রাজধানীর শাহবাগ এলাকার সড়কের মাঝখানে মেট্রোরেলের ৫২০ নম্বর পিলার। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় এ পিলারে এক দফাসহ নানা স্লোগান লেখা হয়। কিন্তু লেখাগুলো ঢেকে দিয়ে সাঁটানো হয়েছে জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভেচ্ছাসংবলিত পোস্টার। সেখানে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদেরের ছবিও আছে।
শুধু এ পিলারই নয়, ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতি ও দেয়াললিখন ঢেকে দিয়ে পোস্টার টানাচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবিযুক্ত পোস্টারও সাঁটানো হয়েছে গ্রাফিতির ওপর। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন, নাটক-সিনেমার পোস্টারও রয়েছে। ফলে জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের স্মৃতি মুছে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্মৃতি সংরক্ষণে লক্ষণীয় উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে। সিটি করপোরেশন এসব দেখেও না দেখার ভান করছে।
২০১৬ সালে ধর্ষণের পর হত্যাকান্ডের শিকার হন কুমিল্লার শিক্ষার্থী তনু। তার স্মরণে শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একটি গ্রাফিতি আঁকেন। কিন্তু সেই গ্রাফিতি ঢেকে নিজের সিনেমার পোস্টার লাগিয়ে সমালোচনার জন্ম দেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী। সমালোচনার মুখে ক্ষমা চেয়ে পোস্টার তুলে নেন মেহজাবীন। কিন্তু দলীয় কর্মীদের পোস্টার সাঁটানো থেকে বিরত রাখতে পারছে না রাজনৈতিক দলগুলো।
জানা গেছে, রাজধানী ঢাকাকে সৌন্দর্যমন্ডিত করতে দেয়ালগুলো পোস্টারমুক্ত করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কোটি কোটি টাকা খরচ করে, জেল-জরিমানা করেও পোস্টার সাঁটানো লাগানো বন্ধ করতে পারেনি নগর কর্তৃপক্ষ। উচ্চ আদালতের নির্দেশনাকেও তোয়াক্কা করেনি রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা। আওয়ামী লীগ নেতাদের আত্মপ্রচারের মাধ্যম ছিল রাজধানীর দেয়াল ও পিলারগুলো। বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনাও এ প্রবণতা থেকে রেহাই পায়নি।
গত বছর জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার উত্তাল আন্দোলনের আগে ও পরে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ভবনের দেয়াল, সীমানাপ্রাচীর, সড়কদ্বীপ, মেট্রোরেলের পিলার, উড়ালসড়কের স্তম্ভে গ্রাফিতি এঁকেছে শিক্ষার্থীরা। উত্তরা, বনানী, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, যাত্রাবাড়ী, পুরান ঢাকা, নিউ বেইলি রোড, মিন্টো রোড, সায়েন্স ল্যাবরেটরিসহ পুরো ঢাকায় দেয়াললিখন ও গ্রাফিতি আঁকে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। তারা নিজেরাই অর্থ জোগাড় করে রঙ ও আঁকার সরঞ্জাম কিনে এ কাজ করেছে।
এতে পোস্টার, ফেস্টুনের জঞ্জালের শহর ঢাকা ভিন্ন রূপ পায়। ঢাকার দেয়ালগুলো গ্রাফিতি, দেয়াললিখন আর ক্যালিগ্রাফিতে রঙিন রূপ পায়। গ্রাফিতি ও দেয়াললিখনে স্থান পেয়েছে ফ্যাসিবাদ, দুর্নীতি, রাষ্ট্র সংস্কারসহ বিভিন্ন উক্তি ও স্লোগান। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস একাধিকবার ছাত্রদের আঁকা দেয়াললিখন ও গ্রাফিতির প্রশংসা করেছেন। উপদেষ্টাদের নিয়ে পরিদর্শনও করেছেন। তবে এখন রাজনৈতিক নেতাদের আত্মপ্রচারের বলি হচ্ছে গ্রাফিতি আর দেয়াললিখন। গ্রাফিতি ঢেকে ব্যবসায়িক বিজ্ঞাপনও দেখা গেছে। শাহবাগ থেকে টিএসসি পর্যন্ত মেট্রোরেলের প্রতিটি পিলারে এখন ওয়াজ মাহফিল থেকে শুরু করে প্রয়াত রাজনৈতিক নেতারদের পোস্টার শোভা পাচ্ছে।
মৌচাক মোড়ে ফ্লাইওভারের পিলারে জুলাই বিপ্লবে শহীদ হওয়া মুগ্ধর ‘পানি লাগবে পানি’র একটি গ্রাফিতি ছিল। এর পাশে ‘আমি তুমি আমরা’ নামে গ্রাফিতি আঁকা আছে। কিন্তু এ দুটি গ্রাফিতির অনেকটা ঢেকে গেছে রাজনৈতিক পোস্টারে। মৌচাক মোড় থেকে মালিবাগের মেট্রোরেল দ্বিতীয় নম্বর পিলারের একটা গ্রাফিতি ঢেকে দিয়েছে কোচিং সেন্টারের ব্যানার। এর পরের পিলারে ‘দেশকে ভালোবেসে আগলে রাখুন’ নামের গ্রাফিতির ওপর পোস্টার সাঁটানো হয়েছে। আরেক পাশে ‘পানির অপর নাম মুগ্ধ’ লেখার ওপর কোচিং সেন্টারের পোস্টার রয়েছে। হানিফ ফ্লাইওভারের পিলারের গ্রাফিতির ওপর এবং দেয়ালে দেয়ালে লাগানো হচ্ছে পোস্টার।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি আমাদেরও নজরে এসেছে। আমরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে মুছে দেওয়া দেয়াললিখন অনেক জায়গায় পুনর্লিখন করেছি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই জুলাইয়ের এই স্মৃতি সংরক্ষণে সরকার উদ্যোগ নেবে। প্রয়োজনে সরকার নির্দেশনা জারি করতে পারে, যাতে কেউ গ্রাফিতি বা দেয়াললিখন মুছলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ থাকবে। জুলাইয়ের স্মৃতি সংরক্ষণে নাগরিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে।’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘গ্রাফিতিগুলো ইতিহাসের বড় অংশ। এগুলো সংরক্ষণের জন্য নীতিমালা দরকার। কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে সরকারকে তা নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। কোন কোন স্থান ও দেয়াল সংরক্ষিত থাকবে, যেখানে সরকারের অনুমোদন ছাড়া কেউ কিছু করতে পারবে না।’
তিনি বলেন, ‘গ্রাফিতি ও দেয়াললিখনে এলাকাভিত্তিক কমিউনিটিকে যুক্ত করা উচিত। তারাও নির্ধারণ করতে পারে ওই এলাকার কোন স্থানে কী ধরনের গ্রাফিতি বা দেয়াললিখন থাকবে। সচেতনতামূলক নতুন গ্রাফিতি হতেও পারে। শুধু ঢাকাতে নয়, সারা দেশেই হতে পারে। জাতিগঠনে দেয়াললিখন ও গ্রাফিতি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। যত্রতত্র পোস্টার সাঁটানোর বিষয়ে সরকারের কঠোর হওয়ার সুযোগ আছে।’
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ফিদা হাসান বলেন, ‘আমরা নিয়মিত অবৈধ বিজ্ঞাপন মোছার কাজ করে থাকি। প্রতিদিন ভোরে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মাধ্যমে এ কাজ করা হয়। কিন্তু একদিন পরিষ্কার করলে পরদিন আবার টানিয়ে দেওয়া হয়।’
তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আঁকা সুন্দর সুন্দর গ্রাফিতিগুলো বিভিন্ন কোচিংসহ নানা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন সাঁটিয়ে নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে। এজন্য শুধু অপসারণ নয়, শাস্তিরও প্রয়োজন রয়েছে। শাস্তির মুখোমুখি হলে কেউ আর দেয়াল নোংরা করার সাহস পাবে না।’
রাজধানীতে সব পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন অপসারণ করতে নেতাকর্মীদের কড়া নির্দেশনা দিয়েছে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি। সম্প্রতি গণমাধ্যমে পাঠানো আলাদা আলাদা বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
সম্প্রতি এক বিজ্ঞপ্তিতে দেয়াললিখন ও গ্রাফিতি সুরক্ষিত রাখতে সবার সহযোগিতা চেয়েছে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কোনো কারণে দেয়াললিখন ও গ্রাফিতি নষ্ট হয়ে গেলে বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব উদ্যোগে তা সংস্কারের ব্যবস্থা করবে।
