ব্রিটিশ কোচ পিটার জেমস বাটলারের অধীনে অনুশীলন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সাফজয়ী বাংলাদেশ জাতীয় দলের অধিকাংশ ফুটবলার। এরপর থেকেই বাফুফে কর্তাদের রোষানলে প্রতিবাদী মেয়েরা। নানাভাবে পেতে হচ্ছে হুমকি-ধমকি। নিষেধাজ্ঞার হুমকিও শুনতে হচ্ছে তাকে। তাই ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে প্রায় ১৮ জন মেয়ে একযোগে অবসরের চিন্তা করতে শুরু করেছেন। বুধবার বেশ কয়েকজন ফুটবলারের সঙ্গে কথা বলে এমনটা জানা গেছে।
গত অক্টোবরে সাফ জয়ের পর দীর্ঘ ঘুমে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন নারী ফুটবলাররা। ১৫ জানুয়ারি তাদের ক্যাম্পে ফেরায় বাফুফে। ফেব্রুয়ারি-মার্চে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে দুই ম্যাচের প্রস্তুতিও শুরু করেছিলেন সহযোগী কোচদের অধীনে। তবে যত বিপত্তি বাধে ব্রিটিশ কোচ পিটার জেমস বাটলার যোগ দেওয়ায়। এই কোচকে যাতে দায়িত্বে না রাখা হয়, সেই দাবিটা সাফ জিতেই জানিয়েছিলেন ফুটবলাররা। অথচ এই বাটলারের চুক্তি আরও দুই বছর নবায়ন করেছে বাফুফে। এতদিন এ নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি ফুটবলাররা। তবে বাটলার যখন মেয়েদের সঙ্গে সভা করতে চাইলেন, তখনই বেঁকে বসেন মেয়েরা। কোচের ডাকা সেই সভায় যোগ দেননি কোনো ফুটবলার। নেপালে অনুষ্ঠিত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের আগে পরে ঘটা নানা ঘটনার জেরেই মেয়েরা সিদ্ধান্ত নেন, বাটলারের অধীনে তারা ট্রেনিং করবেন না। দলের এক সিনিয়র ফুটবলার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা বাটলারকে বয়কট করেছি, তবে ট্রেনিং না। অন্য কোচের অধীনে ট্রেনিং করতে আমাদের সমস্যা নেই।’
মেয়েদের আপত্তিতে মঙ্গলবার বাটলারের সভা বানচাল হওয়ার পর থেকে ক্রমাগত মানসিক চাপের মুখে রাখা হয়েছে ক্যাম্পে থাকা ফুটবলারদের। অভিযোগ আছে, বাফুফের একজন সহ-সভাপতি এবং একজন নির্বাহী সদস্য ক্রমাগত তাদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে কারণ দর্শানো নোটিস দেওয়া এমনকি নিষিদ্ধ করার কথাও বলা হয়েছে ১৮ ফুটবলারকে। সে সব শুনে হতাশা জেঁকে বসেছে মেয়েদের ক্যাম্পে। বঞ্চনার শিকার হয়ে একযোগে অবসরে যাওয়ার কথাও হচ্ছে নিজেদের মধ্যে। এক ফুটবলার বলেন, ‘আমাদের চাওয়া-পাওয়ার কোনো মূল্য নেই বাফুফের কাছে। কোচকে নতুন করে দায়িত্ব দেওয়ার আগে আমাদের সঙ্গে বসার প্রয়োজন মনে করেনি বাফুফে। উল্টো আমাদের হুমকি-ধমকিও দেওয়া হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে একযোগে অবসর নেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প দেখছি না। এমন একজনের অধীনে খেলা আমাদের পক্ষে সম্ভব না।’
এমন কিছুর শঙ্কা ছিল আগে থেকেই। সাফ জিতে আসার পরেই দলের বেশিরভাগ মেয়ে বাটলারকে বিদায় করার দাবি তুলেছিলেন। সরাসরি না বললেও তাদের অবস্থান বাফুফের কর্তাদের কাছে জানিয়ে দিয়েছিলেন। তবে মেয়েদের কথায় কর্ণপাত করেনি বাফুফে। উল্টো বাটলারের হাতে নারী দলকে আরও দুই বছরের জন্য তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই বাধ্য হয়েই বাটলার বয়কটের পথে হেঁটেছেন ফুটবলাররা।
অক্টোবরে সাফের আগে থেকেই মেয়েদের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল কোচের। বিশেষ করে দলের সিনিয়র ফুটবলারদের চক্ষুশূল বানিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। সিনিয়রদের বাদের খাতায় ফেলার ফন্দি এঁটেছিলেন তিনি। তারুণ্য নির্ভর দল নিয়ে চেয়েছিলেন সাফের সাফল্য ধরে রাখতে। সেই ভাবনা থেকে সাফে গ্রুপের প্রথম ম্যাচে বাটলার বেঞ্চে বসিয়ে রাখেন মারিয়া মান্ডা, মাসুরা পারভীন, কৃষ্ণারানী সরকার, সানজিদা আক্তারের মতো পরীক্ষিত পারফরমারদের। দুর্বল পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই ম্যাচে কোনোমতে হার এড়িয়েছিল বাংলাদেশ। সেই ম্যাচে শুরুর একাদশে খেলা মনিকা চাকমা ম্যাচ শেষে কোচের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে সংবাদ মাধ্যমে সরব হয়েছিলেন। বলেছিলেন সাফ জিততে হলে সিনিয়রদের খেলাতে হবে। নইলে শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখা সম্ভব নয়।
এরপর থেকেই প্রকাশ্যে আসে কোচের সঙ্গে খেলোয়াড়দের সংঘাতের বিষয়টি। ফুটবলাররা সরব হন, ভারতের বিপক্ষে বাঁচামরার লড়াইয়ে কোনো অবস্থাতেই কোচকে তারা কোনো পরীক্ষা করতে দেবেন না। শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড়দের জোর দাবির মুখে ভারতের বিপক্ষে সিনিয়রদের নিয়ে একাদশ সাজান বাটলার। তবে মেয়েদের মানসিক চাপে রাখেন প্রতিনিয়ত। ফুটবলারদের অবসর সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটানো নিয়ে, তাদের পোশাক নিয়েও নানা সময় কটু কথা বলেছেন। পাশাপাশি সিনিয়রদের দিয়ে কিসসু হবে না এমন কথাও বলেছেন। তবে মেয়েরা বিষয়টি নেন চ্যালেঞ্জ হিসেবে। অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে তারা নিজেদের শতভাগ উজাড় করে দেন মাঠে। ভারতকে হারিয়ে তারা হন গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন। পরে সেমিফাইনালে ভুটানকে উড়িয়ে দেওয়ার পর ফাইনালে স্বাগতিক নেপালকে আরেকবার হতাশা উপহার দিয়ে জিতে নেয় সাফ শিরোপা। দেশে ফিরে মেয়েরা স্পষ্ট বলেছেন, এই সাফল্যে কোচের কোনোই অবদান নেই।
কেবল কোচের ইস্যু নয়, মেয়েদের সঙ্গে গেল অক্টোবরের পর আর কেন্দ্রীয় চুক্তি করেনি বাফুফে। ফলে মেলেনি মাসিক বেতন। তাছাড়া গত আট ম্যাচ ধরে ম্যাচ ফির টাকাটাও পাননি ফুটবলাররা। বাফুফে ঘোষিত দেড় কোটি টাকা বোনাস পাওয়ারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। সব মিলিয়ে কঠিন অবস্থানে যাওয়া ছাড়া গতিও নেই তাদের। সব ইস্যু নিয়ে মেয়েরা চান সরাসরি বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়ালের সঙ্গে বসতে। বাফুফে বস অবশ্য এখন রয়েছেন দেশের বাইরে।
নারী কমিটির প্রধান মাহফুজা আক্তার অবশ্য আলোচনার ভিত্তিতে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টার কথা বলেছেন।
