তামিম ইকবালের অবসর নাটক হার মানিয়েছে ভারতীয় সিরিয়ালকেও। একের পর এক পর্ব বের হচ্ছে, পাত্র-পাত্রী বদল হচ্ছে তবুও কোনো পরিণতির লক্ষণ নেই। বুধবার সিলেটে হোটেল গ্র্যান্ড সিলেটেও আরেক পর্ব মঞ্চায়িত হয়ে গেল তামিমের ভবিষ্যৎ নির্ধারণী সভা যার ফল অশ্বডিম্ব।
দিনকয়েক আগে, শহিদ আফ্রিদির সঙ্গে হোটেল রুমে একান্ত আলাপচারিতায় তামিম ইকবাল বলেছেন, জাতীয় দল থেকে তার অবসর নেওয়া হয়ে গেছে। অথচ সিলেটে নির্বাচকদের সেটা স্পষ্ট করে জানাতেই যেন তার ঘোর আপত্তি! প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু বুধবার সিলেটে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘তামিম ইকবালকে দেশের কে না চায়, সবাই চায়। আসলে আজ আমাদের নির্বাচকম-লীর একটা বৈঠক ছিল তামিম ইকবালের সঙ্গে। সেই বৈঠকটা সুন্দরভাবে আন্তরিকভাবে হয়েছে। বেশ কিছু ব্যাপার নিয়ে আমরা খোলামেলা আলোচনা করেছি। ক্রিকেট নিয়েও কথা হয়েছে, যা হয় কারণ নির্বাচক হলেও আমরা সবাই সাবেক ক্রিকেটার। তামিমের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি, বাংলাদেশ ক্রিকেট, জাতীয় দল, বিপিএল সব বিষয় নিয়েই আলোচনা করেছি।’ অনেক ভালো ভালো কথা বলে গাজী আশরাফ বলেছেন, ‘কোনো আলোচনাতেই সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত আসে না। এটা অনেক বড় সিদ্ধান্ত। আমাদের ওপরে যেমন আমাদের বোর্ড আছে, বোর্ডের তরফ থেকে আমরা এসেছি। এখান থেকে কোনো অসুবিধা নেই। এই সমস্ত ব্যাপারে তার ফেরত আসার বিষয়ে তার ঘনিষ্ঠজন, তার পরিবার, বন্ধুবান্ধব, প্রিয় কোচ অনেকের সঙ্গে আলোচনার ব্যাপার থাকতে পারে। আমরা তামিম ইকবালের মতো একজন খেলোয়াড়কে সম্মান জানাই। তার সিদ্ধান্তেরও সম্মান জানাই আমরা। সেজন্য তিনি যদি একটু সময় নিতে চান আমাদের কাছ থেকে, আমার মনে হয় এটা ফেয়ার এনাফ। আমি বোর্ডের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদেরও কোনো অসুবিধা নেই। এখানে তাড়া নেই। বেশি তাড়াহুড়ো করলে কিন্তু রান আউট হতে হয়।’
প্রধান নির্বাচক আরও জানিয়েছেন, ১২ জানুয়ারি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির দল দেওয়ার আগেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জেনে যাবেন, ‘আগেই হয়তো তামিমের সঙ্গে এ নিয়ে আমাদের আরেকটু আলোচনা হতে পারত। যাই হোক, সামনে আমাদের একটা বড় ইভেন্ট আছে। আলোচনা হয়েছে। কিন্তু কোনো আলোচনাতেই সঙ্গে সঙ্গে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না। কারণ এটা অনেক বড় একটা সিদ্ধান্ত। আমাদের যেহেতু ১২ জানুয়ারির মধ্যে দল ঘোষণা করতে হবে, তার আগেই আমাদের দলটা দিতে হবে বোর্ডের কাছে। আমাদের কাছে মনে হয়েছে সময় আছে, সে সময় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। তাড়াহুড়োর কিছু নেই।’
তামিমের জাতীয় দলে ফেরা না ফেরার এই দোলাচলের মধ্যে বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতেও পরিবর্তন এসেছে, তবে এখনো তামিম চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাননি। সাবেক বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসানের সঙ্গে তার গত বছর সংসদ নির্বাচনের পরে আলোচনায় বসার কথা। সেই আলাপ হওয়ার আগেই ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনে পাপন পলাতক। তামিমের অবসর ভাঙানো সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ভারতে পালিয়েছেন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে। তামিমের অবসরের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনায় সর্বাত্মক সহায়তা করা মাশরাফী বিন মোর্ত্তজাও প্রকাশ্যে আসছেন না সাংসদ পদ হারাবার পর। এত সব কিছু বদলে গেলেও তামিমের আচরণে পরিবর্তন আসেনি। তিনি এখন নির্বাচকদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন আর নাটকের পর্ব দীর্ঘায়িত করে চলেছেন। যদিও কোনো সিরিজের আগে এই আলোচনার সূত্রপাত ঘটানো তার পুরনো অভ্যাস। ২০২৩ বিশ্বকাপে দলে না থাকার পর ভিডিও বার্তায় তামিম বলেছিলেন তাকে মনে রাখতে। তার অবসর সংক্রান্ত নাটকের দীর্ঘসূত্রতা দেখে মানুষ হয়তো তাকে আর ব্যাটিং নয়, বিশ্বের দীর্ঘতম অবসর প্রক্রিয়ার রেকর্ডধারী হিসেবেই মনে রাখবে।
তামিম একটা সময়ে বলেছিলেন (গত বছর বিপিএলের শেষ দিকে), তার দলে ফিরতে হলে অনেক কিছু ঠিক করতে হবে। তার ইঙ্গিত ছিল সে সময়কার কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে এবং সাকিব আল হাসানের দিকে। হাথুরুসিংহে বরখাস্ত হয়েছেন আর সাকিব ত্রুটিপূর্ণ বোলিং অ্যাকশনের কারণে এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বল করতে পারবেন না। গাজী আশরাফ জানিয়েছেন, সম্প্রতি শুদ্ধি পরীক্ষাতেও ব্যর্থ হয়েছেন সাকিব, ‘আমরা জানতে পেরেছি সাকিব যে পরীক্ষা দিয়েছিল সেখানে উত্তীর্ণ হয়নি। তাই বোর্ডের কাছ থেকে সাকিবকে দলে নেওয়ার ব্যাপারে এখনই কোনো সবুজ সংকেত পাইনি। আমরা এটুকু জানতে পেরেছি যে সে আরেকটা পরীক্ষা দেবে। তাই আমরা আরও একটু অপেক্ষা করব। সাকিব চ্যাম্পিয়নস ট্রফির দলে থাকবে কিনা সেই সিদ্ধান্ত তাই নিতে দেরি হচ্ছে।’
২১ ডিসেম্বর ভারতের চেন্নাইতে আইসিসি অনুমোদিত শ্রী রামচন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ো-মেকানিক্স ল্যাবে বোলিং অ্যাকশন পরীক্ষা দিয়েছিলেন সাকিব। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হয়েছেন বাংলাদেশ অলরাউন্ডার যা গতকাল সংবাদ মাধ্যমের কাছে নিশ্চিত করেছেন প্রধান নির্বাচক। সাকিব আবারও নতুন করে বোলিং অ্যাকশন পরীক্ষা দিয়েছেন। তবে নতুন পরীক্ষার ফল এখনো হাতে পাননি। তাই তারও চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলা নিয়ে আছে শঙ্কা। তামিমের শর্ত তাই বলা যায় পূরণ হয়েই গেছে, তবুও ঝেড়ে কাশছেন না তামিম।