শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে প্রায় আট বছর আগে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা রাজধানীর সাতটি বড় সরকারি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্ত করা হয়। এরপর থেকে কলেজগুলোর অ্যাকাডেমিক বিষয়গুলো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিচালিত হচ্ছে। তবে ফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা, ত্রুটিযুক্ত ফল প্রকাশ, সিলেবাসবহির্ভূত প্রশ্নপদ্ধতি, গণহারে ফেলসহ নানাবিধ সমস্যায় হাবুডুবু খেতে হয় প্রায় তিন লাখ শিক্ষার্থীকে। অপরিকল্পিতভাবে কোনোরকম পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই অধিভুক্ত হওয়ায় সুফলের বদলে বরং ভোগান্তিতেই বেশি পড়তে হয় তাদের। এসব সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানের দাবিতে বারবার রাস্তায় নেমেছেন সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। সর্বশেষ গত বছর থেকে সাত কলেজ নিয়ে একটি স্বায়ত্তশাসিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন তারা। অন্যদিকে ঢাবির শিক্ষার্থীরাও অধিভুক্তিকে ভুল সিদ্ধান্ত উল্লেখ করে দীর্ঘদিন ধরে তা বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
ওই সাত কলেজ হলো ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজ।
সর্বশেষ গত রবিবার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ঢাবির উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) মামুন আহমেদের সঙ্গে বাহাসের পর ওইদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় অবরোধ করেন সাত সরকারি কলেজের একদল শিক্ষার্থী। পরে রাত ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত রাজধানীর নীলক্ষেত-নিউ মার্কেট এলাকায় তাদের সঙ্গে ঢাবির শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে আহত হন অনেক শিক্ষার্থী। সেই প্রেক্ষাপটে গতকাল সোমবার জরুরি সভা ডাকে ঢাবি প্রশাসন। ঢাবি উপাচার্যের সভাপতিত্বে সাত কলেজের অধ্যক্ষদের সঙ্গে সভা থেকে অধিভুক্ত কলেজগুলোর সম্মানজনক পৃথকীকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ সিদ্ধান্তে ঢাবি এবং সাত কলেজ উভয়পক্ষ সন্তুষ্টির কথা জানালেও নানা জটিলতা ও অনিশ্চয়তায় পড়েছেন সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। তাদের পরবর্তী কার্যক্রম কীভাবে পরিচালনা হবে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে আর অধিভুক্ত থাকবে না এই সাত কলেজ, ঢাবির অধীনে কোনো ভর্তি পরীক্ষাও নেওয়া হবে না। তাহলে এসব কলেজের ভর্তি পরীক্ষা কীভাবে হবে, কার অধীনে হবে তা নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা। শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী, গত বছর ২৯ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য সভায় সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী আসন সংখ্যা ও ভর্তি ফি নির্ধারণসহ যাবতীয় বিষয়ে মন্ত্রণালয় গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। আরেকটি বিষয় সামনে আসছে, তা হলো আবারও সাত কলেজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যাচ্ছে কি না। তবে কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরা বলছেন, কোনোভাবেই আগের মতো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তারা যাবেন না। দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপরেখা প্রকাশেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে ফল দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয় ৭-৯ মাসে। নেই নির্দিষ্ট কোনো অ্যাকাডেমিক প্ল্যান। ক্লাস নেন এক শিক্ষক, প্রশ্ন করেন আরেকজন, খাতা দেখেন অন্যজন। যার ফল গণহারে ফেল। এ ছাড়া একজন সমন্বয়ক হওয়ায় সুবিধা-অসুবিধাগুলো জানাতে পারেন না শিক্ষার্থীরা। কোনো একটি সমস্যা হলেই দৌড়াতে হয় ঢাবিতে। সমাধানে চলে যায় মাসের পর মাস। শিক্ষক সংকটের কারণে নিয়মিত ক্লাস হয় না। অন্যদিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও অনেক বেশি। প্রতিটি বিভাগে শিক্ষক অনুপাতে শিক্ষার্থীর আদর্শমানের ধারেকাছেও নেই সাত কলেজ। সে কারণে তারাও অধিভুক্তি বাতিল এবং সাত কলেজকে নিয়ে আলাদা কাঠামো তৈরির দাবি জানিয়েছিলেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঢাকা কলেজ শাখার সদস্য সচিব সজীব উদ্দীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অধিভুক্তি বাতিল হয়েছে তাতে আমাদের সমস্যা নেই। এটা পুরোপুরি সমাধান করতে হবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে আলাদা কাঠামো তথা সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে। একই সঙ্গে যারা বর্তমানে অধ্যয়নরত, তাদের কোনোভাবে ক্ষতি করা যাবে না। সার্টিফিকেটসহ সবকিছু সাত কলেজ নিয়ে করা কমিটির কাছে হ্যান্ডওভার (হস্তান্তর) করতে হবে। পরিপূর্ণভাবে আমরা আলাদা হতে চাই।’
আরেক শিক্ষার্থী রাকিব হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অধিভুক্তি বাতিলের এ ঘোষণা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। অধিভুক্তি সাত কলেজের অতিরিক্ত শিক্ষার্থী চাপ ও সমস্যাগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাত কলেজ উভয়ের জন্যই ছিল মাথাব্যথার কারণ। তবে অধিভুক্তি বাতিল হলেও আমরা চাই টেকসই সমাধান। সাত কলেজ নিয়ে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় গঠন করে গ্রহণযোগ্য ভর্তি ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যাওয়া অমূলক সিদ্ধান্ত হবে।’
ঢাবি কর্তৃপক্ষ নতুন করে ভর্তি না নিলেও যেসব শিক্ষার্থী বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান শিক্ষা কার্যক্রমের অধীনে রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে প্রশাসন দায়িত্বশীল থাকবে, যাতে তাদের শিক্ষাজীবন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যারা বর্তমান শিক্ষার্থী আছে তাদের বিষয়ে আমরা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করব। তাদের কোনো ক্ষতি হতে আমরা দেব না। তবে ২০২৪-২৫ থেকে নতুন করে আর কোনো শিক্ষার্থীর দায়িত্ব আমরা নেব না। এখন থেকে সাত কলেজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সরকার।’
ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস বলেন, ‘যেহেতু সরকার একটি উচ্চ মানসম্পন্ন কমিটি করেছে, সেখানে আমরা সাত কলেজের প্রিন্সিপাল ও বিভাগীয় প্রধানরা আমন্ত্রিত হয়ে অবস্থাটা ব্যাখ্যা করেছি। শিক্ষার্থীদের যে চাওয়া, সেটির সঙ্গে এটা কতটা সংগতিপূর্ণ তাদের কাছে তুলে ধরেছি। সে প্রেক্ষাপটে তারা অবশ্যই সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নেবেন।’
নতুন কাঠামোর বিষয়ে কমিটি কাজ করবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কমিটি শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলা শেষে দেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত দেবে। সমস্যাটি কী হয়েছে এবং সেটির সমাধান কী হবে, আমরা সেটি লিখিত দিয়েছি।’ ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ বলেন, ‘বৈঠকে প্রথম সিদ্ধান্ত হয়েছে, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ, যেটি শুরু হওয়ার কথা, সেটি আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হচ্ছে না। আমাদের কতগুলো পরীক্ষা চলমান। এই পরীক্ষাগুলো আমরা শেষ করতে চাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এতে সহযোগিতা করতে সম্মত। এবার শিক্ষার্থীরা যদি সম্মত থাকে তাহলে যে পরীক্ষাগুলোর তারিখ পরিবর্তন হয়েছে, সেটি নতুন করে দিতে বলেছি।’
ঢাবির সঙ্গে সাত কলেজকে অধিভুক্ত করা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং ভুল সিদ্ধান্ত ছিল বলে মনে করেন অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি এটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। কী কারণে নেওয়া হলো এটা আমার বোধগম্য নয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়েছিল এসব কলেজ দেখাশোনা করার জন্য, তারা সেভাবে অভ্যস্তও হয়েছিল। হঠাৎ করে কেন বিভাজন করা হলো এটা আমার মাথায় আসে না। এই যে আমাদের কোনো বিবেচনা ছাড়া, চিন্তা ছাড়া পরিকল্পনা করি তারই ফল হচ্ছে আজকের এই অবস্থা।’
ঢাবির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তানজিম উদ্দিন খান বলেন, ‘যে প্রক্রিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাত কলেজের দায়িত্ব নিয়েছিল, সেটিই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কোন যুক্তিতে এ কলেজগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হলো সেটা জানা নেই। মূলত এটা ঢাবির জন্য বোঝা ছিল। পরবর্তী সিদ্ধান্ত বিশেষজ্ঞ কমিটি এবং সরকার নেবে।’
এদিকে ঢাবি ও সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঘটে যাওয়া সংঘর্ষের ঘটনা অনাকাক্সিক্ষত বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল। গতকাল সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এমন মন্তব্য করেন তিনি। আসিফ নজরুল বলেন, ‘এগুলো তো (সংঘর্ষের ঘটনা) অনাকাক্সিক্ষত। এগুলো এড়িয়ে চলতে আরও বেশি উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করব। যা করলে এটা সমাধান হবে, সেটা করার চেষ্টা করব।’
ঢাবির অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজের সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান হবে জানিয়ে শিক্ষার্থীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। গতকাল সচিবালয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে কোর কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হয়ে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সবারই একটু ধৈর্য ধরতে হবে। যদি আমরা অধৈর্য হয়ে যাই, কোনো কিছুরই সমাধান হবে না। সবাইকে ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও বলেছি।’
