জীবনে ব্যর্থতার কারণ

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:০৩ এএম

সময় অমূল্য সম্পদ। সময়ের সঠিক ব্যবহার করেই জীবনে সফল হওয়া সম্ভব। আমাদের পূর্ববর্তী মনীষীরা সময়ের সঠিক মূল্যায়ন করেছেন। সময়োপযোগী নানা কাজের মাধ্যমে আমাদের সমৃদ্ধ করে গেছেন। ফলে তারা ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন। সময় মহান আল্লাহর অফুরান নেয়ামতের মধ্যে অন্যতম। তারা এই নেয়ামতের সঠিক ব্যবহার করেছিলেন। এখন আমাদের জীবন গড়ার সময়। তাই সময়ের মূল্যায়নে আমাদের সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অযথা সময় নষ্ট করা যাবে না। অন্যথায় আমাদের জীবনে নেমে আসবে ব্যর্থতা, যা দুনিয়ার জীবনের জন্য ক্ষতি বয়ে আনবে। খারাপ প্রভাব ফেলবে পরকালের জীবনেও।

আমরা অফুরান সময় নিয়ে পৃথিবীতে আসিনি। আমাদের সময় খুবই স্বল্প। আর এই স্বল্প সময়ের সঠিক ব্যবহার কাম্য। আমাদের খুব সচেতনভাবে খেয়াল রাখতে হবে, এই সময় থেকে এক ঘণ্টা বা এক মিনিট চলে যাওয়া মানে প্রকৃতপক্ষে জীবনের একটা মূল্যবান অংশ কমে যাওয়া। এ কারণে সময়ের যথাযথ ব্যবহার অপরিহার্য। আর মানুষ তার দুনিয়ার জীবন কীভাবে অতিবাহিত করেছে আখেরাতে সেই হিসাবও দিতে হবে।

সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোনো এক ব্যক্তিকে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপদেশ দেওয়ার সময় বললেন, তুমি পাঁচটি বিষয়ের আগে পাঁচটি বিষয়কে গুরুত্ব দাও। এক. বার্ধক্য আসার আগে যৌবনকে গুরুত্ব দাও। দুই. অসুস্থতার আগে সুস্থতাকে গুরুত্ব দাও। তিন. দারিদ্র্য আসার আগে সচ্ছলতাকে গুরুত্ব দাও। চার. ব্যস্ততার আগে অবসর সময়ের প্রতি গুরুত্বারোপ করো। পাঁচ. মৃত্যু আসার আগে জীবনের গুরুত্ব দাও।’ (মুসতাদরাকে হাকেম)

মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে অনেকবার সময়ের শপথ করেছেন। একজন মুসলমান যাতে সময়ের মূল্য যথাযথভাবে বুঝতে পারে এ জন্য কোরআনে একটি সুরা নাজিল করা হয়েছে ‘আসর’ বা সময় নামে। ওই সুরার শুরুতে মহান আল্লাহ সময়ের কসম খেয়েছেন। এর দ্বারা সময়ের গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়।

ইসলামের অধিকাংশ ইবাদত-বন্দেগির ক্ষেত্রে সময়ের গুরুত্ব বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কেননা ইসলামের সব ইবাদতই সময়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত শুরু ও শেষ হিসেবে। ইবাদত সহিহ-শুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য সময়কে নির্ধারিত করে দেওয়া হয়েছে। ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য সময়ানুবর্তিতাকে শর্ত দিয়ে সময়ের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘অতঃপর যখন তোমরা নামাজ সম্পন্ন করো, তখন দণ্ডায়মান, উপবিষ্ট ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করো। অতঃপর যখন বিপদমুক্ত হয়ে যাও, তখন নামাজ ঠিক করে পড়ো। নিশ্চয় নামাজ মুসলমানদের ওপর ফরজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে।’ (সুরা নিসা, আয়াত ১০৩)

নামাজ দ্বীনের খুঁটি। রাত-দিনকে বিভিন্ন অংশে ভাগ করে এর ওয়াক্ত নির্ধারিত সময় ও নির্দিষ্ট আলামতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। ইসলামের অন্যান্য রোকন যেমন রোজার রয়েছে বাৎসরিক নির্ধারিত সময়। জাকাতের হিসাবের জন্য নির্ধারিত সময় ধর্তব্য, হজের বিষয়েও একই কথা। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কিংবা সময় হিসাব করেই ইবাদত-বন্দেগি পালন করার হুকুমের মধ্য দিয়ে মহান আল্লাহ সময়ের গুরুত্ব শিখিয়েছেন।

মানুষ হিসেবে আমাদের মধ্যে কমবেশি সময় নষ্ট করার প্রবণতা রয়েছে। আমরা অনেকেই সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার ও সুযোগকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হচ্ছি। দিনরাত সব মানুষের ক্ষেত্রে সমান। পার্থক্য শুধু এখানে, কারও সময়ের মধ্যে বরকত আছে। কারও সময়ের মধ্যে বরকত নেই। এই যে আমরা বলি, ‘সময় কোন দিক দিয়ে যায়, টের পাই না’, এটা হলো সময়ের বরকতহীনতার কারণে। আবার অনেকে বলেন, ‘সময় যাচ্ছে না কেন? সময় কাটছে না কেন?’, এটা কখনো হয় চিন্তার অবস্থা কিংবা দুঃখ-কষ্টের অবস্থার কারণে। এ ধরনের অবস্থা ছাড়া কখনো মনে হয়, সময় দ্রুত শেষ হয়ে গেল। কখনো মনে হয় সময় ফুরায় না। এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সময়ের বরকত নষ্ট করে এমন কাজ থেকে বেঁচে থাকতে হবে।

বিভিন্ন অজুহাত দাঁড় করিয়ে আমরা সময় নষ্ট করে থাকি। এর ফলে জীবনের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হচ্ছি। গুরুত্বপূর্ণ কাজ কোনো কারণ ছাড়াই পরে করব বলে ফেলে রাখছি, অপ্রয়োজনে বাইরে ঘোরাঘুরি করে সময় নষ্ট করছি, অপ্রয়োজনের মোবাইলে চ্যাট করে ও গেম খেলে সময় নষ্ট করছি, গান-বাজনা শুনে ও নাটক, সিনেমা, খেলা ইত্যাদি দেখে সময় নষ্ট করছি, মারাত্মক বদভ্যাস পরনিন্দা ও গুজব ছড়িয়ে সময় নষ্ট করছি। এভাবে সময় নষ্ট করার প্রচুর উদাহরণ দেওয়া যাবে। অথচ এই সময়টুকুকে কল্যাণকর কিংবা সৃজনশীল কাজে ব্যয় করা যেত। সময়ের সদ্ব্যবহার আর উৎপাদমুখী ভাবনা ও সৃজনশীল কর্ম ছাড়া জীবনে সফলতা আসবে না। আর পরকালে মুক্তি তো অসম্ভব।

মানুষ হিসেবে আমাদের উচিত হলো, সময় নষ্ট করার বিষয়ে মহান আল্লাহকে ভয় করা। জীবন ও প্রাত্যহিক কাজকর্মের প্রতি নিজের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে মনোযোগী হওয়া। মহান আল্লাহ আমাদের পর্যবেক্ষণ করছেন। আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ সম্পর্কে তিনি সম্যক অবগত, তার পর্যবেক্ষণের ব্যাপারে আমাদের বিবেচক হওয়া এবং তাকে স্মরণ করার ওপর গুরুত্বারোপ করা কাম্য। আমরা যদি মহান আল্লাহকে ভয় করি এবং সর্বক্ষেত্রে তার সম্পর্কে সচেতন হয়ে জীবনযাপন করি, তাহলে আমরা আমাদের সময়ের ব্যাপারেও দায়িত্বশীল হব এবং এর সদ্ব্যবহার করব। মহান আল্লাহ আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার তওফিক দান করুন। আমিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত