২০২৩ সালের ১৬ নভেম্বর, কলকাতার ইডেন গার্ডেনসে ওয়ানডে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে বিদায় নিতে হয় দক্ষিণ আফ্রিকার। ক্রিকেটবিশ্ব তো বটেই, খোদ প্রোটিয়া ক্রিকেটাররাও কি নিজেদের চোকার্স ভাবা থেকে বিরত থাকতে পেরেছিলেন। অথচ ওই বিশ্বকাপেই গ্রুপ পর্যায়ে একচেটিয়া নৈপুণ্য দেখিয়ে পয়েন্ট টেবিলের দুইয়ে থেকে সেমিতে অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি হয়েছিল দেশটি। সেমিফাইনালের আগে শক্তির মহড়া আর বারবার এই সেমি থেকে অদ্ভুতভাবে হোঁচট খাওয়ার কারণেই তো চোকার্স তকমাটা জুড়ে বসেছিল দলটির নামের সঙ্গে। অথচ ঠিক এক বছরের মধ্যেই সেই দলটিই বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বোচ্চ দুটি আসরের ফাইনালিস্ট বনে গেল। প্রথমত গত বছরের মাঝামাঝি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এবং বছরের শেষান্তে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ। এ তো গেল দক্ষিণ আফ্রিকার পুরুষ ক্রিকেটের প্রসঙ্গ। দেশটির জাতীয় নারী দলের ক্রিকেটাররা পরপর দুই বছর ২০২৩ ও ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছে। সর্বোচ্চ আসরের ট্রফি এখনো অধরা থাকলেও চোকার্স-খ্যাত প্রোটিয়া ক্রিকেটাররা কোন জাদুমন্ত্রে ঘোচালেন নিজেদের এই পুরনো শাপ।
ক্রিকেটের সবচেয়ে কুলীন সংস্করণ হিসেবে গণ্য করা হয় টেস্ট ক্রিকেটকে। মরতে বসা খেলাটায় প্রাণ ফেরাতে ২০১৯ থেকে শুরু করা হয় বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ। দ্বিবার্ষিক এই টেস্ট চক্র শেষে পয়েন্ট তালিকায় থাকা সেরা দুই দল নামে ফাইনাল খেলতে। জেতা দলের হাতে ওঠে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের গদা, যার মর্যাদা ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সমান। প্রথম দুই চক্রে এই ট্রফি জিতেছিল নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া। চলতি তৃতীয় চক্রের ফাইনাল হবে এ বছরের ১১ জুন লর্ডসে। আর পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে থেকে সবার আগে এ ফাইনালে অংশ নেওয়া নিশ্চিত করেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ বর্তমান চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া। এবারের চক্রে নিজেদের ১২টি ম্যাচের ৮টিতেই জয় পেয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। নিজেদের ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লাগাতার জয়ের কীর্তি গড়ে জিতেছে শেষ ৭টি টেস্ট। সাধারণ চোখে দেখলে প্রোটিয়া ক্রিকেটে তিনটি বড় পরিবর্তন ধরা পড়েÑ সমৃদ্ধ পেস বোলিং লাইনআপ, বড় রান করতে পারা ব্যাটারদের আধিক্য এবং সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে পারা অধিনায়ক। কিন্তু এই গুণ তো বরাবরই বজায় ছিল প্রোটিয়াদের ক্রিকেট সংস্কৃতিতে, তাহলে!
২০২৩ সালে নতুন হাওয়া লাগে ক্রিকেট পালে। মার্ক বাউচারের ইস্তফার পর কোচ হয়ে আসেন সুকরি কনরাড এবং রব ওয়াল্টার। সুকরি পান লাল বলের দায়িত্ব আর রব সাদা বলের। সুকরি দায়িত্ব নেওয়ার আগে অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের কাছে সিরিজ হারের কারণে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল খেলা একরকম স্বপ্নই ছিল। ডিন এলগারের অবসরে প্রোটিয়াদের টেস্ট অধিনায়কত্বের ভার পান টেম্বা বাভুমা। ছোটখাটো গড়নের অখ্যাত এই প্রোটিয়া ব্যাটসম্যান অধিনায়কত্বের দায়িত্ব নিয়েই গড়েছেন বিরল কীর্তি। তার নেতৃত্বে প্রথম ৯ টেস্টের ৮টিতেই জয় পেয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। ভেঙেছেন টেস্ট ইতিহাসের ৭৪ বছরের পুরনো রেকর্ড। এখানেই শেষ নয় সুকরি-বাভুমা জুটি গড়ার পর দক্ষিণ আফ্রিকা ১৪ টেস্টের ১০টিতেই জয়ের হাসি হেসেছে। এক বছর আগেই টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের স্বপ্নময় ফাইনাল এখন বাস্তব।
দল হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার এক হয়ে ভালো করার এবং পুরনো বাজে স্মৃতিগুলো ভুলে ফেলার যে প্রত্যয় বর্তমান দলের মধ্যে দেখা গেছে তার প্রমাণ মেলে বাভুমার একটি বক্তব্যে। অধিনায়ক হিসেবে তাকে কৃতিত্ব দিতে গেলে বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করে বাভুমা বলেন, ‘অধিনায়ক হিসেবে আমি যা অনুভব করেছি তা হলো, নেতা হিসেবে আপনি ততটাই ভালো যতখানি ভালো আপনার বোলাররা, প্রথমত। আর বাকিটা নির্ভর করেÑ দল হিসেবে যেমন ভালো করবেন তেমন ভালো অধিনায়ক আপনি।’ ২০২৩ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের আগে এই একই সুরে বক্তব্য দিয়েছিলেন হেইনরিখ ক্লাসেন। বৈশ্বিক ক্রিকেট নাম কুড়ানো এ ব্যাটার তখন বলেছিলেন, ‘আমি শূন্য করলে যদি দল জেতে তাহলে দলের প্রয়োজনে আমি তাই করতে রাজি আছি।’ ওই বিশ্বকাপেও প্রোটিয়াদের অধিনায়ক ছিলেন বাভুমা। অনূর্ধ্ব-১৯ দলের মতো টি-টোয়েন্টি জাতীয় দলের দায়িত্ব পেয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ফাইনাে তুলেছিলেন এইডেন মার্করাম। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সবচেয়ে উত্তেজনার ফাইনালের শেষভাগে হারার আগে প্রোটিয়াদের হাতেই প্রথম বৈশ্বিক শিরোপা দেখছিলেন সমগ্র বিশ্বের ক্রিকেটপ্রেমীরা। একই ধারায় প্রোটিয়া নারীরাও গত দুই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছেন। দল হিসেবে ভালো করার এই অনুপ্রেরণা নেতৃস্থানীয় পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে দিয়ে যে দলীয় একতা দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট সংস্কৃতিতে গড়ে উঠেছে তাতে আর হয়তো চোকার্স নয়, এই জুনেই চ্যাম্পিয়ন তকমা বসতে পারে দক্ষিণ আফ্রিকার নামের পাশে।