ক্যারিয়ারের চূড়ায় থাকার কথা ছিল তার। তবে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় স্বামী রোমান সানার হাত ধরে গোপনে দেশ ছেড়ে মার্কিন মুলুকে পাড়ি জমিয়েছেন দেশসেরা নারী আরচার দিয়া সিদ্দিকী। আরচারিকে পুঁজি করেই আরচার দম্পতি এখন স্বপ্ন দেখছেন প্রবাসে স্বপ্নের ঠিকানা গড়ার। তাদের এই না জানিয়ে চলে যাওয়া ভীষণভাবে বিব্রত করেছে আরচারি ফেডারেশনের কর্তাদের। তাই দিয়ার বেড়ে ওঠার শহর নীলফামারীতেই বিশ্বমানের আরচারি অ্যাকাডেমি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছেন তারা। স্থানীয় সরকারের সহায়তা ও নিজস্ব অর্থায়নে হবে এই অ্যাকাডেমি। নীলফামারী কেবল দিয়াকে জন্ম দেয়নি, এই শহরের আলো-বাতাস মেখে বড় হয়েছেন আরেক আরচার বিউটি রায়। তাই এখান থেকে নতুন দিয়া, নতুন বিউটি সন্ধান করা ও গড়ে তোলার স্বপ্নের কথা জানিয়েছেন আরচারি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পদাক কাজী রাজিব উদ্দীন আহমেদ চপল।
এ দেশে আরচারির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া চপল ওয়ার্ল্ড আরচারি এশিয়ার ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও কাজ করে যাচ্ছেন। একটি অপ্রচলিত ও অজনপ্রিয় খেলাকে দেশের মানুষের সঙ্গে কেবল পরিচয়ই করিয়ে দেননি, একই সঙ্গে প্রতিভাবান আরচার খুঁজে নিয়ে তাদের গড়ে তুলে দেশের জন্য এনে দিয়েছেন অসংখ্য আন্তর্জাতিক পদক। ২০১৯ সাউথ এশিয়ান গেমসে ১০ স্বর্ণপদকের ১০টিই জিতে নিয়েছিল বাংলাদেশের আরচাররা। আরচারিতে ঐতিহাসিক এই সাফল্যের কারণেই বাংলাদেশ সেবার স্বর্ণপদক জয়ের অতীত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিল। সেই অবিস্মরণীয় সাফল্য এনে দেওয়ার নেপথ্যের নায়ক হিসেবে ছিলেন রোমান সানা। তিনি জিতেছিলেন তিনটি স্বর্ণপদক। এছাড়া বিউটি রায়ের হাত ধরেও এসেছিল সোনার পদক। বিকেএসপির ছাত্রী দিয়ার উত্থান অবশ্য এর পরে। ধীরে ধীরে নিজেকে সেরাদের কাতারে নিয়ে যান ২০২০ টোকিও অলিম্পিকে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করা দিয়া। রিকার্ভে তাকে ধরা হতো সবচেয়ে প্রতিভাবান আরচার হিসেবে। প্রতিভাবান এই আরচারকে ভীষণ স্নেহ করতেন ফেডারেশন সাধারণ সম্পাদক চপল। তার এভাবে চলে যাওয়ায় কষ্ট পেলেও নিজেকে সামলে বলেছেন, যতদিন সামর্থ্য থাকবে আরও প্রতিভাবান আরচার খুঁজে গড়ে তোলার কাজ চালিয়ে যাবেন। সেই কথারই প্রতিফলন ঘটাতে চলেছেন নীলফামারীতে। অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষিত তারুণ্য উৎসব-২০২৫ এর অংশ হিসেবে আরচারি ফেডারেশন বুধবার নীলফামারীতে শুরু করেছে দিনব্যাপী নানা আয়োজন। পর্যায়ক্রমে ঢাকাসহ সাতটি জেলায় হবে আরচ্যারি র্যালি, স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি, শীতের পিঠাপুলি, দিনব্যাপী প্রদর্শনী ওপেন আরচারি প্রতিযোগিতা এবং দেশীয় সাংস্কৃতিক উৎসব। এই কর্মসূচির উদ্বোধন শেষে ঢাকা ফেরার পথে কাজী রাজীব উদ্দীন আহমেদ চপল বলেন, ‘এখান থেকে বিউটি রায় দিয়া সিদ্দিকীর মতো আরচার উঠে এসেছে। তাছাড়া নীলফামারীর স্থানীয় সরকার ও স্থানীয় কর্মকর্তারা আরচারিকে এগিয়ে নিতে ভীষণভাবে আগ্রহী। তাই এখানে আমরা দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ আরচারি অ্যাকাডেমি করার পরিকল্পনা করছি। এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসক আমাদের খাস জমি দিয়ে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। প্রয়োজনে কিছু জমি ফেডারেশনের পক্ষ থেকে কিনে নেব। আজ (বুধবার) এখানে দিনব্যাপী যে প্রতিযোগিতা হলো, দেখেই বুঝতে পেরেছে এখানে হেসেখেলে ১০০টি নিশানা বসানো যাবে। বিশ্বমানের একটি রেঞ্জের অন্যতম শর্ত ১০০ টার্গেট। এখানে সেটা করা সম্ভব। তাছাড়া এখানে বিমান, সড়ক ও রেল যোগাযোগও ভালো। আবাসনটা ভালোভাবে করতে পারলে এখানে আধুনিক রেঞ্জ ও অ্যাকাডেমি গড়ে তোলা সম্ভব।’
ফেডারেশনের নির্বাহী সদস্য মোহাম্মদ ফারুক ঢালী ফেডারেশনের ট্রেনিং ও আরচারি ডেভেলপমেন্ট কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে কাজ করছেন। তিনি জানান, ‘এক বছর জুড়ে আমরা যে ট্যালেন্ট হান্ট কর্মসূচি শেষ করলাম প্রায় ১২০ জন অনূর্ধ্ব-১৬ মেয়েদের নিয়ে, সেখান থেকে সাতজনকে আমরা জাতীয় দলের ক্যাম্পে যুক্ত করছি। সেই সাতজনের মধ্যে আছে নীলফামারীর তিনজন মেয়ে প্রভাতী রায়, বৃষ্টি রায়, প্রত্যাশা রায়। সুতরাং নীলফামারী আমাদের জন্য একটা সূতিকাগার হিসেবে গড়ে উঠছে ধীরে ধীরে।’ তারুণ্যের উৎসব-২০২৫-এর অংশ হিসেবে শুরু হওয়া কর্মসূচির শেষটা হবে ঢাকার পল্টন ময়দানে।
