সিসি ক্যামেরায় ভিনদেশি!

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৫, ১১:৪৯ এএম

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশ হত্যাকান্ডের ঘটনায় তদন্ত শুরু হয়েছে। স্থাপনাগুলোর ভেতর ও বাইরে থাকা ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে তদন্ত চলছে। ফুটেজে চিহ্নিত হচ্ছে হামলার সঙ্গে কারা সম্পৃক্ত আছেন। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলার সময় প্রায় সব ঘটনায় বহিরাগতরা অংশ নিয়েছিল। কেউ কেউ ভিনদেশি বলে তদন্তে বেরিয়ে আসছে। বিষয়টি আরও গভীরে গিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তাছাড়া হামলার সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গ সংগঠনের কিছু নেতাও রয়েছেন বলে পুলিশের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে।

এদিকে গণঅভ্যুত্থানের সময় নিরীহ শিক্ষার্থী ও জনতাকে হত্যাকা-ের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত ৯৫২ জনের বিরুদ্ধে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে। এর মধ্যে আরও ২১২ জন কর্মকর্তাসহ অন্য সদস্যদের বরখাস্ত ও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে তাদের তালিকা প্রায় চূড়ান্ত করে আনা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রথমে এসব ঘটনায় থানায় মামলা বা জিডি হয়নি। তবে গত দুই মাসের ব্যবধানে হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় তদন্ত করতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পুলিশের সবকটি ইউনিটপ্রধান, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপারদের কাছে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে। থানার ভেতর ও বাইরে থাকা সিসি ক্যামেরার ফুটেজগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে। কিছু ফুটেজে ভিনদেশি কিছু লোকের অস্থিত্ব মিলেছে। আবার আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য মিলেছে। বহিরাগতও আছে অনেক। তারপরও বিষয়টি আমরা আরও গভীরে গিয়ে তদন্ত করছি। আশা করছি, পুলিশের স্থাপনা ও সদস্যদের হত্যাকান্ডের সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত আছে তাদের দ্রুত সময়ে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো নিরপরাধ লোকজন যাতে হয়রানির শিকার না হয় সেদিকে বিশেষ নজর দিতে তদন্তকারী সংস্থাগুলোকে ‘বিশেষ নির্দেশনা’ দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আগে ও পরে পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ব্যাপক। একদল দুর্বৃত্ত থানা ও ফাঁড়িসহ পুলিশের একাধিক স্থানে হামলা চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র লুট করার পাশাপাশি ৪৪ জন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে। এখনো লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা বাকি আছে। মামলার তদন্ত ও আসামিদের বিষয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার বাইরে ও ভেতরে এবং আশপাশে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। কিছু দুর্বৃত্তকে চিহ্নিত করা হয়েছে। হামলার ঘটনার বেশিরভাগ মামলার বাদী পুলিশ নিজেই। ইতিমধ্যে পুলিশের স্থাপনায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশ সদস্যদের হত্যার ঘটনায় সিরাজগঞ্জে আওয়ামী লীগের এক নেতাকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, কোটাবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের স্থাপনায় দফায় দফায় হামলা চালানো হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। ১৬ জুলাইয়ের পর আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। দুর্বৃত্তদের হামলায় ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন সহস্রাধিক পুলিশ সদস্য। তাছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গুলিতে দেড় হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ও নিরীহ লোকজন মারা যান। আহত হন ২২ হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ লোকজন। এখনো সংকটাপন্ন আছেন অনেকে। হামলার সময় থানা, ট্রাফিক অফিস ও বক্সে হামলা চালিয়ে এসি, কম্পিউটার, চেয়ার-টেবিল লুটপাটও করা হয়। বেশিরভাগ স্থাপনায় আগুন ধরিয়ে দেয়। নষ্ট করা হয় গুরুত্বপূর্ণ আলামত। পাশাপাশি লুট করা হয় পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র।

দুর্বৃত্তদের হামলায় সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার ১৩ জন পুলিশ সদস্য মারা যান। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৫০টি থানার মধ্যে ২১টি থানাসহ পুলিশের ২১৬টি স্থাপনায় হামলা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। আগুনে পুড়ে গেছে ১৩টি থানা। পুড়িয়ে দেওয়া হয় পুলিশের বেশ কিছু টহল গাড়িও। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা, ভাটারা, মোহাম্মদপুর, আদাবর, মিরপুর ও উত্তরা পূর্ব থানা।

টাঙ্গাইলের গোড়াই হাইওয়ে থানা, বগুড়ার সদর, দুপচাঁচিয়া ও শেরপুর থানা এবং নারুলী পুলিশ ফাঁড়ি, জয়পুরহাট সদর থানা, কুমিল্লার ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে থানা, রংপুরের গঙ্গাচড়া, মিঠাপুকুর, পীরগাছা, পীরগঞ্জ, বদরগঞ্জ ও গঙ্গাচড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ও আশুগঞ্জ থানা, সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর, উল্লাপাড়া ও শাহজাদপুর থানা, হবিগঞ্জের মাধবপুর ফাঁড়ি, ময়মনসিংহ রেঞ্জ অফিস, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়, দিনাজপুর সদর থানাসহ অসংখ্য স্থাপনায় হামলা ও আগুন দেওয়া হয়েছে। সারা দেশে অন্তত ৫০০ যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পুলিশ সূত্র আরও জানায়, গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশ ছাড়ার পরপরই আত্মগোপনে চলে যান পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা। একপর্যায়ে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে পুরো বাহিনীর। পুলিশ লাইনসে অবস্থান নেন বাহিনীর মাঠপর্যায়ের সদস্যরা। বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশ স্থাপনা ঘিরে হামলা চালানো শুরু করলেও পুলিশ পাল্টা গুলি ছোড়ে। এতে বিভিন্ন থানায় হতাহতের ঘটনা ঘটে।

একপর্যায়ে থানা ও স্থাপনার ফোর্সও আত্মগোপনে চলে যায়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আস্তে আস্তে পুলিশের কমান্ড ফিরে আসে। তবে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যরা চলে যান আত্মগোপনে। তাদের বিষয়েও তদন্ত চলছে। ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন থানা ও আদালতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত ৯৫২ জনের বিরুদ্ধে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মামলা হয়েছে। ইতিমধ্যে পুুলিশের সাবেক আইজিসহ বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি অর্ধশত কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর ও বরখাস্ত করা হয়েছে। তাছাড়া আরও ২১২ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর বা বরখাস্ত করতে একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে।

তালিকাটি পুলিশ সদর দপ্তর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। তালিকাভুক্তদের মধ্যে যাদের চাকরি যাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। অনেকেই কর্মস্থলে অনুপস্থিত আছেন। তাদের ঠিকানায় চিঠি দিয়েও কাজ হচ্ছে না। গত বছরের ১ আগস্ট থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৮৭ জন পুলিশ সদস্য কর্মস্থলে অনুপস্থিত আছেন। তাদের মধ্যে একজন ডিআইজি, সাতজন অতিরিক্ত ডিআইজি, দুজন পুলিশ সুপার, একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, পাঁচজন সহকারী পুলিশ সুপার, পাঁচজন পুলিশ পরিদর্শক, ১৪ জন এসআই ও সার্জেন্ট ১৪ জন, ৯ জন এএসআই, সাতজন নায়েক এবং ১৩৬ জন কনস্টেবল রয়েছেন। তাছাড়া কর্মস্থলে গরহাজির ৪৯ জন, স্বেচ্ছায় ইস্তফা দিয়ে কর্মস্থলে অনুপস্থিত আছেন তিনজন ও অন্যান্য কারণে ৩৯ জন কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন।

এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আরও ২০০-এর বেশি পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যদের বরখাস্ত বা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হচ্ছে। তারা ছাত্র-জনতার আন্দোলনে তা-বলিলা চালাতে সহায়তা করেছেন। আবার কেউ কেউ সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা নানা উপায়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। ইতিমধ্যে শিক্ষার্থী ও নিরীহ লোজনকে হত্যা করার মামলা হয়েছে। ওইসব মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী ও বিভিন্ন পেশার লোকজন আসামি হয়েছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুলিশের স্থাপনা ও পুলিশ সদস্যদের হত্যার ঘটনায় সিসি ক্যামেরার ফুটেজে অনেক কিছু মিলছে। যারা এসবের সঙ্গে জড়িত তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। আমরা যে তথ্য পেয়েছি তাতে মনে হচ্ছে হামলার সঙ্গে ভিনদেশি কেউ কেউ সম্পৃক্ত থাকতে পারে। তাদের ছবিগুলো পুলিশ পর্যালোচনা করছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত