এক টুকরো কাপড়ে মোড়ানো এক নবজাতক পড়ে আছে রাস্তার ধারে ময়লার স্তূপের পাশে। নিথর নবজাতটিকে ঘিরে কয়েকটি কুকুরের উৎফুল্ল আনাগোনা, মাথার ওপর একঝাঁক কাকের ওড়াউড়ি। পথচারীরা উৎসুক দৃষ্টিতে সে দৃশ্য দেখছেন। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে দেখছেন শিশুটিকে ঘিরে কুকুরের আনাগোনা। একপর্যায়ে মৃত ভেবে শিশুটিকে খেতে উদ্যত হয় কুকুরগুলো। বলতে হয় ভাগ্য সহায় ছিল, শিশুটি বেঁচে যায়। কয়েকজন লোক তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসার পরে তাকে দেওয়া হয় আজিমপুরের ছোটমণি নিবাসে। তার নাম রাখা হয় ‘ফাইজা’। আইনি প্রক্রিয়া মেনে ছোটমণি নিবাস থেকে তাকে দত্তক নেন এক নিঃসন্তান দম্পতি। ফাইজার ভাগ্যবতী; নয় বছর আগে রাজধানীর পুরনো বিমানবন্দর এলাকায় তাকে কাক-কুকুরের খাবারে পরিণত হতে হয়নি।
দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিদিনই এ রকম ফাইজাদের দেখা মেলে। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর যখন মায়ের বুকের উষ্ণতা পাওয়ার কথা তখন তাদের মুখোমুখি হতে হয় এক নির্মম পৃথিবীর। গত ৩০ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের পাশে বটতলা থেকে একদিন বয়সী এক মেয়ে নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার করেছে শাহবাগ থানা-পুলিশ। ১৯ ডিসেম্বর রাজধানীর সবুজবাগ থানার বাসাবো ফ্লাইওভারের পশ্চিম পাশের ফুটওভার ব্রিজের নিচের রাস্তা থেকে আরেক নবজাত কন্যাশিশুর মরদেহ উদ্ধার হয়। ময়লার স্তূপ, রাস্তার ধারে, ডোবা-নালা বা পরিত্যক্ত জায়গা থেকে বস্তা বা কার্টনবন্দি, কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় জীবিত বা মৃত নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার হয় মাঝেমধ্যেই।
মানবাধিকার সংগঠন সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে ১২ মাসে (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) মোট ৯৪ জন নবজাতক উদ্ধার হয়েছে। ৬৪ জনই মৃত। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে সাতজন, মার্চ মাসে পাঁচজন, এপ্রিলে সর্বোচ্চ আটজন, মে মাসে ছয়জন, জুন মাসে তিনজন, জুলাই মাসে পাঁচজন, আগস্টে দুজন, সেপ্টেম্বরে সাতজন, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে চারজন এবং ডিসেম্বরে ছয়জন নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে।
গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের (ঢামেক) মর্গে ছয় নবজাতকের মরদেহ ছিল বলে জানা গেছে। গত তিন দিনে রাজধানীর বিভিন্ন থানা এলাকা থেকে এসব মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ মর্গে পাঠিয়েছে, এ কথা নিশ্চিত করেছেন ঢামেক মর্গের ডোম রামু চন্দ্র দাস। তিনি বলেন, ‘আমাদের মর্গেই গত তিন দিনে ছয় নবজাতকের মরদেহ এসেছে। ডাস্টবিন, রাস্তার পাশে বা ডোবা-নালা থেকে উদ্ধার হওয়া এসব মরদেহ ক্ষতবিক্ষত থাকে। একটা নির্দিষ্ট সময় রাখার পরে এসব মরদেহ আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফন করা হয়।’
সাত বছরে অজ্ঞাত পরিচয় নবজাতক উদ্ধারের হার প্রায় ছয় গুণ বেড়েছে : বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের শিশু অধিকার পরিস্থিতি ২০১৭ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছর রাস্তা/ডাস্টবিন বা ঝোঁপ থেকে অজ্ঞাত পরিচয়ের ১৭ নবজাতককে উদ্ধার করা হয়। ২০১৬ সালে উদ্ধার হওয়া নবজাতকের সংখ্যা ছিল ৯। ২০২৪ সালে এসে অজ্ঞাত পরিচয় নবজাতকের মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ।
এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নারী ও শিশু অধিকার কর্মী ও ‘উই ক্যান’-এর নির্বাহী সমন্বয়ক জিনাত আরা হক। তিনি বলেন, ‘পরিচয়হীন নবজাতক উদ্ধারের ও নবজাতকের মৃত্যুর সংখ্যা খুবই উদ্বেগজনক। আমরা সব সময় চাই সুস্থ-স্বাভাবিক বাচ্চা, তারা পৃথিবীর আলো দেখুক। নাগরিক হিসেবে বেড়ে উঠুক।’
নানা সামাজিক কারণে এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে বলে মনে করেন জিনাত আরা হক। তিনি বলেন, ‘সাধারণত যে বাবা-মায়েরা বাচ্চাকে রাখতে চায় না, তারা গর্ভপাত করে বা বাচ্চাকে ফেলে দেয়। এর অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। বাচ্চাটা যদি অনাকাক্সিক্ষত হয় তাহলে বাবা-মায়েরা এমন করে। এমনও হতে পারে, জন্মের সময়ই বাচ্চাটা মারা গেছে। মৃত বাচ্চাকে সৎকারের ঝামেলায় তারা যেতে চান না, খরচের একটা ব্যাপার আছে তো।’
জিনাত আরা হক বলেন, ‘কতজন নারী শিশু বা কতজন পুরুষ শিশু সেটা যদি জানা যেত তাহলে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা যেত যে, নারী শিশুদের প্রতিই এ রকমে হচ্ছে কি না। অনাকাক্সিক্ষত শিশুর ক্ষেত্রেও এটা হয়। বিশেষ করে হাসপাতালগুলোতে বাচ্চা প্রসবের বিষয়টা খুব একটা নিরাপদ নয়। সেখানে বাচ্চা প্রসবের জন্য অভিভাবকের জায়গায় স্বামীর নাম লাগে। ওই জায়গায় যদি কেউ স্বামীর নাম দিতে না চায় বা দিতে না পারে, তখন দেখা যায় বাচ্চাকে তারা ফেলে দিতে চায়। কারণ তারা সুস্থ-স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় গর্ভপাত করতে পারে না। হাসপাতালগুলোতে যদি গর্ভপাত করাতে পারার ব্যবস্থা থাকত তাহলে এ রকম হয়তো হতো না।’
শিশুকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধারের পর যদি মামলা হয় তাহলে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক বিভাগের কাছে শিশুর রক্তের নমুনা যায়। নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে শিশুটির প্রোফাইল তৈরি করেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। কেউ শিশুর মা অথবা বাবা দাবি করলে তাদের সঙ্গে ওই শিশুর ডিএনএ প্রোফাইল মেলানোর মাধ্যমে সেটা প্রমাণ করা হয়। কিন্তু জন্মদাতা ও জন্মদাত্রী শিশুকে স্বেচ্ছায় ফেলে গেলে তার তদন্ত বেশ কঠিন হয়ে পড়ে বলে জানান সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের একজন পুলিশ সুপার। বহির্বিশ্বের মতো বাংলাদেশের সব মানুষের যদি ডিএনএ তথ্যভা-ার থাকত, তাহলে সহজেই শিশুর ডিএনএ ওই তথ্যভা-ারের সঙ্গে মিলিয়ে জন্মদাতা ও জন্মদাত্রী শনাক্ত করা যেত বলে তিনি মনে করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘মামলা না হলে শিশুর রক্তের নমুনা আমাদের কাছে আসে না। যারটা আসে না তার কোনো প্রোফাইলও থাকে না। সাধারণত এ ধরনের শিশুদের খোঁজে তেমন কেউ আসে না। অন্তত আমি এমনটা দেখিনি।’
‘ছোটমণি নিবাস’ জীবিতদের আশ্রয়স্থল : সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন ‘ছোটমণি নিবাস’ উদ্ধার হওয়া নবজাতকদের মায়ের কোল। সারা দেশে ছয়টি বিভাগে পিতৃ-মাতৃ পরিচয়হীন ০-৭ বছর বয়সী উদ্ধারকৃত শিশুদের এখানে লালনপালন করা হয়। শিশুদের মাতৃ স্নেহে প্রতিপালন, রক্ষণাবেক্ষণ, খেলাধুলা ও সাধারণ শিক্ষা দেওয়া হয়। রাজধানীর আজিমপুরে এমন একটি ছোটমণি নিবাস রয়েছে। এ নিবাসের উপতত্ত্বাবধায়ক জুবলী বেগম রানু। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের এখানে বর্তমানে ১৮ জন শিশু আছে। ফাইজার মতো শিশুরাও আছে।’
