ঢালিউডের ‘লাইলী’র জীবনাবসান

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২৫, ০১:৩৩ পিএম

না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন চিত্রনায়িকা অঞ্জনা রহমান। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার রাত ১টা ১০ মিনিটে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

২৪ ডিসেম্বর নায়িকা অঞ্জনাকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তখন তার জ্বর ছিল। পরে চিকিৎসকরা জানান, তার ব্লাড ইনফেকশন সারা শরীরে ছড়িয়ে গেছে। এর ফলে হার্ট ও কিডনিতে সমস্যা দেখা দেয়। ফুসফুসে পানি জমেছে। এর মধ্যে স্ট্রোকও হয় একবার।

শিশুকাল থেকেই নৃত্যের প্রতি ছিল প্রবল আগ্রহ। মা-বাবার ইচ্ছায় সে হিসেবেই গড়ে উঠছিলেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মাত্র চার বছর বয়সে নৃত্যশিল্পী হিসেবে মঞ্চে অঞ্জনার আত্মপ্রকাশ ঘটে। এরপর আর থেকে থাকেননি। নৃত্যশিল্পী হিসেবে ছোট থেকেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পারফর্ম করেছেন। 

একই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হলের একটি অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন তিনি। পুরস্কার হিসেবে তৎকালীন গভর্নর খুশি হয়ে তাকে ২০০ টাকা পুরস্কার দিয়েছিলেন। সেই ছোট্ট শিশুটি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন নায়িকা অঞ্জনা হিসেবে। সিনেমায় আসার আগেই অবশ্য নৃত্যশিল্পী হিসেবে পরিচিতি পান অঞ্জনা।

সত্তর থেকে নব্বই দশক ঢালিউডের স্বর্ণালি সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী অঞ্জনা রহমান। নায়িকা হিসেবে বহু সিনেমায় অভিনয় করে দর্শকদের মন জয় করেছিলেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিন শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন অঞ্জনা। শুধু বাংলাদেশই নয়, ৯টি দেশের ১৩টি ভাষার সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি।

১৯৬৫ সালের ২৭ জুন ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন অঞ্জনা। ছোটবেলা থেকে নৃত্যের প্রতি আগ্রহ ছিল। তাই মা-বাবা তাকে ভারতে নৃত্য শেখার জন্য পাঠান। সেখানে তিনি ওস্তাদ বাবুরাজ হীরালালের অধীনে নাচের তালিম নেন ও কত্থক শিখেন। নৃত্যে তিনবার জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন অঞ্জনা। একবার এশিয়া মহাদেশীয় নৃত্য প্রতিযোগিতায় প্রথম হন।

অঞ্জনার অভিনয় জীবন শুরু হয় ১৯৭৬ সালে বাবুল চৌধুরী পরিচালিত ‘সেতু’ সিনেমা দিয়ে। তবে তার অভিনীত প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা শামসুদ্দিন টগর পরিচালিত ‘দস্যু বনহুর’ (১৯৭৬)। এরপর থেকে সাফল্যের সঙ্গে তিনি বিভিন্ন সিনেমায় অভিনয় করেন। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, তুরস্ক, থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি।

তার অভিনীত বাংলা সিনেমাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘অশিক্ষিত’, ‘জিঞ্জীর’, ‘আশার প্রদীপ’, ‘আশার আলো’, ‘আনারকলি’, ‘সুখে থাকো’, ‘সানাই’, ‘বৌ কথা কও’, ‘অভিযান’, ‘রাম রহিম জন’, ‘রূপালি সৈকতে’, ‘মোহনা’, ‘পরিণীতা’ ইত্যাদি।

এক সময়ের শীর্ষ সব অভিনেতার সঙ্গেই কাজ করেছেন অঞ্জনা। তাদের মধ্যে আছেন রাজ্জাক, আলমগীর, জসিম, বুলবুল আহমেদ, জাফর ইকবাল, ওয়াসিম, উজ্জ্বল, ফারুক, ইলিয়াস জাভেদ, ইলিয়াস কাঞ্চন, সোহেল চৌধুরী, রুবেল, সুব্রত বড়ুয়া, মান্না প্রমুখ। এ ছাড়া মিঠুন চক্রবর্তী (ভারত), ফয়সাল (পাকিস্তান), নাদিম বেগ (পাকিস্তান) জাভেদ শেখ (পাকিস্তান), ইসমাইল শাহ (পাকিস্তান), শীবশ্রেষ্ঠ (নেপাল) ও ভূবন কেসির সঙ্গে অভিনয় করেছেন। 

নিজের সেরা সময়ে ঢাকাই সিনেমার প্রথম সারির প্রায় সব নায়কের বিপরীতেই অভিনয় করেছেন অঞ্জনা। ‘দস্যু বনহুর’ দিয়ে পরিচিতি পেলেও অভিনেত্রী মনে করতেন আজিজুর রহমানের ‘অশিক্ষিত’ তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। এ ছবিতেই প্রথম একক নায়িকা হিসেবে দেখা যায় তাকে। এ ছবিতে রাজ্জাকের বিপরীতে ‘লাইলী’ চরিত্রে সুযোগ দেওয়ায় নির্মাতা আজিজুর রহমানের কাছে কৃতজ্ঞ ছিলেন অভিনেত্রী।

তবে একই পরিচালকের আরেকটি ছবি নিয়ে জীবনভর আফসোসে পুড়েছেন তিনি। সেটা হলো ১৯৮০ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমা ‘ছুটির ঘণ্টা’। এ ছবিতে চূড়ান্ত হওয়ার পরও বাদ পড়তে হয় অঞ্জনাকে।

১৯৮১ সালে ‘গাংচিল’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন অঞ্জনা। এরপর ১৯৮৬ সালে ‘পরিণীতা’ সিনেমায় ললিতা চরিত্রে অভিনয় করে পুরস্কার পান। এ ছাড়া তিনি ‘পরিণীতা’, ‘মোহনা’ ও ‘রাম রহিম জন’ সিনেমার জন্য তিনবার বাচসাস পুরস্কার পেয়েছেন।

অভিনয়ের পাশাপাশি অঞ্জনা চলচ্চিত্র প্রযোজনাও করেছেন। তার প্রযোজিত চলচ্চিত্রগুলো হলো ‘নেপালী মেয়ে’, ‘হিম্মতওয়ালী’, ‘দেশ বিদেশ’, ‘বাপের বেটস’, ‘রঙিন প্রাণ সজনী’, ‘শ্বশুরবাড়ি’, ‘লাল সর্দার’, ‘রাজা রানী বাদশা’, ‘ডান্ডা মেরে ঠান্ডা’, ‘বন্ধু যখন শত্রু’ ইত্যাদি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত