ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মেগা প্রকল্পের অর্থ লোপাট, সরকারি প্লট বরাদ্দ ও বিদেশে অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব অভিযোগ অনুসন্ধানের পাশাপাশি আরও কোনো দুর্নীতির ঘটনা রয়েছে কি না, তা তদন্তে টাস্কফোর্স গঠন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের প্রধান কার্যালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা টাস্কফোর্স গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের অন্য একজন শীর্ষ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সম্প্রতি শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের দুর্নীতি অনুসন্ধানে একটি টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। সংস্থাটির উপপরিচালক মো. সালাউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট টিমের সদস্যরা হলেনশ্ব উপপরিচালক মো. সাইদুজ্জামান, সহকারী পরিচালক রাশেদুল ইসলাম, আফনান জান্নাত কেয়া ও মর্তুজা আলী সাগর। টিমের তদারককারী কর্মকর্তা হলেন দুদকের বিশেষ তদন্ত-২-এর পরিচালক খান মীনজানুল ইসলাম।
দুদকের তথ্যমতে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে ৫৯ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশেষ অগ্রাধিকারের আটটি প্রকল্পে ২১ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ জমা হয়েছে। এর সঙ্গে শেখ হাসিনা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচারের অভিযোগ জমা হয়েছে। এসব অভিযোগের অনুসন্ধানের পাশাপাশি আরও যেসব দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে, তা অনুসন্ধান করতে এ টাস্কফোর্স গঠন করা হয় বলে জানান দুদকের কর্মকর্তা।
মেগা প্রকল্পের অর্থ লুটপাট : গত ১২ ডিসেম্বর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, বোন শেখ রেহানা ও ভাগ্নি টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। ওইদিন দুপুরে দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) আক্তার হোসেন অনুসন্ধানের বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানান।
দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে ৫৯ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ পেয়েছে দুদক। এসব দুর্নীতিতে শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, বোন শেখ রেহানা ও তার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিকের সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আশ্রয়ণ প্রকল্প, বেজা ও বেপজাসহ বিশেষ অগ্রাধিকারের আটটি প্রকল্পে ২১ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সব মিলিয়ে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে ৯০ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের উদ্যোগ নেয় দুদক।
এ বিষয়ে দুদকের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প থেকে মালয়েশিয়ার একটি ব্যাংকের মাধ্যমে শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয় ও টিউলিপ সিদ্দিকের ৫ বিলিয়ন ডলার লোপাটের অভিযোগ অনুসন্ধানে দুদকের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয় ওই রুলে। বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মুবিনা আসাফের হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ১৫ ডিসেম্বর এই রুল জারি করেন। রুল জারির দুদিন পর অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন।
শেখ হাসিনা পরিবারের ৬টি প্লট জালিয়াতি : গত ২৫ ডিসেম্বর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাসহ তাদের পরিবারের ছয় সদস্যের নামে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ১০ কাঠা করে ছয়টি প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগে অনুসন্ধানে নামে দুদক। ওইদিন বিকেলে এক ব্রিফিংয়ে দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন বিষয়টি জানান।
দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজ নামে, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, বোন শেখ রেহানা, রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি ও মেয়ে আজমিনা সিদ্দিকের নামের রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পের ২৭ সেক্টরের কূটনৈতিক জোনের ২০৩ নম্বর রোডে ১০ কাঠা করে ছয়টি প্লট অর্থাৎ মোট ৬০ কাঠা আয়তনের জমি বরাদ্দ নিয়েছেন। এটি দুদকের তফসিলভুক্ত হওয়ায় বিষয়টি কমিশন থেকে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়।
৩০০ মিলিয়ন ডলার পচারের অভিযোগ : সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে ৩০০ মিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। গত বছর ২২ ডিসেম্বর এ অনুসন্ধান শুরুর বিষয়টি প্রকাশ্যে আনে দুদক।
দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ পাচারের প্রমাণ পেয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। সংস্থাটির লন্ডন প্রতিনিধির মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। সজীব ওয়াজেদ জয়ের নামে হংকং এবং কেম্যান দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি এবং লন্ডন ব্যাংকে অর্থ স্থানান্তরিত করার তথ্য বিশেষভাবে সামনে এসেছে। এফবিআই তাদের লন্ডন প্রতিনিধির মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করেছে এবং গুরুতর আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ পাচারের প্রমাণ পেয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ডলার যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছে। গেল বছরের ৯ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের মহাপরিচালক এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করে বিপুল পরিমাণ নথি হস্তান্তর করেন। এর পাশাপাশি ১ অক্টোবর বাংলাদেশে ইইউ প্রতিনিধিদলের সহযোগিতা বিভাগের প্রধান মিশাল ক্রেজারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি ইউরোপীয় প্রতিনিধিদল তৎকালীন দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ মঈনুদ্দিন আবদুল্লাহর সঙ্গে দেখা করে দুদকের কমিশনের অপারেশনাল সক্ষমতা জোরদার ও পাচার করা অর্থ পুনরুদ্ধার করতে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেন।
