গাজীপুরের কালিয়াকৈরে দিগন্ত জুড়ে হলুদ সমারোহে বাড়তি আয়ের উৎস বাণিজ্যিকভাবে মৌচাষ। সংগৃহীত মধু বিক্রির আয়ের টাকায় চলে ১০-১২টি পরিবারের সংসার। সরিষার মৌসুমে প্রায় অর্ধ কোটি টাকার মধু বিক্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। সরিষা ফুল থেকে মৌমাছির মাধ্যমে মধু সংগ্রহ করায় বাড়ছে সরিষার উৎপাদন। বাড়তি সরিষা উৎপাদন ও মধু সংগ্রহের ফলে একদিকে দেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে, অন্যদিকে মধুতে দেশের ভিটামিন-এ এর ঘাটতি পূরণ হচ্ছে।
এলাকাবাসী, মৌচাষি, কৃষক ও উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কালিয়াকৈরে আমন ধান কাটার পরে বোরো ধানের চারা রোপণের মধ্যবর্তী সময়টাকে কাজে লাগাতে কৃষকরা আবাদ করেন সরিষা। মধ্যবর্তী সময়ে ১০০ থেকে ১২০ দিনে এ ফসল ঘরে তোলা যায় বলে সরিষা চাষে উৎসাহী অনেক কৃষকই। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ১ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ করা হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ৫ হেক্টর বেশি। সকালের মিষ্টি সোনা রোদে আরও চকচক করছে সর্ষে হলুদের দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ। , পথেঘাটে মাঠে সরিষা ফুলের ম ম গন্ধ, আর বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে শুধুই হলুদ রঙের সমারোহ।
এখানে মৌচাষের জন্য ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। আর এ হলুদের সমারোহ কাজে লাগিয়ে ঢালজোড়া ইউনিয়নের বেনুপুর এলাকায় মোহাম্মদ আলী নামে এক চাষি পাশের দেওয়ারবাজারে বাণিজ্যিকভাবে মৌচাষ করেছেন। তার মৌচাষে তিনিসহ ৩-৪ জন লোক কাজ করেন। অপরদিকে পাশের বাঙ্গুরী এলাকায় ঢাকা থেকে প্রশিকা নামে একটি এনজিও এসে মৌচাষ করেছে। তাদের মৌচাষেও ৩-৪ জন লোক কাজ করেন। সব মিলিয়ে মোট ৩৩০টি মৌবাক্স বসানো হয়েছে বলেও জানিয়েছে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বসানো মৌবাক্স থেকে মৌমাছিরা উড়ে গিয়ে পাশের সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে আবার মৌবাক্সের ভেতর চলে যাচ্ছে। বাক্সের ভেতরে মৌচাকে মধু সংগ্রহ করছে মৌমাছিরা। প্রতিটি বাক্সের ভেতরে ৬ থেকে ৮টি ফ্রেমে মৌচাক থাকে। সপ্তাহ খানেক পর পর এসব মৌবাক্স থেকে মৌমাছি সরিয়ে মৌচাক বের করা হয়। পরে মৌচাক একটি স্টিলের ড্রামের ভেতরে নিয়ে ঘূর্ণায়মান যন্ত্রের মাধ্যমে মধু বের করা হয়। এসব মধু সংগ্রহ করে ড্রামভর্তি করা হয় এবং বাজারজাত করা হয়। সপ্তাহে বাক্সপ্রতি ৩ থেকে ৪ কেজি মধু উৎপাদন করা যায়। সে হিসাবে সপ্তাহে ৩৩০ মৌবাক্সে প্রায় ৯৯০ থেকে ১৩২০ কেজি মধু উৎপাদন হয়। বর্তমান প্রতি কেজি মধুর বাজার মূল্য ৫০০ টাকা। সে হিসাব অনুযায়ী এ সরিষা মৌসুমে প্রায় অর্ধ কোটি টাকার মধু বিক্রি করার সম্ভাবনা রয়েছে। এখানকার এসব মধু খাঁটি, স্বাদ ও গুণগতমান অনেক ভালো হওয়ায় কিনে নিচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসহ স্থানীয় লোকজন। তাদের সংগৃহীত মধু বিক্রির আয়ের টাকায় চলে ১০-১২টি পরিবারের সংসার। অল্প পুঁজিতে বেশি লাভবান হওয়ায় অন্য যুবকরাও মৌচাষে আগ্রহী হচ্ছেন। অপরদিকে মৌচাষের কারণে পরাগায়ন বেড়ে যাওয়ায় সরিষা ফসলের উৎপাদন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়ে যায়। ফসলের গুণগতমানও ভালো হয়। আর বাড়তি সরিষা উৎপাদন ও মধু সংগ্রহের ফলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে। স্থানীয় কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে সরিষা চাষে বেশ মুনাফা হয়। আর সরিষা ফুল ও পাতা ঝরে পড়ায় জমি বেশ উর্বর হয়। সরিষা কাটার পর ওই জমিতে বোরো ধান আবাদ করলে সারের পরিমাণ কম লাগে। ফলে ধান চাষে উৎপাদন খরচ কমে যায় ও ফলনও হয় ভালো।
মৌচাষি মোহাম্মদ আলী বলেন, ৬ বছর ধরে মৌচাষ করছেন। মৌচাষে কৃষি কর্মকর্তারা সহযোগিতা করে। এখানে জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত মৌচাষ করা যাবে। ফেব্রুয়ারির ১ম সপ্তাহে মৌবাক্স নিয়ে ফরিদপুরের কালোজিরার মাঠে যাবে। আবার কালিয়াকৈর উপজেলা মেদীআশুলাই লেচু বাগান, মধুপুর রাবার বাগানে মৌবাক্স বসাব। এরপর যেখানে তিল চাষ হয়, সেখানেও মৌবাক্স বসাব। কারণ মৌচাষ করেই আমাদের কয়েকটি পরিবারের সংসার চলে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, এখানে এবার লক্ষ্যমাত্রার বেশি সরিষা আবাদ করা হয়েছে। এবার সরিষার বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। আর এ হলুদের সমারোহে ৩টি মৌখামারি মোট ৩৩০টি মৌবাক্স স্থাপন করেছে। সেখান থেকে তারা মধু উৎপাদন ও বিক্রি করছেন। তাদের আয়ও ভালো হচ্ছে। পাশাপাশি স্বল্প পুঁজিতে বেশি লাভ হওয়ায় অন্য যুবকরাও মৌচাষে আগ্রহী হচ্ছেন। আর মৌচাষের কারণে পরাগায়ন বেড়ে যাওয়ায় সরিষা ফসলের উৎপাদন বেড়ে যায়। ফসলের গুণগতমানও ভালো হয়।
