বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমি কয়েক মাস ধরে বলছি, আপনারা যত সহজ ভাবছেন, সামনের নির্বাচন এত সহজ নয়। নিজের মনে যতই বড়াই করুন। জনগণ হচ্ছে আমাদের শক্তি, আমাদের সমর্থন। জনগণই ম্যাটারস। জনগণ সঙ্গে না থাকলে কী হয় ৫ আগস্ট বুঝিয়ে দিয়েছে। কাজেই আমরা যদি ভুল করি, জনগণ আবার একটা কিছু বুঝিয়ে দেবে। তখন কিন্তু পস্তাতে হবে, হা-হুতাশ করতে হবে।’ গতকাল রবিবার বিকেলে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ৮৯তম জন্মবার্ষিকী পালন উপলক্ষে আলোচনা সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে এসব কথা বলেন।
নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ৮৯তম জন্মবার্ষিকী পালন করেছে বিএনপি। ১৭ বছর পর ভিন্ন পরিবেশে পালিত হওয়া এই জন্মদিনে দলের নেতাকর্মীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ দেখা গেছে। গতকাল সকালে শেরেবাংলা নগরে শহীদ রাষ্ট্রপতির কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন, বিকেলে আলোচনা সভা, কেন্দ্রীয়সহ সারা দেশে বিএনপি কার্যালয়ে দলীয় পতাকা উত্তোলন, শীতবস্ত্র বিতরণ, জিয়া স্মৃতি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট, ক্রোড়পত্র প্রকাশসহ নানা কর্মসূচি ছিল দিনটি উপলক্ষে।
নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ‘এখনো সময় আছে, আসুন, আমরা জনগণের পাশে থাকি। আপনাকে-আমাকে, দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, এমন যারা করবে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তুলব। শহীদ জিয়ার ৮৯তম জন্মবার্ষিকীতে সত্যিকারভাবে স্মরণ করতে, সম্মান জানাতে হবে। দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য দোয়া করছি। তবে দেশনেত্রী সবচেয়ে খুশি হবেন, যখন দেখবেন জনগণ সমর্থন দিয়েছে বিএনপির প্রতি। বিষয়টি খালেদা জিয়ার সৈনিক হিসেবে আপনাদের উদ্দেশে বলা দরকার। আমরা কে ছোট নেতা, কে গ্রামের, কে ইউনিয়নের নেতা, কে বড় নেতা, কে বিভাগীয়, কে কেন্দ্রীয় নেতা বিষয়টি এটি নয়। বিষয়টি হচ্ছে, আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে হবে। এমনভাবে দাঁড়াতে হবে, যাতে জনগণ বুঝে আমরা তাদের সঙ্গে আছি, পাশে আছি। শহীদ জিয়ার জন্মবার্ষিকীতে এই হোক আমাদের শপথ, প্রতিজ্ঞা।’
রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি আয়োজিত এই আলোচনা সভায় তারেক রহমান আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রের সরকারের প্রতিটি পর্যায়ে জাতীয় সংসদ হোক, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদে হোক জবাবদিহি থাকতে হবে। ভোটই একমাত্র জবাবদিহি। রাষ্ট্রের সমাজের সর্বস্তরে যদি আমরা জবাবদিহি তৈরি করতে পারি, তাহলে ধীরে ধীরে আমরা এগোতে সক্ষম হব। সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকলে প্রতিটি কাজে তাদের ক্ষোভ, দুর্দশা লাঘব করা সম্ভব হবে। জনগণের কথা, ইচ্ছা, আকাক্সক্ষা প্রতিফলিত হবে সরকারের কাজের মাধ্যমে।’
বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘আমরা মোটামুটি একটা গড় হিসেবে জানি, বিএনপির ৬০ লাখ নেতাকর্মীর নামে বিভিন্ন মিথ্যা-গায়েবি মামলা আছে। শুধু জুলাই-আগস্ট মাসের আন্দোলনে বিএনপিরই প্রায় ৫০০-এর মতো নেতাকর্মী শহীদ হয়েছেন, হাজারের মতো নেতাকর্মী বিভিন্নভাবে জখম হয়েছেন। বিএনপি নেতাকর্মীরা মোটরসাইকেলের বহরের অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছেন। মানুষ হিসেবে হয়তো আমরা বিভ্রান্ত হতেই পারি। কিন্তু যে পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়েছি, সহকর্মীরা, আমি বিনীতভাবে আপনাদের কাছে করজোড়ে অনুরোধ করব, এ আলোচনায় শুধু নয়, সমগ্র বাংলাদেশে শহীদ জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার যত কর্মী-সৈনিক আছেন, দয়া করে ওই মোটরসাইকেলওয়ালাদের ভিড় করতে দেবেন না। দয়া করে আপনারা শহীদ জিয়াউর রহমানের জানাজার চিত্রটা মনে করবেন এবং বিভ্রান্তিকর কাজ করা থেকে বিরত থাকবেন।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আমি আপনাদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখতে চাই? রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আপনার এতটুকু চিন্তা বা সেন্স থাকতে হবে। কোনো কারণে যদি অন্য কেউ সরকার গঠন করে, সেটা বাংলাদেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বা আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে হোক, তা-কি দেশ ও জাতির জন্য ভালো হবে?’ নেতাকর্মীরা আবারও সমস্বরে বলেন, ‘না’।
তারেক রহমান বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে চাই, আপনারা দৃঢ়ভাবে না বললেন সেটা বুঝেশুনে বলেছেন। তাই যদি ঠিক হয়, এখনো আমাদের কাছে সময় আছে মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর। দিনশেষে কিন্তু রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আপনাকে এই জনগণের কাছে, মানুষটার কাছে, ভোটারের কাছে যেতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘দুদিন আগে আমি একজন ব্যক্তির টকশো দেখছিলাম। সেই আলোচক কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন, এখনো বুঝে উঠতে পারছি না যে স্বৈরাচার পালিয়ে গিয়েছে। তারা আবার মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে। করতেই পারে তারা। কিন্তু তারা যদি ভোটের মাঠে নামে, কী চেহারায় মানুষের সামনে হাজির হবে। এই জুলাই-আগস্ট মাসে দুই হাজার মানুষকে যে হত্যা করেছে, প্রায় ৩০ হাজারের মতো মানুষকে জখম করেছে, ইউনিসেফের বক্তব্য অনুযায়ী প্রায় ৬৪ শিশুকে তারা হত্যা করেছে। জবাব কিন্তু তাদের মানুষের কাছে দিতেই হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সামনে পরিষ্কার উদাহরণ আছে, জনগণ যখন ক্ষিপ্ত হয়, স্বৈরাচারকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে। দিনের শেষে জনগণই সব। আমরা জনগণের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছি, সমর্থন পেতে হলে ভালোভাবে মানুষ সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করতে হবে।’
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে ও প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, সেলিমা রহমান, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। এ ছাড়া কবি আবদুল হাই শিকদার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল আহসান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মামুন আহমেদ আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন।
সকালে জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমরা প্রাথমিকভাবে এখনো মন্তব্য করতে চাইনি। কারণ, পুরো প্রতিবেদন আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি। সরকার যেটা বলেছে এবং যে পরিকল্পনা করেছে, এই প্রতিবেদন পাওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে, তারপরই সিদ্ধান্ত হবে এবং ঐকমত্য ছাড়া কোনোটাই গ্রহণযোগ্য হবে না।’
বিএনপি জুলাই-আগস্টের মধ্যে নির্বাচন দাবি করেছে, কিন্তু বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে, এই দাবি অবাস্তব। এত দ্রুত বিচার ও সংস্কার সম্ভব নয় এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা তো বরাবর এক কথা বলে এসেছি, সংস্কার ও নির্বাচনের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। যে নির্বাচন হবে এবং যে সরকার আসবে, যে দল সরকারে আসবে, তারা এই সংস্কারগুলো এগিয়ে নিয়ে যাবে। আমরা আমাদের দলের পক্ষ থেকে পরিষ্কারভাবে বলতে পারি, আমরা প্রতিটি সংস্কারকে এগিয়ে নিয়ে যাব।’
তিনি বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের যদি জন্ম না হতো, তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা কী অবস্থায় যেত, এটা আমরা জানি না। জিয়াউর রহমান একদিকে যেমন সৈনিক ছিলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাও ঘোষণা করেছিলেন। স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে তিনিই প্রথম বাংলাদেশে যে সংস্কার, অর্থাৎ একদলীয় শাসনব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় শাসনব্যবস্থায় নিয়ে আসেন। তিনিই প্রথম বদ্ধ অর্থনীতিকে ভয়ংকর সমাজতান্ত্রিক চিন্তার যে অর্থনীতি ছিল, তার থেকে মুক্ত করে তিনি মুক্তবাজার অর্থনীতির একটা পরিকল্পনা চালু করেন। তার সময়েই কৃষিতে বিপ্লব হয়েছিল। তারই উত্তরসূরি খালেদা জিয়া দলকে আরও শক্তিশালী করেছেন। তিনি অসুস্থ অবস্থায় লন্ডনে আছেন। তার আরোগ্য লাভের জন্য দোয়া করছি।’ অতি অল্প সময়ের মধ্যে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার প্রত্যাশাও করি।
দিনটি উপলক্ষে দলটির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী জিয়াউর রহমানের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এ সময় বিএনপি মহাসচিবের সঙ্গে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, কেন্দ্রীয় নেতা আহমেদ আজম খান, আমান উল্লাহ আমান, জয়নুল আবদিন ফারুক, রুহুল কবির রিজভীসহ বিএনপির অঙ্গসহযোগী সংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। নেতাকর্মীরা ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে মিছিল সহকারে কবর প্রাঙ্গণে আসেন। তাদের মুখে ‘স্বাধীনতার ঘোষক জিয়া, লও লও লও সালাম’, ‘এক জিয়া লোকান্তরে, লক্ষ জিয়া অন্তরে’, ‘টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, জিয়া তোমায় ভুলে নাই’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।
এ ছাড়া বিএনপির সহযোগী সংগঠনগুলোও জন্মদিন উপলক্ষে আলোচনা সভা ও শীতবস্ত্র বিতরণ করে। দলের শহর, জেলা ও উপজেলা ইউনিটগুলোও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি পালন করে। জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ২৬ থানার অংশগ্রহণে ‘জিয়া স্মৃতি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট’ আয়োজন করে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি। মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হয়।
