কে আগে কিংবা কে পরে, কে বড় কে ছোট সেটা তর্ক-বিতর্কের বিষয়ে নয়। পরস্পর পরস্পরের সম্পর্ক-শরিকানা ও চৌহদ্দি চত্বর অনুভবের আয়নায় দেখা দরকার। মানুষ মূলত বিশ্বাসের বিশে^ বাস করে। বিশ্বাসের ভিত্তিতে সম্পর্কের সৌধ নির্মিত হয়, বিশ্বাস ভঙ্গের কারণে সেখানে ফাটল ধরে, এক সময় ধসেও পড়ে। তাবৎ ভাঙাগড়া, আনন্দ-বেদনা, সুখ-সর্বনাশের বাদী-বিবাদীই বিশ্বাস। আস্থা না থাকলে, আস্থাবান না হলে, বিশ্বস্ততার বাজারেও মুখ বেজার করে ফিরতে হয়। আস্থার সংকট সবার জন্য দুঃসংবাদ। বিশ্বাস ছাড়া সুখ, শান্তি, সাহস ও সচলতা, তা ব্যক্তি বা ব্যষ্টির হোক, সংকটে পড়তে বাধ্য। এমনকি সভ্যতার সংকটের শুরু সেখান থেকে তো বটেই।
বিশ্বাস যৌগিক না মৌলিক, এটি আদৌ পদার্থ না বায়বীয়, এর অবয়ব অবকাঠামো নিয়ে নিশ্চয়ই অনেক কিছু ভাবনার ও গবেষণার অবকাশ আছে। দৈহিক নিরোগ নিরাময়তা, মানসিক শক্তি-শান্তি-সক্ষমতা, সামাজিক সুনাম-স্বীকৃতি এবং আধ্যাত্মিক সংযোগ-সখ্যতা সব মিলিয়েই পরিপূর্ণ সুস্থতা। তেমনি বিশ্বাসই সব সুখের সংস্থপয়িতা। বিশ্বাসে মিলায় বস্ত তর্কে বহুদূর। সাহিত্যের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক বিশ্বস্ততার, অতি প্রাচীন। অর্থাৎ বিশ্বাস এমন একটি মূল্যবোধ, যা সাহিত্যে প্রতিফলন না ঘটলে সেই সাহিত্য জীবন, প্রকৃতি ও ঐতিহাসিক ঐক্যের প্রতিফলক বা সৎসাহিত্য বলে প্রতিভাত হবে না। সাহিত্যের ধ্রুপদি চরিত্র নির্মাতারা চারটি ঐক্য বিধানকে সাহিত্যের পরম আরাধ্য বলে বিবেচনা করেছেন। সাহিত্য যেহেতু জীবনেরই প্রতিচ্ছবি প্রতিফলক সত্যম শিবম সুন্দরের পৃষ্ঠপোষকতা ভিন্ন সাহিত্য সত্যিকারের সাহিত্য পদবাচ্য হবে না। সৃজনশীল কর্ম হিসেবে ভাবকল্পনার আশ্রয় নিয়েও সাহিত্য জীবন সত্য ও বিশ্বাসের প্রতিভূ-প্রতিবিম্বক হিসেবে তুলে ধরবে, এমনটি সেই আদিকালের সাহিত্য শাস্ত্রবেত্তারাও বলে গিয়েছেন।
সময়ের ঐক্য, স্থানের ঐক্য, ঘটনার ঐক্য এবং চিন্তা-চেতনার (নৈতিকতার) ঐক্য এই চার বেদবাক্য মানতেই হবে সাহিত্যকে তা সে কবিতা গল্প উপন্যাস বা ললিতকলা চিত্রকর্ম যাই হোক না কেন। ‘আকাশেতে গাভীগণ করিতেছে চেচায়ন’ ছন্দবদ্ধ কবিতা মনে হতে পারে, তবে এটি কবিতা নয়। কেননা এ কবিতায় স্থানের ঐক্য মানা হয়নি মর্ত্যরে গাভীগণ আকাশেতে চেঁচামেচি করতে পারে না। ‘পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছ?’ বঙ্কিম চন্দ্রের কপালকু-লার এ প্রশ্নের মধ্যে গহিন বনের উ™£ান্ত পথিকের পরিচয় তার পরিবেশ অনুযায়ী হতে পারে তবে ভাবার্থে, প্রতীকীরূপে এ প্রশ্ন দিশেহারা, গতিহারা, উদাস উদ্্ভ্রান্ত অন্য কারও জন্যও ব্যবহৃত হতে পারে। শেক্সপীয়র জীবন নাট্যের অতি পুরনো অতি স্বাভাবিক ও প্রাসঙ্গিক প্রশ্নটি রেখেছেন হ্যামলেটের মুখে, To be or not to be that is the question। হ্যামলেট-অফেলিয়র প্রেম সাগর মাঝে তার সদ্য বিধবা মা এবং তার চাচার ষড়যন্ত্র ও রাজকীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য কুৎসিৎ অবৈধ সম্পর্ক রচনায় হতবিহ্বল হ্যামলেটকে ‘কী হবে বা কী হওয়া উচিত’ জাতীয় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
সদ্য প্রয়াত স্বামীর প্রতি তার মায়ের বিশ্বাসভঙ্গতার এমন নির্মম ও চরম সত্যের কথা তার স্বগতোক্তিতে এসে গেছে frailty thy name is woman. ওফেলিয়াকে সে একই নিক্তিতে মাপতে চাইছে। এখানে হ্যামলেটের বিশ্বাস হোঁচট খাচ্ছে, তার বিশ্বাসকে কে যেন টলাতে চাইছে, যদিও পারেনি সত্যের সন্ধান সমাধানের ইঙ্গিত সে খুঁজে ফিরছে। দিগন্তে দাঁড়িয়ে দুবাহু বাড়িয়ে কে যেন তাকে ডেকে নিতে চায়। এখানে বিশ্বাসের সেই চিরন্তন দ্বন্দ্ব। আদি মানব-মানবীর স্বর্গ থেকে বিদায়ের মুখ্য কারণ বিশ্বাস ভঙ্গ এই দ্বিধা বা দ্বন্দ্ব। বিধাতা বড় আশা করে, ফেরেশতাদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাকে জ্ঞান-প্রজ্ঞায় অভিসিক্ত করেছেন। নিষিদ্ধ বোধিবৃক্ষের কাছে যেতে বিধাতার নির্দেশ লঙ্ঘনে প্রকারান্তরে বিশ্বাসভঙ্গের শামিল। শয়তান তাদের এ ব্যাপারে প্ররোচিত করেছে। ক্রিস্টোফার মার্লোর ফাউস্ট জ্ঞান-গরিমায় এতদূর পৌঁছিয়েছে যে, অপদেবতার সঙ্গে সন্ধি করাতে তার বিভ্রান্তির বৈকল্য তাকে প্রচ- পরিণতির পথে নিয়ে গিয়েছে। ব্রুটাস জুলিয়াস সিজারের অত্যন্ত বিশ্বস্তজন। সেও যখন স্বার্থের প্রশ্নে বিশ্বাস ভঙ্গ করে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে, এটা দেখে, বিস্ময়ে হতবাক চিরন্তন দুঃখ ও বেদনাবোধের সঙ্গে মৃত্যু মুহূর্তে সিজার বলেছে ‘ব্রুটাস তুমিও’।
অন্যদের ছুরিকাঘাতের চাইতে সিজারের দেহে ব্রুটাসের আক্রমণটি ছিল most unkindest cut of all. কেননা এটি ছিল বিশ্বস্ত বন্ধুর অতি অবিশ্বস্ততার প্রতীকী প্রকাশ। এটা চলে আসছে সেই অতি প্রাচীনকাল থেকে। ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’ ঘরভেদী বিভীষণের কর্মকা-, স্বর্পনাখার অবিশ্বস্ততা, রাবণের সীতার সতীত্ব হরণের প্রয়াসকে বাধা দিয়েছে ঠিকই শেষমেশ সত্য ও বিশ্বাসের জয় হয়েছে। বিশ্বাসের জয় হয়েছে শেক্সপীয়রের ম্যাকবেথেও। ম্যাকডাফ মায়ের পেট থেকে জন্ম নেয়নি সে কারণে সেই কীভাবে হবে ম্যাকবেথের হত্যাকারী। কিন্তু ম্যাকবেথ তার বিশ্বাসের অকাল মৃত্যু হিসেবে যখন জানতে পারল, ম্যাকডাফের জন্ম মায়ের পেটের থেকে নয়, তার জন্ম হয়েছে সিজারিয়ানের মাধ্যমে, তখন ম্যাকবেথের সব সরল বিশ্বাসের অপমৃত্যু ঘটে। রাজা ডানকান অতি বিশ্বস্ত সেনাপ্রধানের বাসায় রাত যাপনকে অত্যন্ত নিরাপদ ভেবেছিলেন। কিন্তু ডানকানকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করে ম্যাকবেথ বিশ্বাসভঙ্গের এই নিষ্ঠুরতার ফলে সে এবং তার স্ত্রী জীবনের পরবর্তী দিনগুলোতে আর ঘুমাতে পারেনি। ম্যাকবেথের হাতে নিরীহ ও ঘুমন্ত রাজা ডানকানের রক্ত লেগেছিল সে এবং তার স্ত্রী আরবের সেবা পারফিউম মেখেও হাতের সে দাগ ও গন্ধ ঘুচাতে পারেনি। এটা বিশ্বাসের জয় এটা আছে বলেই শেক্সপীয়রের সাহিত্য ধ্রুপদি, কালোত্তীর্ণ। ওথেলোর প্রেমে বুঁদ ডেসডিমোনা ইয়েগোর কূটচালে অবিশ্বস্ত সহচরী, সাজায় ভুল বোঝাবুঝির কবলে পড়ে মুর সেনাপতি ওথেলোর দ্বারাই নিহত হয়। প্রেমিকের হাতে প্রেমিকার এই মর্মান্তিক মৃত্যু ওথেলো নাটক কে সেরা বিয়োগান্তক বা ট্র্যাজেডির মর্যাদায় অভিষিক্ত। একই সঙ্গে মনের যে যন্ত্রণা ওথেলো এবং ডেসডিমোনা ভোগ করেছে তা তো বিশ্বাসের অপমৃত্যুর প্রেক্ষাপটে। কুচক্রী ইয়েগো তার পরিণতি ভোগ করেছে তা তো প্রকারান্তরে ওই বিশ্বাসের বিজয়।
মুনীর চৌধুরীর ‘রক্তাক্ত প্রান্তরে’ ইব্রাহিম লোদী এবং তার প্রেমিকা জোহরার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ প্রকৃতির রক্তক্ষরণের সঙ্গে একাকার হয়ে গিয়েছে। জসীমউদ্দীনে ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ কাব্যের সাজু ও রুপার কাহিনি তো কিংবা ‘বেদের মেয়ে’ চম্পাবতী ও সওদাগরের অবৈধ অনৈতিক জোরপূর্বক প্রেম উপাখ্যান গয়া বাইদ্যার অনুপম আকিঞ্চন আকাক্সক্ষাকে খর্ব করতে পারেনি। দস্তয়ভস্কির ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ এমনকি সৈয়দ ওয়ালিউল্যার ‘লালসালু’ ও ‘চাঁদের অমাবস্যা’তে মানব হৃদয়মাঝে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কঠোরতা কপটতার উলম্ব প্রকাশ ঘটিয়ে বিশ্বাসের প্রতি জাগ্রত চেতনাকে উজ্জীবিত রেখেছে।
আজকাল দেশি-বিদেশি টিভি চ্যানেলে যে ধারাবাহিক বা সিরিয়াল নাট্যমালা প্রদর্শিত হয় সেখানে সময়ের ঐক্য, নৈতিক চেতনার ঐক্য ভেঙে ঐক্য নীতির উপেক্ষার প্রেক্ষাপটে দর্শক-স্রোতা বিভ্রান্তিতে পড়ে বলেই তা সৎ শিল্পকর্ম পদবাচ্য হয় না। আকাশ সংস্কৃতির বদৌলতে প্রতিবেশী দেশের একটি ধারাবাহিকে দর্শকরা দেখছে অনবরত অসত্য ও ষড়যন্ত্রের জয় হচ্ছে, সততা সদা দলিত ও পরাজিত হচ্ছে। পরিবারের ঐক্য, স্বামী-স্ত্রীর নিখাদ ভালোবাসায় তাদের বিশ্বাসে ভাঙন অবারিত হচ্ছে। সেখানে এটাও দেখানো হচ্ছে ষড়যন্ত্রকারী কূটচালে বেশ দক্ষতার সঙ্গে তলিয়ে যাচ্ছে। দর্শক চাচ্ছে, অন্যায়ের প্রতিবিধান হোক, জীবন-সংগ্রামে শুধু পরাজয় কেন? এখানে দর্শককে বেশিদিন ধরে রাখতে চেয়ে অবিশ্বস্ততার বিশ্বাস ভঙ্গের জয়জয়কার ঘটানো হচ্ছে। সেখানে সত্য ও বিশ্বাস, শিবম ও স্ন্দুর বারবার ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে শুধু বাণিজ্যিক কারণে সিরিয়ালকে লম্বা করার জন্য। এর জন্য নীতি ও নৈতিকতার বিজয় প্রত্যাশী দর্শক-স্রোতার মূল্যবোধের মাঠে খরা দেখা দিচ্ছে। হুমায়ূন আহমেদের ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ এক বিচিত্র ব্যতিক্রম-সুভাষ দত্তের ‘আবির্ভাব’, ‘সুতরাং’ বসুন্ধরা’ প্রভৃতি শিল্পকর্মে বিশ্বাসের জয় সুনিশ্চিত হয়েছে। প্রখ্যাত জাপানি চলচ্চিত্রকার কুরোসাওয়ার ‘রশোমন’ চলচ্চিত্রে বিশ্বাসপ্রবণ চরিত্রেরই শেষমেশ বিজয় হয়েছে, সামুরআই মিফুনে শেষমেশ বিশ্বাস বিজয়ী চরিত্রে পরিণতি পেয়েছে।
পৃথিবীর তাবৎ শিল্পকর্ম চর্চায় সত্য ও সুন্দরের আরাধনা, ন্যায় নীতিনির্ভরতারই জয়গান গাওয়া হয়েছে। কেননা ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’ বলে যে কথাটি আছে, তা শেষমেশ আরোপিত হয়েই থাকে। আর এই বিশ্বাস আছে বলেই মানুষ সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে, সত্যকে পেতে সংগ্রাম করে। পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস বা আস্থার আলোকেই ভিন্ন পথের দুজন একত্রে সম্মিলিত হয় সংসারে। বাদ ও প্রতিবাদ একত্রে বসবাস করে, তাদের মধ্যে মেলবন্ধনের প্রেরণা জোগায় বিশ্বাস। বিশ্বাসকে তুলে ধরতে, স্থায়িত্ব দিতে এবং বিশ্বাসের ভিত্তিতে মানুষ নিয়ম-কানুন আইন আদালত, বিচার-আচার তৈরি করেছে। পার্থিব এসব বিচার-আচারও যখন সত্য ও সুন্দরকে সুরক্ষা দিতে পারে না, বিশ্বাসের মৃত্যুঘণ্টা বাজার মুহূর্তে মানুষ প্রত্যক্ষ করে প্রকৃতি এসে অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে এবং সত্য প্রতিষ্ঠিত করেছে। এখানে বিশ্বাসের মূল্যবোধ বিজয়ীবেশে মানুষের মনে প্রোথিত হয়েছে। মানুষের মধ্যে চিরন্তন এই আকাক্সক্ষা যদি উজ্জীবিত না থাকত তাহলে মানবজাতির জন্ম ও বিকাশ অচলায়তনের অবয়বে চলে যেত। ইতিহাসের যুগসন্ধিক্ষণে মানব ভাগ্যের বিপর্যয় পর্বে এসেও আশার তরী তীরে ভিড়ে, সাফল্যের শিখরে বিজয় কেতন ওড়ে। মানবসভ্যতার ইতিহাসের সব পথপরিক্রমায় এই সত্য প্রতিভাত হয়েছে যে, আস্থা বা বিশ্বাসই বড়। আর সেই বিশ্বাসকে বাক্সময় করে তুলেছে সব ধ্রুপদি সাহিত্য। তার সীমানা বিশাল, ক্ষুদ্রত্ব এবং পরাজয় সেখানে অপাঙক্তেও, বড় বেমানান।
লেখক: সাবেক সচিব ও চেয়ারম্যান সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন
সধুরফ.সঁযধসসধফ@মসধরষ.পড়স
