নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশে আপত্তি জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন। তিনি বলেছেন, ‘সুপারিশে অনেক কিছু থাকে, বাস্তবায়ন কঠিন। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের বেশ কিছু প্রস্তাবনা রয়েছে, যা বাস্তবায়ন হলে ইসির স্বাধীনতা খর্ব হবে।’ গত ১৫ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া দেড় শতাধিক নির্বাচন কমিশন সংস্কারের সুপারিশের মধ্যে বেশ কয়েকটি সুপারিশের বিষয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। গতকাল রবিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি (আরএফইডি) টক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে সিইসি এ মন্তব্য করেন।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন এরই মধ্যে তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দিয়েছে। এ প্রতিবেদনে ১৫০টি সুপারিশ রয়েছে। আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার নিয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেওয়ার কথা। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের দেওয়া প্রাথমিক সুপারিশ দৃষ্টিগোচর হয়েছে নির্বাচন কমিশনের। বেশ কয়েকটি সুপারিশ নিয়ে আপত্তি তোলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। এ সময় তিনি বলেন, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন প্রাথমিকভাবে যেসব সুপারিশ আমরা পেয়েছি, তার ওপর আমরা মতামত জানাতে পারি। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পেলে আমরা মতামত জানাব।
সংস্কার কমিশনের দেওয়া সুপারিশে নির্বাচন কমিশনের দায়বদ্ধতা ও শাস্তি অংশের একটি সুপারিশ নিয়ে আপত্তি তোলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। সুপারিশে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনাররা সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে এবং শপথ ভঙ্গ করলে মেয়াদ-পরবর্তী সময়ে উত্থাপিত অভিযোগ প্রস্তাবিত সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে তদন্ত করে সুপারিশসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর বিধান করতে হবে।
এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, পার্লামেন্টের স্থায়ী কমিটির হাতে নির্বাচন কমিশনের কোনো কাজ গেলে ইসির স্বাধীনতা খর্ব হবে। স্থায়ী কমিটির ওপর নির্ভরশীল হতে চাই না। এ সংক্রান্ত সুপারিশ বাতিল করতে হবে।
সংসদীয় আসনের এলাকার সীমানা নির্ধারণ অংশের আরেকটি সুপারিশ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। সীমানা নির্ধারণ সুপারিশে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে সীমানা নির্ধারণে আলাদা স্বাধীন সীমানা নির্ধারণ কর্র্তৃপক্ষ গঠন করা।
এ প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, সীমানা পুনর্নির্ধারণের ক্ষমতা ইসির কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ওনারা সুপারিশ দিয়েছে। আমাদের কাছ থেকে যদি সরিয়ে নেওয়া হয় বা এমন কোনো শর্ত আরোপ করা হয় তাহলে যে অভিযোগগুলো দিয়েছে তাদের আবেদনগুলো বিবেচনার সময় বাধার সৃষ্টি হয়, নতুন করে তাহলে বিশাল একটা সমস্যা দেখা দেবে। তিনি বলেন, সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে উনারা একটা আইন করবেন বলেছেন। ফাইনালি তারা বলেছেন এটা একটা স্বাধীন কর্র্তৃপক্ষ হবে। ইলেকশন কমিশন এমনিতেই স্বাধীন। আমাদের চাইতে স্বাধীনতার মধ্যে আরেকটা স্বাধীন দিলে তো আরেকটা মুশকিল। তখন ডিলিমিটেশন করতে করতে ইলেকশনের ডেটই পার হয়ে যাবে। কারণ এতে ইসির নিয়ন্ত্রণ থাকবে না; উনি তো স্বাধীন কর্র্তৃপক্ষ। সুতরাং টাইমলি কমপ্লিট করা এবং প্রোপারলি কমপ্লিট করা, যেটা কনস্টিটিউশনাল ম্যান্ডেটÑ এটা অন্য কোনো কর্র্তৃপক্ষকে দেওয়াটা আমরা যুক্তিযুক্ত মনে করি না।
ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রম স্বাধীন করার সুপারিশ নিয়েও আপত্তি জানিয়ে নাসির উদ্দিন বলেন, ভোটার এনআইডি কার্ড, ভোটার রেজিস্ট্রেশন যেটা উনারা বলেছেন পরবর্তী পর্যায়ে একটা আবার স্বাধীন অধিদপ্তর/পরিদপ্তরে হ্যান্ডওভার করার জন্য সাজেস্ট করছেন। আমি ভোটার লিস্ট করব, আর অন্য এক কর্র্তৃপক্ষ এটার দায়িত্বে থাকবে! তাহলে আমরা কী নিয়ন্ত্রণ থাকব? তিনি বলেন, ভোটার নিবন্ধন অন্যের কাছে দিয়ে দেওয়া অথবা ডিলিমিটেশন অন্যের কাছে দিয়ে দেওয়া নির্বাচন কমিশনের কনস্টিটিউশনাল ম্যান্ডেটের সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে, এ স্পিরিটের বিরুদ্ধে। আমাদের জন্য এ ধরনের সুপারিশ গ্রহণযোগ্য নয়। পরবর্তীকালে তারা সিদ্ধান্ত নিলে বা সংবিধান সংশোধন হলে সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। বিদ্যমান সংবিধানের অধীনে এটা গ্রহণযোগ্য নয়।
নতুন ইসি গঠনে বিদ্যমান আইন সংস্কার করে ‘সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইনের খসড়া’ প্রস্তাব নিয়েও সমালোচনা করেন সিইসি। তিনি বলেন, কোনো আইন তৈরি করতে গেলে সেখানে দুটি বিষয় আছে। প্রথমত আমার জন্য আইন বানাতে গেলে আমাকে জানাতে হবে। দ্বিতীয় দেশের জনগণকে জানাতে হবে। কারণ আইন বানানোর একটা প্রসিডিউর আছে। এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এভাবে সময় নষ্ট হবে। প্রধান উপদেষ্টা ইতিমধ্যে জানিয়েছেন এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। জুনে আমাদের দেশে বর্ষা থাকে। এ বিষয়টিও আমাদের মাথায় রাখতে হবে।
ইসির জনবল, বাজেট ইত্যাদির দায়িত্বও সংসদীয় কমিটির হাতে দেওয়ার সুপারিশ করেছে সংস্কার কমিশন, যা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন সিইসি। এ বিষয়ে তিনি বলেন, এটা যথাযথ ফোরাম না। এটা ওভারসাইট বডি। অর্থ মন্ত্রণালয়কে বাদ দিয়ে বাজেট করতে পারবেন? পার্লামেন্টের স্ট্যান্ডিং কমিটির ওপর আমরা নির্ভরশীল হতে চাই না; আমাদের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখার জন্য এ জিনিসটা বাদ দিতে হবে। ইসির অধীনে একটা স্বতন্ত্র সচিবালয় রয়েছে। সিইসি ও চারজন কমিশনার যদি সারাদিন ট্রান্সফার, পোস্টিং, প্রমোশন, রিক্রুটমেন্ট এগুলো করতে যান, আসল কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সিইসির এসব আপত্তির বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমরা অংশীজনের সঙ্গে আলাপ করে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা এবং বিবেচনা শক্তি কাজে লাগিয়ে এসব সুপারিশ করেছি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার যেসব বিষয়ে আপত্তি তুলেছেন, তা নিয়ে আমার আর কিছু বলার নেই।
জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহ বলেন, নির্বাচন সংস্কার কমিশনের দেওয়া সুপারিশ নিয়ে নির্বাচন কমিশন যে স্বাধীনভাবে মতামত রাখছে তাকে সাধুবাদ জানাই। নির্বাচন কমিশন একটা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তারা নিজস্ব বিবেচনায় যতটুকু প্রয়োজন মনে করবে গ্রহণ করবে। তারা চাইলে পুরোটা বাতিল করতে পারে।
তিনি বলেন, পূর্ব অভিজ্ঞতা আমাদের ভালো না। ড. এ টি এম শামসুল হুদা কমিশন বিদায় নেওয়ার আগে বেশ কিছু সুপারিশ দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেগুলো কার্যকর হয়নি। ওয়ান ইলেভেনের সময় প্রবল উৎসাহে যে সুপারিশগুলো রাখা হয়েছিল তা গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি। আমার মতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার যে আপত্তি তুলেছেন এটি সঠিক কাজ করেছেন।
নিম্নমানের ইভিএম মেশিন কিনেছে ইসি : ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ক্রয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে নির্বাচন কমিশনে অভিযান পরিচালনা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযানকালে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। গতকাল রবিবার দুদকের উপপরিচালক নুর আলম সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন একটি দল ইসি ভবনে অভিযান চালায়।
অভিযান শেষে দুদক কর্মকর্তা বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন দেড় লাখ ইভিএম মেশিন কিনেছে। এই মেশিনের মধ্যে ১ লাখ ৫০০ মেশিন ব্যবহারের অনুপযোগী বলে আমাদের কাছে অভিযোগ আসে। ওই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সেখানে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানকালে দেখা যায়, ইভিএমগুলো তিন জায়গায় সংরক্ষণ করে রেখেছে ইসি। এর মধ্যে ইসিতে ৬১৮টি, বিএমসটিএফ ৮৬ হাজার এবং ইসির ১০টি আঞ্চলিক অফিসে ৬২ হাজার ইভিএম সংরক্ষণ করা হয়েছে। মেশিনগুলো থেকে কিছু র্যানডমলি যাচাই করা হয়। তখন প্রতি তিনটি মেশিনের মধ্যে একটিতে ত্রুটি পাওয়া যায়। কিছু মেশিনের যান্ত্রিক ত্রুটি ও কিছু অচল পাওয়া যায়।’
দুদক উপপরিচালক আরও বলেন, ‘অভিযানকালে নিম্নমানের মেশিন কেনার ক্ষেত্রে কিছু রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয়েছে। বাকি রেকর্ডগুলো সংরক্ষণ করা হবে। এ-সংক্রান্ত আরও তথ্য যাচাই ও আগামীতে আরও অভিযান পরিচালনা করা হবে। অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে ইসি আমাদের সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। ইভিএম ক্রয়-সংক্রান্ত সব রেকর্ড যাচাই হবে।’
দুদকের তথ্যমতে, নির্বাচনব্যবস্থায় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের লক্ষ্যে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৩ হাজার ৮২৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। নির্বাচন কমিশন একটি প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি ইভিএম ২ লাখ ৩৪ হাজার ৩৭৩ টাকা করে দেড় লাখ ইভিএম সেট কেনে। ২০১৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর একনেক সভায় প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও এখনো তা ইসিকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।
