ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক মিলিয়ে এই মৌসুমে বসুন্ধরা কিংস ১৫ ম্যাচ খেলে মোট গোল করেছে ৩০টি। গোলের এই হিসাবে কিংস সমর্থকদের খুব বেশি আশান্বিত হওয়ার কিছু নেই। শীর্ষ ফুটবলে আবির্ভাবের পর থেকে সবচেয়ে বাজে সময় কাটছে ক্লাবটির। মৌসুমের একেবারে শুরুতে এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগের তিন ম্যাচের তিনটিতেই হার। মৌসুমের নতুন সংযোজন বাংলাদেশ ২.০ চ্যালেঞ্জ কাপে মোহামেডানকে হারিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যর্থতা কিছুটা ভুলতে পেরেছিল তারা। তবে প্রিমিয়ার লিগ ও ফেডারেশন কাপে সময়টা মোটেই ভালো যাচ্ছে না পাঁচবারের লিগ চ্যাম্পিয়নদের। লিগের আট রাউন্ড শেষে শিরোপা ধরে রাখার কাজটা কিংসের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। শীর্ষে থাকা মোহামেডানের সঙ্গে ১০ পয়েন্ট এবং দুইয়ে থাকা আবাহনীর সঙ্গে ব্যবধান ৫ পয়েন্টের।
কিংসের যখন সর্বনাশ তখন দলটির ডিফেন্ডার তপু বর্মণের জন্য পৌষ মাস এসে হাজির। কিংসের রক্ষণভাগের প্রধান অস্ত্র নিয়মিত গোল করে চলেছেন। ভাবা যায়, কিংসের হয়ে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় ব্রাজিলিয়ান মিগেল ফিগেইরা, জোনাথন ফার্নান্দেজদের পাশে আছে তার নাম! এর মধ্যেই পাঁচ গোল করে ফেলেছেন তপু। নিজের ক্যারিয়ারে এক মৌসুমে যা সর্বোচ্চ।
‘আপনি ডিফেন্ডার নাকি স্ট্রাইকার?’ এমন প্রশ্নের জবাবে একটা পরিসংখ্যান টেনে আনলেন গত ডিসেম্বরে ত্রিশে পা রাখা তপু। শীর্ষ পর্যায়ে খেলা শুরুর পর এখন পর্যন্ত করেছেন ২১ গোল। সংখ্যাটা এ দেশের যেকোনো স্ট্রাইকারের জন্যই হিংসে করার মতো। নিজেই বললেন, ‘গোলের সব হিসাব আমার কাছে লেখা আছে। মোহামেডানের তিন গোল, সাইফের হয়ে দুই, আবাহনীর হয়ে এক গোলের পর বসুন্ধরা কিংসের হয়ে পাঁচ মৌসুমে করেছি ৯ গোল। আর জাতীয় দলের হয়ে আছে ৬ গোল। এখন আপনারাই বিচার করেন আমি ডিফেন্ডার নাকি স্ট্রাইকার (হাসি)।’
শনিবার লিগের ম্যাচে ফর্টিস এফসির বিপক্ষে হেডে গোল করে কিংসকে এগিয়ে নিয়েছিলেন তপু। তবে সেই লিড ধরে রাখা যায়নি। ফর্টিসের আব্দুল্লাহ গোল করে দলকে পাইয়ে দেন গুরুত্বপূর্ণ এক পয়েন্ট। এই ম্যাচ থেকে দুই পয়েন্ট খোয়ানোতে লিগ রেস থেকে অনেকটাই পিছিয়ে যেতে হয়েছে কিংসকে। সামনের দিনগুলোয় মোহামেডান-আবাহনীর সঙ্গে ব্যবধান কতটা ঘোচাতে পারবে কিংস, তা সময়ই বলে দেবে। সেই দলের তপুর মধ্যে কাজ করছে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া, ‘প্রথম পর্ব শেষের আগেই মৌসুমে পাঁচ গোল করেছি। এতে একটা ভালোলাগা কাজ করছে ঠিক। তবে খারাপ লাগার দিক হলো দল ভালো করছে না। একটা দল দীর্ঘদিন টানা ভালো করার পর খারাপ সময় অবশ্য আসতেই পারে।’
এই মৌসুমে কিংসের হয়ে ‘গোলদাতা’ তপুর অবদান অনেক। চ্যালেঞ্জ কাপে মোহামেডানের বিপক্ষে ৩-১ গোলে জয়ের প্রথম গোলটি এসেছিল তার পা থেকে। এ ছাড়া ফেডারেশন কাপে করেছেন দুই গোল। যার একটি ব্রাদার্সের বিপক্ষে ছিল জয়সূচক। লিগে ফর্টিসের বিপক্ষে ম্যাচের আগে রহমতগঞ্জের বিপক্ষেও গোল করেন তপু।
ফুটবলের হাতেখড়ি হয়েছিল অ্যাটাকার হিসেবে। নিজ জেলা নারায়ণগঞ্জের লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলের মাঠে কোচ জাকির হোসেনের অধীনে খেলা শুরু করেছিলেন আক্রমণভাগে। কোচ জাকিরের কিনে দেওয়া বুট পরেই শুরু ফুটবলের যাত্রা। বর্তমানে ঢাকা ওয়ান্ডারার্সের কোচ জাকির অবশ্য নারায়ণগঞ্জে একটি বয়সভিত্তিক আসরে তপুকে নিয়ে আসেন সেন্টারব্যাক পজিশনে। এরপর ক্যানারি ওয়ার্ফের ট্রায়ালে সুযোগ পেয়ে পূরণ হয় লন্ডন দর্শনের স্বপ্ন। ফিরে আসার পর থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তপুকে। বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলের হয়ে খেলে ২০২৪ সালে জাতীয় দলে সুযোগ পান। দলের রক্ষণভাগের প্রধান অস্ত্র হিসেবে জাতীয় দলে খেলছেন দীর্ঘদিন ধরে। সেই তপু নিজের সুসময়ে দলের দুঃসময় হাজির হওয়াটা মেনে নিতে পারছেন না, ‘কিংসের মতো একটা দল, যারা আমাদের সবধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে আসছে সেই শুরু থেকে, তাদের এ রকম দুঃসময়ের মধ্যে পড়তে হবে সেটা কখনোই কল্পনা করিনি। আমি মনে করি দলকে সঠিক পথে আনার দায়িত্বটা নিতে হবে খেলোয়াড়দেরই। আমরা তো বেশিরভাগ খেলোয়াড় জাতীয় দলে খেলছি। আমরা কেন ক্লাবে নিজেদের সেরাটা দিতে পারছি না এই প্রশ্নটা নিজেদের মধ্যেই করতে হবে।’
আগের পাঁচ মৌসুমের মতো এবার বসুন্ধরা কিংস সর্বজয়ী রূপ ধারণ করতে পারেনি। বিদেশি যাদের নিয়েছে, তাদের বেশিরভাগের মান ঠিক কিংসের মানের সঙ্গে যায় না। বিশেষ করে নম্বর নাইন পজিশনে ফরাসি স্ট্রাইকার জারেদ খাসা এবং নাইজেরিয়ান ডিফেন্ডার ইশা এজের খেলা মোটেই দৃষ্টি কাড়তে পারেনি। গত তিন মৌসুমে দলের সাফল্যে বড় ভূমিকা রাখা ব্রাজিলিয়ান রবসন রবিনহোকে এবার রাখেনি কিংস। তার বিকল্পেরও খোঁজ মেলেনি। সঙ্গে যোগ হয়েছে চোট ও খেলোয়াড়দের ছুটি জটিলতা। এই দুই কারণে অর্ধেকটা মৌসুম লেফটব্যাক বিশ^নাথ ঘোষ ও সেন্টারব্যাক তারিক কাজীর সার্ভিস পায়নি দল। তাদের জায়গায় খেলার সুযোগ পেয়েও তরুণরা পারেননি নিজেদের প্রমাণ করতে।
এ সবকিছু যোগফলে লিগে কিংস এখন চার নম্বর দল। আর ফেডারেশন কাপে হোঁচট খেতে খেতে কোয়ালিফায়ার্সের সম্ভাবনা টিকিয়ে রেখেছে। তাই ক্লাবটির দুঃসময়ে আগের পাঁচ মৌসুমে সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা পাওয়া ফুটবলারদেরই নিতে হবে দায়িত্ব। তাতে যদি মৌসুম শেষে মানরক্ষা হয়। গোলের ‘অতিরিক্ত’ দায়িত্ব পালন করা তপুও চান তার মতোই অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়ে খেলুক সতীর্থরা।
