁটে ফেললেন। কেন যে সেটা আর জিজ্ঞেস করা হয়নি। এজন্য নয় যে প্রশ্নটা মনে আসেনি। জিজ্ঞেস করলে কথা ঘোরাবেন-প্যাঁচাবেন, রহস্য করবেন তাই খুব আগ্রহ দেখাইনি। আরও কত না পারা; ঘাটতি। কিন্তু সব ঘাটতি শক্তিতে পরিণত করেছেন শিখে শিখে। তিল তিল করে তৈরি এক অদম্যর গল্প যার পথচলা এত সাদামাটা, দেখলে মনে হবে এই এখনই হোঁচট খাবে। কিন্তু শেষে সেই সবার আগে তীর্থে।

ইংরেজি খুব ভালো বলতে পারতেন না। শিখেছেন। নিজে নিজে। কোনোদিন স্বীকার করেননি কিন্তু আমি নিশ্চিত লুকিয়ে লুকিয়ে বাসায় প্র্যাকটিস করতেন। কারণ, ভোরের কাগজে সতীর্থ থাকার সময় যে মানুষটাকে দেখেছি ইংরেজি বলার কোনো প্রসঙ্গ এলে অন্যদের সামনে ঠেলে দিতেন, সেই তাকে কয়েক বছর পর দেখি দিব্যি স্টিভ ওয়াহর সঙ্গে আড্ডা মারছেন।

একবার ট্যুরে গিয়ে দেখি, একজন নামি সাংবাদিকের বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছেন। বুঝতে পারি, পরদিনের লেখার ভাষাটা আকর্ষণীয় করতে। খেয়াল করছি বুঝে লজ্জা পেয়ে লুকিয়ে ফেললেন। আমরা লজ্জাটা আরেকটু বাড়ানোর চেষ্টা করলাম। আজ বুঝি তাকে লজ্জা দেওয়ার চেষ্টাটাই ছিল লজ্জার। একজন মানুষ নিজের রিপোর্ট উন্নত করতে পড়ছেন রাত জেগে- এমন নিবেদন কোথায় মেলে কোন কালে। কাঠখোট্টা লেখা ছিল একসময়। ঘষেমেজে সেই তিনিই একসময় আকর্ষণীয় লেখক। প্রায় মাঝ বয়সে গিয়ে নিজেকে এমন তিলে তিলে তৈরির উদাহরণ বিরলের চেয়েও বেশি কিছু। পুরো আশির দশকের গাজী মাজহারুল আনোয়ারদের সামাজিক সিনেমার মতো, মফস্বলের ভালো ছেলে সব ঠেলে বড় হওয়ার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে জীবনভর।

ও হ্যাঁ, সিনেমার সঙ্গেও তার একটা যোগসূত্র আছে। ক্রীড়া সাংবাদিকতায় আসার আগে সেখানেও ভাগ্য পরীক্ষা করেছেন। ছিলেন সিনেমার সহকারী পরিচালক। বিষয়টাতে তিক্ত অভিজ্ঞতা ছিল বলে নিজে থেকে কোনোদিন বলতেন না। প্রশ্ন করলেও এদিকে-ওদিক ঘুরিয়ে দিতেন। একদিন চট্টগ্রামে এক রাতে আবিষ্কার করি, একটা পুরনো সিনেমার শেষে ক্রেডিট লাইনে লেখা- সহকারী পরিচালক অঘোর মন্ডল। খোঁজখবর করে খুব কিছু মিলল না। শুধু জানা গেল, সেখানেও এক পরিচালক তাকে বড্ড ঠকিয়েছেন। পুরনো কিছু সতীর্থের কাছে শোনা গল্প, সেই সময় পত্রিকায় সিনেমাসংক্রান্ত প্রেস রিলিজ দিতে এসে সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পর্কের শুরু। তারপর ওঠানামায় তিন দশক।
অঘোর মন্ডল যে ধর্ম পালন করতেন তাতে পরজন্ম আছে। যদি সত্যিই তা থেকে থাকে এবং আবার আবির্ভূত হন অঘোরদা তাহলে এটাই চাইব যেন আরও কিছু জন্মগত সামর্থ্য নিয়ে আসেন। যেন আমাদের অঘোরদাকে এমন সংগ্রাম করতে না হয়। এবং যে চেষ্টা এই জীবনে ছিল সেটা নিশ্চিতভাবে জানি সে জীবনেও সেটা থাকবে। আর কী যে সব অনন্য কাজ হবে। 

আর তখনকার পৃথিবীর কাছেও চাওয়া থাকবে একটা। জীবনে যেন এমন বঞ্চনা ভোগ করতে না হয়। ৩০ বছরের ক্যারিয়ারে বলতে গেলে মাত্র ১০ বছর পারলেন নিজেকে প্রকাশ করতে। বাকিটা সময় বঞ্চিত হলেন। পাওয়ার চেয়ে বেশি ভুগলেন না পাওয়ার যন্ত্রণায়। আর শেষে শারীরিক যন্ত্রণায়ও। খুব বেশি দেখা হতো না শেষদিকে, শুনতাম বন্ধুর এক ফার্মেসিতে বসে সময় কাটাতেন আর সম্ভবত না মেলা হিসাবটা মেলানোর চেষ্টা করতেন। হিসাব মেলে না। পৃথিবী যাকে দেবে না বলে ঠিক করে তাকে দেয়ই না। আবার দেয়ও। অসুখবিসুখ। দুশ্চিন্তায় ডায়াবেটিস বাড়ল। কিডনি বিগড়াল। সারা জীবন লড়ে যাওয়া মানুষটাকে সম্ভবত লড়িয়ে হিসাবে পৃথিবীর খুব পছন্দ হয়েছিল। তাই অসুখের সঙ্গে তাকে একটা অসম ম্যাচে নামাল। সেই ম্যাচ অসময়ে শেষ করে তিনি চললেন ৬০ বছর বয়সেই।

সময় শেষ শেষদিকে সবাই জানতাম। ক্ষণটা কখন তারই অপেক্ষা যেন। কী লড়াই লড়ল...। বেশি কিছু না পারলেও মেয়েটার মধ্যে নিজেকে কিছুটা সঞ্চার করেছেন যেন। সেই লড়াই। সেই সাহস। আম্পায়ার আউটের ডিসিশন দিয়ে দিয়েছেন জেনেও সে মানতে রাজি নয়। রিভিউ নেওয়ার মতো লড়ে গেল বাবাকে নিয়ে।
পারল না। স্রষ্টাও প্রাপ্যটা তাকে দেননি। পৃথিবীও দিল না। অঘোরদা চললেন। আর পেছনে রেখে গেলেন পরাজিত আমাদের।
তাদের একজন হিসেবে পেছন ফিরে নিজের হারে খুব বেশি বেদনার্ত হই না। আমার হারের চেয়ে হারানোর কারিগরের কীর্তিটাই বড় হয়ে ভাসে।
অত বড় প্রতিপক্ষের মধ্যে হারেও শান্তি আছে। শিক্ষা আছে।
অঘোরদার কাছে হার তাই মাথা নুইয়ে ফেলার অপরাধ নয়। বরং মাথা উঁচু করতে হবে। ডান হাতটা নিতে হবে মাথার কাছে। তারপর সালাম দিয়ে গভীর ভালোবাসায় বলতে হবে, ‘স্যালুট, প্রিয়তম শত্রু।’

লেখক : সম্পাদক, দেশ রূপান্তর

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত