দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রী পদে কোনো ব্যক্তি দুবারের বেশি না থাকা, একই সঙ্গে দলীয় প্রধান ও সংসদ নেতা হওয়া এবং কোনো আসনে ভোটারের ৪০ শতাংশ ভোট না পড়লে পুনর্নির্বাচনসহ ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৫০টি সুপারিশ করেছে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন। গতকাল বুধবার প্রধান উপদেষ্টার কাছে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ৯ পৃষ্ঠার সুপারিশ জমা দেয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার।
প্রতিবেদনে কমিশন নির্বাচনব্যবস্থায় ১৬টি ক্ষেত্রে সুপারিশ করেছে। যেখানে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের দায়বদ্ধতার কথাও রয়েছে।
নির্বাচনব্যবস্থা সুপারিশে বলা হয়েছে, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই টার্মে সীমিত করা। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে দুবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের অযোগ্য করা। একই ব্যক্তি একসঙ্গে যাতে দলীয় প্রধান, প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ নেতা হতে না পারেন, তার বিধান করা এবং দ্বৈত প্রতিনিধিত্বের সুযোগ বন্ধ করা।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, দলনিরপেক্ষ, সৎ, যোগ্য ও সুনামসম্পন্ন ব্যক্তির রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার বিধান করা। জাতীয় সংসদের উভয় কক্ষের সদস্য এবং স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচিত প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত বৃহত্তর নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার বিধান করা। কার্যকর সংসদের জন্য নির্ধারিত পদ্ধতিতে সংসদ সদস্যদের প্রত্যাহারের (ৎবপধষষ) বিধান করা।
সংসদে উচ্চকক্ষ আইনসভার বিষয়ে বলা হয়েছে, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ১০০ আসন নিয়ে সংসদের উচ্চকক্ষ সৃষ্টি করা। সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের হারের ভিত্তিতে (সংখ্যানুপাতিকভাবে) আসন বণ্টন করা। উচ্চকক্ষের নির্বাচনে প্রত্যেক দলের প্রাপ্ত আসনের ৫০ শতাংশ দলের সদস্যদের মধ্য থেকে এবং অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ আসন নির্দলীয় ভিত্তিতে নাগরিক সমাজ, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, মানবসেবা প্রদানকারী, শ্রমজীবীদের প্রতিনিধি, নারী উন্নয়নকর্মী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ইত্যাদির মধ্য থেকে সংখ্যানুপাতিক হারে নির্বাচিত করার বিধান করা। তবে শর্ত থাকে যে, দলীয় ও নির্দলীয় সদস্যদের মধ্যে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ নারীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা।
এতে আরও বলা হয়, সংসদের উচ্চকক্ষের সদস্যদের বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা কমপক্ষে স্নাতক নির্ধারণ করা। অন্যান্য যোগ্যতা-অযোগ্যতা নিম্নকক্ষের যোগ্যতার অনুরূপ করা। বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকারের পদ দেওয়া।
সংসদ নির্বাচনে নারীর প্রতিনিধিত্ব বিষয়ে বলা হয়, সংসদের (নিম্নকক্ষ) আসনসংখ্যা ১০০ বাড়িয়ে মোট সংখ্যা ৪০০ করা। এই ৪০০ আসনের মধ্যে নারীদের জন্য নির্ধারিত ১০০ আসন ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে নির্বাচনের বিধান করা, যাতে যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট আসন থেকে নারীদের সরাসরি নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং দ্বৈত প্রতিনিধিত্বের সুযোগ বন্ধ হয়।
প্রার্থীদের যোগ্যতা-অযোগ্যতার ক্ষেত্রে বেশ কিছু সুপারিশ করেছে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন। সুপারিশে বলা হয়, ঋণ-বিল খেলাপিদের প্রার্থী হওয়া থেকে বিরত রাখা। কোনো আদালত কর্তৃক ফেরারি আসামি হিসেবে ঘোষিত ব্যক্তিদের প্রার্থী হওয়া থেকে বিরত রাখা। বেসরকারি সংস্থার কার্যনির্বাহী পদে আসীন ব্যক্তিদের প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে ওই পদ থেকে তিন বছর আগে অবসর গ্রহণ-সংক্রান্ত আরপিওর ধারা বাতিল করা। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৬(২)(ঘ)-এর অধীনে নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে বিচারিক আদালতে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার শুরু থেকেই সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য করা।
এ ছাড়া আইসিটি আইনে (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে) শাস্তিপ্রাপ্তদের সংসদ নির্বাচনে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার শুরু থেকেই সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য করা। গুরুতর মানবাধিকার (বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, অমানবিক নির্যাতন, সাংবাদিকদের/মানবাধিকারকর্মীর ওপর হামলা ইত্যাদি) এবং গুরুতর দুর্নীতি, অর্থ পাচারের অভিযোগে গুম কমিশন বা দুর্নীতি দমন কমিশন বা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কর্তৃক অভিযুক্ত হলে তাদের সংবিধানের ৬৬(২)(ছ) অনুচ্ছেদের অধীনে একটি বিশেষ আইন প্রণয়ন করে সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য করা। (সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতার মাপকাঠি উচ্চতর হওয়া দরকার এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা দরকার। এ ক্ষেত্রে ‘ট্রানজিশনাল জাস্টিসের’ যুক্তিও উত্থাপন করা যেতে পারে।)
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পদত্যাগ না করে সংসদ সদস্য পদে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য করা। তরুণ, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য শতকরা ১০ ভাগ মনোনয়নের সুযোগ তৈরির বিধান করা। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দেওয়ার বিধানের পরিবর্তে ৫০০ ভোটারের সম্মতির বিধান করা এবং এ ক্ষেত্রে একক কিংবা যৌথ হলফনামার মাধ্যমে ভোটারদের সম্মতি জ্ঞাপনের বিধান করা। একাধিক আসনে কোনো ব্যক্তির প্রার্থী হওয়ার বিধান বাতিল করা।
কমিশনের সুপারিশে নির্বাচনী ব্যয় অংশে রয়েছে, সংসদীয় আসনের ভোটারপ্রতি ১০ টাকা হিসেবে নির্বাচনী ব্যয় নির্ধারণের বিধান করা। সব নির্বাচনী ব্যয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা বা আর্থিক প্রযুক্তির (যেমন : বিকাশ ও রকেট) মাধ্যমে পরিচালনা করা। নির্বাচনী আসনভিত্তিক নির্বাচনী ব্যয় নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নিবিড়ভাবে নজরদারি করা। প্রার্থী এবং দলের নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবের রিটার্নের নিরীক্ষা এবং হিসাবে অসংগতির জন্য শাস্তির বিধান করা।
কমিশনের সুপারিশ অংশে নির্বাচনী আচরণবিধি বিষয়ে বলা হয়েছে, ব্যানার, তোরণ ও পোস্টারের পরিবর্তে লিফলেট, ভোটারপ্রার্থী মুখোমুখি অনুষ্ঠান, পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপন ও সরকারি গণমাধ্যমে প্রচারের সমসুযোগ প্রদানের বিধান করা। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৪ মেনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার বিধান করা। ১৯৯০ সালের তিন জোটের রূপরেখার মতো রাজনৈতিক দলের জন্য আচরণবিধি প্রণয়ন করা।
