ফেব্রুয়ারিতে সবগুলো সংস্কার কমিশন চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেবে। সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা হবে। এরপর সেই আলোকে নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ হবে। গতকাল বুধবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
শফিকুল আলম বলেন, ‘কম সংস্কার হলে এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন হবে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি আরও সংস্কার চায়, তাহলে সে ক্ষেত্রে ছয় মাস বেশি লাগবে। অর্থাৎ ২০২৬ সালের জুন নাগাদ হতে পারে। সময়মতোই নির্বাচনের তারিখ জানিয়ে দেওয়া হবে। তবে তার আগে সংস্কার নিয়ে কাজ করছে সরকার।’
এক প্রশ্নের জবাবে শফিকুল আলম বলেন, ‘এ সরকারের আমলে রপ্তানি বেড়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম বেড়েছে। পৃথিবীর চারটি বড় কোম্পানি চট্টগ্রামসহ অন্যান্য বন্দর ব্যবস্থাপনা করতে চায়। দেশের রপ্তানি বাড়ার কারণেই ওরা আগ্রহ প্রকাশ করেছে।’
এ সময় তিনি নিশ্চিন্ত থাকতে বলে উল্লেখ করেন, ‘ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট অনেক আসবে। আগের সরকার ইপিজেড করার নামে জমি দখল করেছিল। তাই কেউ বিনিয়োগ করতে চায় না। কোরিয়ান ইপিজেডের সমস্যা বিগত সরকার সমাধান করেনি। আমরা দ্রুতই সেই সমস্যার সমাধান করব। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বেই। এটা এ সরকারের কমিটমেন্ট।’
বিচার ও ক্ষমা চাওয়ার আগে আওয়ামী লীগের কর্মসূচি করতে দেওয়া হবে না : ব্রিফিংয়ে আওয়ামী লীগের ফেসবুক পেজে ঘোষিত হরতালসহ বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণার বিষয়টি দৃষ্টি আকর্ষণ করে সরকারের অবস্থান জানতে চান এক সাংবাদিক।
জবাবে প্রেস সচিব বলেন, সরকারের অবস্থান খুবই স্পষ্ট। আওয়ামী লীগের টপ লিডারশিপ জুলাই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) রিপোর্টের ১৭তম পাতায় আছে, শেখ হাসিনা নিজেই ডাইরেক্টলি (সরাসরি) অর্ডার (নির্দেশ) দিয়েছেন গুম ও কিলিংয়ের (হত্যার)। তারা (এইচআরডব্লিউ) অফিসারদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং অফিসাররা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানিয়েছেন।
‘এত বড় একটা হত্যাকাণ্ড হলো বাংলাদেশের ইতিহাসে। আপনার আমার চোখের সামনে বাচ্চা-বাচ্চা ছেলেমেয়েদের খুন করা হলো। শত শত ছেলে অন্ধ হয়ে গেছে। অনেকে সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছে। কিন্তু তাদের (আওয়ামী লীগ) মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই। উল্টো তারা (আওয়ামী লীগ) আবার বলছে, তিন হাজার পুলিশ মারা গেছে। কত বড় জালিয়াতি, মিথ্যা কথা,’ যোগ করেন তিনি।
শফিকুল আলম আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে যত দিন না তারা ক্ষমা চাচ্ছে, যত দিন না তাদের লিডারশিপকে ট্রায়ালের (বিচারের) মধ্যে আনা হচ্ছে, যত দিন না তারা সাবমিটেড টু জাস্টিস, যত দিন না তারা অ্যাকাউন্টেবিলিটির মধ্যে আসছে। তত দিন তাদের প্রটেস্ট করতে দেওয়া হবে না। তাদের আগে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে। এটা আমাদের স্পষ্ট অবস্থান।’
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ জুলাই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। অথচ তাদের মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই। যত দিন তাদের বিচার না হবে, তত দিন পর্যন্ত তাদের কোনো কর্মকাণ্ড চালাতে দেওয়া হবে না।
আওয়ামী লীগের অনেকেই হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, তাদের কর্মসূচি পালন করার বিষয়ে একজন সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে ব্যাপক হত্যাকা- চালানো হয়েছে। ৭১ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। গুলি চালানো হয়েছে হেলিকপ্টার থেকে। কিন্তু তারা তো (আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী) কেউ তাদের দলের কর্মকা-ের বিরোধিতা করা বা অনুতপ্ত হয়নি। তাদের অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাইতে হবে। দোষীদের বিচার করা হবে। এরপর ক্লিন ইমেজের যারা আছেন তারা যদি আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দেন, তখন তারা কর্মসূচি পালন করতে পারবেন।
সাজাপ্রাপ্ত সাংবাদিকের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল হবে : প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেন, ‘সাংবাদিকদের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডের বিষয়ে একটি নীতিমালা তৈরি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগে পত্রিকার প্রচার সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে কার্ড দেওয়া হতো। কিন্তু এখন একটা পত্রিকায় কতজন সাংবাদিক রয়েছেন, তার ওপর ভিত্তি করে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ কার্ড দেওয়ার সুপারিশ আমরা করব। আশা করি শিগগিরই নীতিমালাটি চূড়ান্ত হবে। এর আগ পর্যন্ত বিদ্যমান কার্ড চালু থাকবে।’
এ সময় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হওয়া বিভিন্ন মামলার বিষয়েও প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘সরকার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করেনি, করেছে বিভিন্ন ভিকটিমের পরিবার। এ ক্ষেত্রে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের প্রতিবেদনে ভুল তথ্য দিয়েছে। আমরা তাদের বলব ভুল সংশোধন করতে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা হচ্ছে এবং অন্যায়ভাবে কাউকে হয়রানি করা হচ্ছে না।’
ব্রিফিংয়ে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার তিলকপুর উচ্চবিদ্যালয়ে মেয়েদের ফুটবল খেলার মাঠে হামলার বিষয়ে উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম বলেন, মেয়েদের ফুটবলে বাধার বিষয়ে সরকার কাজ করছে। স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। নারীদের ফুটবল কোনোভাবেই যেন ব্যাহত না হয়, সরকার সে বিষয়ে সজাগ থাকবে।
আওয়ামী লীগ নিয়ে প্রেস সচিবের ফেসবুক পোস্ট : আওয়ামী লীগের পতাকাতলে কেউ যদি ‘অবৈধ বিক্ষোভ’ করার সাহস করে, তবে তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে বলে গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে উল্লেখ করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
আওয়ামী লীগ মঙ্গলবার রাতে দলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজের মাধ্যমে ফেব্রুয়ারি মাসে প্রচারপত্র বিলি, অবরোধ ও হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করে।
সেই পরিপ্রেক্ষিতে প্রেস সচিব আরও লিখেছেন, ‘আগস্টে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অন্তর্র্বর্তী সরকার কোনো ন্যায্য বিক্ষোভ বন্ধ বা নিষিদ্ধ করেনি। আমরা সমাবেশ করার স্বাধীনতা এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। আজ (গতকাল বুধবার) সকালে গণমাধ্যমের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাড়ে পাঁচ মাসে শুধু ঢাকায় কমপক্ষে ১৩৬টি বিক্ষোভ হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি বিক্ষোভের ফলে ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হয়েছে। তবু সরকার কখনো বিক্ষোভ-সমাবেশের ওপর কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করেনি।’
সরকারের কি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে বিক্ষোভ করার সুযোগ দেওয়া উচিতÑ এ প্রশ্ন তুলে শফিকুল আলম লিখেছেন, ‘জুলাই-আগস্টের ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যায় যে আওয়ামী লীগকর্মীরা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যায় অংশ নিয়েছিল।’
‘মঙ্গলবার কয়েকজন মানবাধিকারকর্মীর সাক্ষাৎকারের বরাতে নিউ ইয়র্কভত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, শেখ হাসিনা তার ১৬ বছরের একনায়কত্বের শাসনামলে সরাসরি হত্যা ও জোরপূর্বক গুমের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি একটি চোরতন্ত্র (ক্লেপ্টোক্রেসি) এবং খুনি শাসনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। নিরপেক্ষ ও স্বাধীন একটি প্যানেল বলছে, শেখ হাসিনার তত্ত্বাবধানে তার ঘনিষ্ঠরা ২৩৪ বিলিয়ন (২৩ হাজার ৪০০ কোটি) ডলার পাচার করেছে। দুর্নীতিগ্রস্ত চুক্তি থেকে কোটি কোটি ডলার চুরির দায়ে হাসিনার পরিবারের বিরুদ্ধে এখন তদন্ত চলছে,’ যোগ করেন প্রেস সচিব।
