অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২৫, ০৫:৩৫ এএম

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘হাসিনার পালানোর পর থেকে আমরা কেন জানি নিজেদের পুরো বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারছি না, ঐক্যের জায়গাটায় থাকতে পারছি না। কী দুর্ভাগ্য, এখন যেটা শুরু হয়েছে, এটাকে আমি মনে করি সুস্থ ব্যাপার না, একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য।’

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ শীর্ষক একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এসব কথা বলেন। বইটি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় আদালতে খালেদা জিয়ার ৩৪২ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিকে উপজীব্য করে। এই বই সম্পাদনা করেছেন প্রয়াত অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ।

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘ক্ষমতা তো টিকে থাকবে তখনই, যখন তুমি সেটেল করতে পারবা, স্থিতিশীলতা আসবে। তার জন্যই আমরা বারবার বলি, সংস্কার তো আমরাই শুরু করেছি ভাই।’

সংস্কার নিয়ে বিভক্তি সৃষ্টির অভিযোগ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমি জানি না, কিছু মানুষ একেবারেই যেন ডেসপারেট হয়ে গেছেন আবার দেশকে ভাগ করবেন। জনগণকে বিভক্ত করবেন এবং বিভিন্ন ধরনের বিভক্তিমূলক কথা বলছেন, বিভিন্ন ধরনের উসকানি দিচ্ছেন। আপনারা দয়া করে এ পথে যাবেন না। রাজনৈতিক নেতাকর্মী যে যেখানে কাজ করছেন, সবাইকে অনুরোধ করব, বিভাজন সৃষ্টি করবেন না।’

দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মুক্তবাজার অর্থনীতি ও ১৯ দফা কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের যে দর্শন, তাতে ইট সেলফ সংস্কারের মুখবন্ধ। ১৯ দফা কর্মসূচি ছিল সবচেয়ে বড় সংস্কারের কর্মসূচি। আমরা এই জিনিসগুলো কেউ বলি না। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা এ জিনিসগুলো সামনে আনবেন না। কারণ, এ দেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তাদের অনেকে অর্জন করতে পারেননি।’

দেশকে বাঁচানোর জন্য, গণতন্ত্রকে ফিরে পাওয়ার জন্য এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ঐক্যশ্ব জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘সংস্কার অবশ্যই লাগবে। কিন্তু সেই সংস্কারের জন্য পেছনে যে শক্তিটা লাগবে, সেটা হচ্ছে নির্বাচিত সংসদ, নির্বাচিত সরকার। এটা ছাড়া সংস্কারকে আমরা কখনো বৈধতা দিতে পারব না। সেসব নিয়ে আমরা বিতর্কে যেতে চাই না। আমরা আহ্বান জানাব, দেশের গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষদের, আপনারা ঐক্যবদ্ধ থাকবেন, বিভাজিত হবেন না।’

চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়ার লন্ডন যাওয়ার কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘ইতিহাসের কী অমোঘ বিধান, আজকে খালেদা জিয়া মুক্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডন গেলেন এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিয়ে গেলেন। তাকে পথে পথে লাখ লাখ মানুষ সি অব করেছে ভালোবাসা থেকে। আন্তর্জাতিকভাবে যেভাবে সম্মানটা পেয়েছেন, কোথাও বাধা পেতে হয়নি আমাদের। আমরা যেখানেই বলেছি যে এটা আমাদের দরকার, সঙ্গে সঙ্গে করে দিয়েছে। ভিসা দিয়েছে। ম্যাডামকে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাতারের আমিরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। তারা কোনো ভাড়া না নিয়ে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স দিয়েছেন এবং খুব দ্রুত দিয়েছেন। আমি ধন্যবাদ জানাই ব্রিটিশ সরকারকে। তারা যাওয়ার ব্যাপারটা নিশ্চিত করেছেন।’

তারেক রহমান কিছুদিনের মধ্যে পুরোপুরি সব মামলা থেকে মুক্ত হয়ে সবার মধ্যে আসবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

বইটি সবাইকে পড়ার আহ্বান জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘বইটি যদি পড়েন, তাহলে দেখবেন এটাই একটা ইতিহাস, এটাই একটা দিকনির্দেশনা, এটাই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ রাজনীতি। আমরা অনেকেই জানি না, এটার মধ্যে কী আছে।’

মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে বিগত ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সোচ্চার থাকা জাতীয়তাবাদী আদর্শের কয়েকজন অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট উপস্থিত ছিলেন। যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গুম ও কারাগারে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। সবাই গুম অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতনের বর্ণনা দেন।

বিএনপি মহাসচিব অনলাইন অ্যাকটিভিস্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘যারা লড়াই করেছেন, জেলে গেছেন, নির্যাতিত হয়েছেন, তারা এতটুকু তো পেয়েছেন, তাদের লড়াইয়ে দেশনেত্রী এখন মুক্ত, তিনি চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে পরেছেন।’

খালেদা জিয়া ক্ষমতার প্রলোভনে রাজনীতিতে আসেননি বলে জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘তিনি যখন রাজনীতিতে এসেছিলেন, তখন তার সামনে প্রধানমন্ত্রিত্বের কোনো সম্ভাবনা ছিল না। তিনি এসেছিলেন স্বৈরাচারের হাত থেকে জাতিকে মুক্ত করতে। আমি যখন খালেদা জিয়াকে প্রথম নারী মুক্তিযোদ্ধা বলি, আমার ওপর রেগে যায় ফ্যাসিস্টরা। খুব বাজে কথাবার্তা বলে। কিন্তু এটাই সত্য।’ তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে জিয়াউর রহমান যখন স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, সেই মুহূর্তে বেগম জিয়া চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে দুই বাচ্চা নিয়ে একা ছিলেন। ওই সময় সৈনিকরা এসেছিলেন তার কাছে। আমাদের কমান্ডার তো এখন নেই। তারা আমদের বলছে, অস্ত্র সমর্পণ করতে। আমরা এখন কী করব। তিনি (খালেদা জিয়া) বলেছেন, তোমাদের কমান্ডার ফিরে না আসা পর্যন্ত একটা অস্ত্রও সমর্পণ করবে না। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এটাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না।’

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক সচিব ইসমাঈল জবিউল্লাহর সভাপতিত্বে ও কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুলের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রবীণ সাংবাদিক শফিক রেহমান। আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন, বাংলাদেশ বিমানের সাবেক পাইলট রেজাউর রহমান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত