রনি আহমেদ। বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পকলার অন্যতম প্রধান মুখ। অধ্যাত্মবাদ ও মিথলজির সংমিশ্রণে তার শিল্পকর্মগুলো বাংলাদেশের শিল্পকলাকে এক নতুন ভাষার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়; যা মিস্টিক কাব্যময়তা যেমন ধারণ করে আবার সমসাময়িক সমাজ-রাজনীতির দিকে তির্যকভাবে আঙ্গুল তোলে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমাদৃত এই শিল্পী অনেকদিন ধরেই বাংলাদেশের সমুদ্র তীরবর্তী জেলা কক্সবাজারের প্রাণ-প্রকৃতি-সংস্কৃতি তার শিল্প কর্মের মাধ্যমে তুলে ধরছেন। মারমেইড আর্ট ফাউন্ডেশনের সহায়তায় মারমেইড রিসোর্টের বিশাল এলাকা, তার ক্যানভাস হিসেবে ব্যবহার করছেন। সৃষ্টি করছেন অসংখ্য পেন্টিং , স্ক্যাল্পচার , মুরাল , ইনস্টলেশন। পুরো রিসোর্টটাই যেন একটা জীবন্ত আর্ট গ্যালারি। বাংলাদেশে এই ধরনের শিল্প উদ্যোগ একদম নতুন না হলেও বিরল। এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েই আমরা কথা বলছি শিল্পী রনি আহমেদের সাথে।
কক্সবাজারে কাজের শুরুটা কীভাবে হলো?
রনি আহমেদ: শুরুটা ২০০৭/৮ সাল থেকে, মারমেইডের চেয়ারম্যান জিয়াউদ্দিন খান পাবলো এবং এমডি আনিসুল হক সোহাগের সঙ্গে বন্ধুত্বের সূত্রে কাজের শুরু। প্রথমে ছোট্ট, অসাধারণ একটা ক্যাফে ছিল মারমেইড, সেখানে একটা সার্ফিং বোর্ডে আঁকা দিয়া মারমেইডে আমার শিল্পকর্মের যাত্রা শুরু, এখন পর্যন্ত হাজারের ওপর আমার শিল্পীকর্ম মারমেইডে সংরক্ষিত আছে। পেন্টিং, স্ক্যাল্পচার, মুরাল, ইনস্টলেশন এরকম নানা মাধ্যম। ভেনিস বায়ানলে কসমিক আর্ক, আমার আর্টের বইয়ের অফিসিয়াল লঞ্চিং হয়, মারমেইড আর্ট ফাউন্ডেশন থেকে।
শুরুতে যখন এমন একটা স্পেসে কাজ করা শুরু করলেন তখন আপনার বিষয়গুলো প্রভাবিত করেছিল? এইখানে কাজের ক্ষেত্রে কক্সবাজারের প্রকৃতি-সংস্কৃতি-সাহিত্য-মিথ আপনাকে কতটা প্রভাবিত করে?
রনি আহমেদ: সমুদ্রের পাশে কক্সবাজার একটি ব্যতিক্রমী জায়গা, সব আলাদা, সমুদ্রের একটা আলাদা ভাষা আছে। যেটা সাধারণ শহর গ্রাম থেকে খুবই আলাদা। তিনি কারণে শিল্পের ভাষাও আমার পরিবর্তিত হলো এখানে। অনেক সামুদ্রিক প্রাণী, তিমি, কাছিম, শামুক, কাঁকড়া, অক্টোপাস, চিংড়ি, স্কুইড, নানা জাতের মাছ, এইসব প্রাণী শিল্পকর্মে আসলো। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ কাছিমের ভাস্কর্য এখানে বানালাম। দুনিয়া ব্যাপী কাছিমের মিথ নিয়ে বিশাল মুরাল আঁকলাম। নতুন প্রকৃতি নির্ভর রঙ ও ভাষা তৈরি হলো। একটা লোকাল মিথ কানা রাজা, সেটার ওপর নাটক, পেন্টিং, অভিনব কস্টিউম ডিজাইন করেছি।
এখানের শিল্পকর্মগুলো আপনার অন্যান্য শিল্পকর্মগুলা থেকে কতটা আলাদা? কোন কোন বৈশিষ্ট্য বা সৃজন প্রক্রিয়া এই শিল্পগুলাকে অন্য শিল্প থেকে আলাদা করেছে?
রনি আহমেদ: হ্যা অনেক আলাদা। শিল্পকর্ম পরিবেশ নির্ভর। তাই শিল্পভাষা পরিবর্তিত হলো আমার। এগুলো অনেক প্রকৃতি ও সমুদ্র নির্ভর শিল্পভাষা। আর ঢাকাতে যেগুলো করি সেগুলো সম্পূর্ণ সুফি ঘরানার। এখানে সুফি তত্ত্বের সাথে সমুদ্র নির্ভর নানা উপাদান যুক্ত হয়।
আমরা দেখি মারমেইডে আপনার শিল্পকর্মগুলা নিয়মিত পরিবর্তন হয়। নানা ধরনের ফেলে দেয়া উপাদান আপনি এখানে ব্যবহার করেন। এখন যেমন দেখা যাচ্ছে ফেলে দেয়া মেটাল দিয়ে বেশ কিছু স্ক্যাপ্টচার করেছেন। উপাদান ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই আইডিয়া কীভাবে এলো?
রনি আহমেদ: হ্যা, নানা উপাদান ব্যবহার করি আমি, আমার শিল্প চর্চার শুরু থেকে আমি রিসাইকেল ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করতাম। এছাড়া মারমেইড একটা বিশাল রিসাইকেল আইডিয়া নির্ভর প্রতিষ্ঠান, যেখানে পুরাতন জাহাজের নানা অংশ আর্কিটেকচার হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। পরিবেশের জন্য রিসাইকেল অতি জরুরি। তাই আমি এদিকে আগ্রহী হই এবং ‘সি সাইকেল’ নামে রিসাইকেল ভিত্তিক একটা শিল্প ভাষা তৈরি করি।
এই যে একটা কমার্শিয়াল স্পেসকে আপনি আপনার শিল্পের ক্যানভাস হিসেবে ব্যবহার করতেসেন, এটা আমাদের দেশে খুব বেশি দেখা যায় না। এটা আপনি কীভাবে দেখেন? এইটা কি শিল্পীর স্বাধীন প্রকাশের ক্ষেত্রে সহায়ক নাকি কোনো দ্বান্দ্বিক অবস্থান আছে ?
রনি আহমেদ: আমাদের দেশে এটা নতুন এবং পিজিটিভ। বহুমানুষ এখানে প্রতিদিন আসে। তাই আমার আর্টের সাথে তাদের একটা বিরাট যোগাযোগ হয়। যেটা অন্য কোন উপায়ে অসম্ভব। তাই এটা নতুন ও মানুষকে শিল্প বিষয়ে শিক্ষিত করার একটা সহজ উপায়। শিল্পের স্বাধীন বিকাশে এটা সহায়ক, কারণ আমি ইচ্ছা মাফিক পূর্ণ স্বাধীনতায় এখানে আমার শিল্পকর্ম করছি।
সামনে কক্সবাজার বা মারমেইড কেন্দ্রিক কোনো বিশেষ কাজের পরিকল্পনা আছে কিনা?
রনি আহমেদ: এখানকার মালিকপক্ষ আর্টের ব্যাপারে অনেক আগ্রহী। তাদের আগ্রহে সব সময় কোনও না কোনও আর্ট ইভেন্ট এখানে হয়। সামনে ইনশাআল্লাহ আরও অনেক আর্ট প্রজেক্ট, এক্সিবিশন হবে এখানে। আল্লাহ ভরসা।
ধন্যবাদ রনি ভাই আমাদের সময় দেয়ার জন্য।
রনি আহমেদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।
