শীতকালীন ডায়রিয়ায় আক্রান্তের ৮০ ভাগই শিশু

২৪ ঘণ্টায় শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে ৪ মৃত্যু

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৫, ০৮:২৪ এএম

দেশে শীতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শীতকালীন রোগের প্রকোপ বাড়ছে। বিশেষ করে শীতকালীন ডায়রিয়ায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। তাদের বেশিরভাগই শিশু। এ ছাড়া নিউমোনিয়া, ব্রংকিওলাইটিস, হাঁপানি ও শ্বাসকষ্টসহ শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণজনিত রোগেও আক্রান্ত হচ্ছে সব বয়সী মানুষ। হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে শীতজনিত রোগীর চাপ বাড়ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় শীতজনিত শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে চারজন মারা গেছে। তাদের মধ্যে একজন ময়মনসিংহ, একজন খাগড়াছড়ি ও দুজন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাসপাতালে ভর্তি ছিল। এ সময় সারা দেশে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২ হাজার ৪১২ ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে ৭৪৫ জন।

রাজধানীতে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে শীতকালীন ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি রোগী আসছে মহাখালীর আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) কলেরা হাসপাতালে। প্রতিদিনই সেখানে ভর্তি হচ্ছে  ৬০০-৭০০ রোগী। এসব রোগীর ৮০ শতাংশেই শিশু। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হাসপাতালের সামনে অতিরিক্ত তাঁবু গেড়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ।

আইসিডিডিআর,বির তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রবিবার বেলা ৩টা পর্যন্ত ৩৫৩ জন ডায়রিয়ার রোগী ভর্তি হয়েছে। শনিবার ভর্তি হয়েছিল ৬৭১ জন। গত ৯ দিনের মধ্যে এই হাসপাতালে সর্বোচ্চ ডায়রিয়ার রোগী ছিল গত বছর ৩০ ডিসেম্বর, ৯১৩ জন। এ ছাড়া ২৮ ডিসেম্বর ৮৯১, ২৯ ডিসেম্বর ৮২৬, ৩১ ডিসেম্বর ৮৮৪, এ বছরের ১ জানুয়ারি ৮৫০, ২ জানুয়ারি ৭৩৮ ও ৩ জানুয়ারি ৬৪৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছে।

বর্তমান সময়ে ৪০-৫০ শতাংশ রোগীর ডায়রিয়া রোটাভাইরাসের কারণে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আইসিডিডিআর,বির বিজ্ঞানী ডা. লুবাবা শাহরিন। তিনি বলেন, বাকি ৫০ শতাংশ ডায়রিয়া হচ্ছে অন্য ভাইরাস কিংবা ব্যাকটেরিয়ার কারণে। এই শীতকালে যে ডায়রিয়া হচ্ছে তার বড় কারণ ভাইরাস। প্রতি বছর শীতকালে ডায়রিয়া রোগী আসে। তবে এ বছর রোগী কিছুটা বেশি। গত দুই সপ্তাহে এখানে আসা রোগীদের ৮০ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের নিচের বয়সী শিশু।

এই চিকিৎসক পরামর্শ দিয়ে বলেন, কারও অতিরিক্ত বমি হলে, কিছু খেতে না পারলে, আচরণগত পরিবর্তন দেখা দিলে, অনেক জ্বর থাকলে, পায়খানার সঙ্গে রক্ত গেলে তাকে অবশ্যই হাসপাতালে আনতে হবে। এখন সবাইকে বিশুদ্ধ পানি ও গরম খাবার খেতে হবে। হাত ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। মলমূত্র ত্যাগ করার পর শিশুকে পরিষ্কার করে সাবান দিয়ে হাত অবশ্যই ধুতে হবে। শিশুকে প্রতিবার খাবার খাওয়ানোর আগে হাত সাবান দিয়ে ধুতে হবে।

হবিগঞ্জ : ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর মধ্যে শিশু ও বৃদ্ধের সংখ্যাই বেশি। ইতিমধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে চার শিশু মারা গেছে। সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, গত ১৫ নভেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত জেলার আট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২ হাজার ৩৮০ জন ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট ও ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ৯ জন শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগে ও ৬২ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এদিকে হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক অফিস সূত্রে জানা গেছে, এক মাসে ৭৪৬ জন শিশু শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। এ ছাড়া ১০০ বয়স্ক নারী-পুরুষ হাসপাতালে ভর্তি হন।

হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ রোজিনা রহমান বলেন, শীতে শিশুদের একটু আলাদা যত্ন নিতে হয়। বিশেষ করে এক মাসের কম বয়সের শিশুরা ঠা-াজনিত রোগের ঝুঁকিতে থাকে। সকাল-সন্ধ্যার দিকে শিশুদের নিয়ে বাইরে বের না হওয়াই ভালো। কারণ ওই সময়টাতে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়।

হবিগঞ্জের নবনিযুক্ত সিভিল সার্জন রত্নদ্বীপ বিশ্বাস বলেন, শীতজনিত রোগীদের চিকিৎসার জন্য হবিগঞ্জের সব হাসপাতালগুলোতে ওষুধ, ইনজেকশন ও নেবুলাইজার যথেষ্ট সরবরাহ রয়েছে।

রংপুর : রমেক হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, সকাল হলেই হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা বাড়ছে, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। রমেক হাসপাতালের তৃতীয়তলার ৯ ও ১০ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে শতাধিক শিশু ভর্তি রয়েছে। যাদের মধ্যে কোল্ড ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, সর্দি-জ্বর, অ্যাজমা, শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে আক্রান্ত। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. আ ন ম তানভীর চৌধুরী বলেন, শিশু রোগীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে, তবে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত শিশুরা সবসময় চিকিৎসা নিলেও এবার কোল্ড ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশুরা বেশি ভর্তি হচ্ছে।

অন্যদিকে মেডিকেলের পাশাপাশি উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও বাড়ছে শিশু রোগীর সংখ্যা। গত কয়েক দিনে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৫০ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত। বদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও একই চিত্র।

এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবু মো. আলেমুল বাসার বলেন, গত তিন দিনে প্রায় ২০০ রোগী চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, পেটব্যথা, জন্ডিস, সর্দি-জ্বরসহ শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে শিশু ও বয়স্করাই আসছে।

বরিশাল : নিউমোনিয়া, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ এবং ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ২১৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছে।

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর, বরগুনা ও ঝালকাঠির সরকারি হাসপাতালে নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে ৪২ জন রোগী। এর মধ্যে ভোলায় ১৭ জন (সর্বাধিক), বরগুনা ৭, পটুয়াখালী ৬, পিরোজপুর ৫, বরিশাল ৪ ও ঝালকাঠিতে ৩ জন রোগী ভর্তি চিকিৎসা সেবা নিচ্ছে।

অন্যদিকে বিভাগে বর্তমানে ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। গত ২৪ ঘণ্টায় এই রোগে আক্রান্ত হয়ে বিভাগের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ১৭৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে সর্বাধিক ভোলায় ৫৪, বরিশালে ৪৩, পটুয়াখালীতে ৩৩, পিরোজপুরে ২৩, ঝালকাঠিতে ১৩ ও বরগুনায় ৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছে।

এ ছাড়া শিশু বিভাগেও রোগীর চাপ দ্বিগুণ। বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (শেবাচিম)  শিশু বিভাগেও  রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেছে। শিশু বিভাগের ৩০৩ নম্বর ওয়ার্ডে যেখানে ৪০টি বেড রয়েছে, সেখানে বর্তমানে ৬৮ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। এদের সবাই নিউমোনিয়া, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ এবং ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন।

শেবাচিমের মেডিকেল অফিসার ডা. মো. সোলায়মান কবির বলেন, ‘এ সময় বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশু এবং বয়স্করা। আর শীতের শুরুতে এবং শেষের দিকে অ্যাজমা রোগে আক্রান্ত হওয়র বেশি ঝুঁকি থাকে তাই সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।’

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ ম-ল বলেন, শীতের কারণে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। আমরা স্বাস্থ্যসেবায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রোগীদের সেবা নিশ্চিত করছি।

রাজশাহী : ডিসেম্বরের শুরু থেকেই রাজশাহী ও আশপাশের জেলাগুলোতে নেমেছে শীত। তবে মধ্য ডিসেম্বরে বেড়েছে প্রকোপ। সন্ধ্যা থেকেই ঘন কুয়াশা থাকছে। সকালে অনেক বেলা পর্যন্ত পথঘাট দেখা যাচ্ছে না কুয়াশার কারণে। সন্ধ্যার পর থেকে সকালে বেলা হওয়া পর্যন্ত হাড়কাঁপানো শীত অনুভূত হচ্ছে। শীতের প্রকোপে কষ্টে আছে খেটেখাওয়া মানুষ। বয়স্ক ও শিশুরা শীতে রয়েছে বাড়তি কষ্টে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শীতজনিত রোগীর সংখ্যাও বেড়ে গেছে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। শীতে বেশি কষ্টে আছেন বয়স্ক ও শিশুরা। বিশেষ করে শ^াসকষ্টজনিত সমস্যা যাদের রয়েছে, তারা রয়েছেন বাড়তি কষ্টে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান ডা. সাবিনা ইয়াসমিন জানান, এখানকার শিশু ওয়ার্ডে বেডসংখ্যা রয়েছে ১৫০টি। তবে রোগীর সংখ্যা প্রায় সবসময়ই থাকছে সাড়ে চারশর মতো। শীতজনিত যেসব রোগী আসছে এর বেশিরভাগই ডায়রিয়া বা নিউমোনিয়া আক্রান্ত শিশু বেশি।

কুমিল্লা : গত কয়েক দিনে কুমিল্লায় জেঁকে বসেছে তীব্র শীত আর শৈত্যপ্রবাহে বাড়ছে ঠান্ডাজনিত রোগ। এসব রোগে আক্রান্তের বেশিরভাগই শিশু ও বৃদ্ধ। হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডে আসনসংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা।

হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, শীতের তীব্রতায় এ সময় জ্বরসহ শিশু ও বয়স্কদের নিউমোনিয়া, সাইনাস, টনসিলাইটিস, অ্যাজমা, অ্যালার্জিজনিত সমস্যায় আক্রান্ত রোগীই বেশি দেখা যাচ্ছে। শিশুরা সাধারণ জ্বর, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন ধরনের রোগ নিয়ে হাসপাতালে আসছে।

৪০ বেডের শিশু ওয়ার্ডে ঠান্ডা ছাড়াও শিশুরোগ নিয়ে ভর্তি আছেন প্রায় দ্বিগুণ রোগী। একই অবস্থা হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডেও। বেড সংকটে বারান্দা এবং ফ্লোরে শুয়ে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে রোগীদের। এদিকে কুমিল্লা জেলার আশপাশ থেকেও হাসপাতালে আসছে দূর-দূরান্তের রোগীরা। রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মিয়া মনজুর আহমেদ বলেন, ‘শীতের এ সময়টাতে বাইরে ধুলোবালি বেশি থাকে। ফলে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারা দ্রুত রোগাক্রান্ত হয়।’

ডেপুটি সিভিল সার্জন রেজা মুহাম্মদ সারওয়ার আকবর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত কয়েক দিনে ঠান্ডাজনিত রোগী বাড়ছে। আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ ওষুধ ও জনবল রয়েছে।’

প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী এবং হবিগঞ্জ, রংপুর, বরিশাল ও কুমিল্লা প্রতিনিধি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত