তারল্য সংকট, ব্যাংক খাতের ওপর আস্থাহীনতা, রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ বিভিন্ন কারণে ব্যাংক থেকে টাকা তুলছিলেন গ্রাহকরা। এতে টানা দশ মাস ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ বাড়তে থাকে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। ধীর গতিতে হলেও ঘরের টাকা ব্যাংকে ফিরতে শুরু করেছে। ব্যাংকে টাকা ফেরায় বাড়ছে আমানত। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
তথ্য পর্যালোচনায়, ২০২৪ সালের নভেম্বর শেষে ব্যাংকের বাইরে অর্থাৎ মানুষের ঘরে বা হাতে ছিল ২ লাখ ৭৭ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা। যেখানে গত অক্টোবর মাসে ছিল ২ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসে ৩৫৪ কোটি টাকা মানুষের ঘর থেকে ব্যাংকে ফিরেছে। তবে ২০২৩ সালের নভেম্বরের তুলনায় এটি প্রায় ১১.৬৮ শতাংশ বেশি। অক্টোবরে ব্যাংকের বাইরে থাকা অর্থের পরিমাণ কমেছিল ৫ হাজার ৭৪৩ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে ছিল ২ লাখ ৮৪ হাজার কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ বেড়ে গেলে সেটি অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হয়। কারণ ব্যাংকের বাইরে থাকলে টাকার হাতবদল হওয়া কমে যায়, যা দিন শেষে ‘মানি ক্রিয়েশন’ কমিয়ে দেয়। মানুষের হাতে থাকা টাকা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ব্যাংকে ফিরলে একদিকে যেমন ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি ভালো হয়, অন্যদিকে ঋণ দেওয়ার মতো তহবিলের পরিমাণ বাড়ায় দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এরপর থেকে প্রতি মাসেই এর পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই শেষে ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ সর্বোচ্চ ২ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়। সেপ্টেম্বর থেকে ব্যাংকে ফিরতে শুরু করে বাইরে থাকা টাকা।
এদিকে ভালো ব্যাংকগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ায় এবং ব্যাংক নামে-বেনামে ঋণ বের হওয়া কমতে থাকায় দেশের ব্যাংকিং খাতে আমানত প্রবৃদ্ধি গত তিন মাস ধরে বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত নভেম্বরে ব্যাংকগুলোতে খাতে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৬৩ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা যা ২০২৩ সালের একই মাসের তুলনায় ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা বেশি। ২০২৩ সালের নভেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে আমানত ছিল ১৬ লাখ ৪০ হাজার ৯৮১ কোটি।
গত বছরের আগস্টে আমানত প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। ওই মাসে আমানত প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৭ দশমিক ০২ শতাংশ। তবে সেপ্টেম্বর থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে শুরু করে। ওই মাসে আগের মাসের তুলনায় আমানত বাড়ে ১৪ হাজার ২০৮ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরে আমানতে প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে ৭ দশমিক ২৬ শতাংশ হয়। অক্টোবরে আমানতে প্রবৃদ্ধি হয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। অক্টোবর শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ১৭ দশমিক ৫৫ লাখ কোটি টাকা।
আহসান এইচ মনসুর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১১টি ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠন, টাকা ছাপিয়ে তারল্য সহায়তা দেওয়া, বেনামি ঋণ ইস্যু ঠেকানোসহ নানা পদক্ষেপেও দুর্বল ব্যাংকগুলোর অবস্থা খুব বেশি ভালোর দিকে না গেলেও খারাপের দিকে যাওয়া ঠেকানো গেছে। অন্যদিকে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় চলতি মাসে রিজার্ভ বেড়ে ২১ দশমিক ৬৭ বিলিয়নে উঠেছিল। যদিও এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) মাধ্যমে আমদানি পণ্যের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসের বিল বাবদ ১ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার পরিশোধের ফলে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ আবারও ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। তবে দেশের মোট রিজার্ভ ২৪ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ ১৪ বিলিয়নের ডলারের নিচে নামে। সে সময় বৈদেশিক ঋণ ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার কেনার মাধ্যমে রিজার্ভ বাড়ানো হয়।
গত ডিসেম্বর মাসে দেশে প্রবাসী আয়ের নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৪ বাংলাদেশের প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ রেমিট্যান্সের পরিমাণ ২৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে।