‘মুজিববর্ষের’ চাওয়া পূরণে রেলওয়ে!

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৬:৫৩ এএম

তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২২ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ‘মুজিববর্ষ’ হিসেবে পালন করে, যা ঘিরে সরকারি অর্থের যেমন অপচয় করা হয়, তেমনি স্বার্থান্বেষী মহলের নানান ‘অযৌক্তিক’ দাবিও পূরণ করা হয়। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এসেও অবাক করার মতো ঘটনার জন্ম দিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। রাজধানীর ফুলবাড়িয়ায় পুলিশ সদর দপ্তরের পাশে একটি ব্যবসায়িক সমিতিকে আগে থেকেই লিজ দেওয়া জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণ করতে চায় বাংলাদেশ রেলওয়ে (কর্মচারী) কল্যাণ ট্রাস্ট। তিন বছর আগে ‘মুজিববর্ষ’ উপলক্ষে তাদের সেই চাওয়া এখন পূরণের উদ্যোগ নিয়েছেন রেলকর্তারা। ফুলবাড়িয়ার ওই জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন সরকারের আইন-নীতিমালা লঙ্ঘন, অন্যদিকে মুজিববর্ষের মতো অপচয় আর তোষামোদির ইস্যুকে সন্দেহের চোখে দেখছেন অনেকেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফুলবাড়িয়ায় আগে থেকে লিজ দেওয়া জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণ করতে ২০২৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপককে (পূর্ব) চিঠি লেখেন বাংলাদেশ রেলওয়ে (কর্মচারী) কল্যাণ ট্রাস্টের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বেনু রঞ্জন সরকার। তার আগে ২০২১ সালে রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিভাগে ওই জমি বরাদ্দ পেতে আবেদন করা হয়। কল্যাণ ট্রাস্টের এমডির লেখা ওই চিঠির শুরুতে ‘মুজিববর্ষ’ উপলক্ষে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক ঢাকার ফুলবাড়িয়ার রমনা মৌজায় পুলিশ সদর দপ্তরের পশ্চিম পাশের ২১ হাজার ৬৬৬ বর্গফুট রেলভূমিতে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের লক্ষ্যে বরাদ্দ প্রদানের সম্মতি চাওয়া হয়।

এরপর গত বছর ৯ সেপ্টেম্বর বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি বিভাগ আইন ও বিধি পর্যালোচনা করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। ওই প্রতিবেদনে রেলওয়ে ভূ-সম্পত্তি বিভাগ কর্র্তৃক লাইসেন্সকৃত (আগেই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে লিজ থাকা) কোনো সম্পত্তি কল্যাণ ট্রাস্টের অনুকূলে বরাদ্দ করা যাবে না বলে জানানো হয়। এর আগে সহকারী ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা, ফিল্ড কানুনগো ও আমিন যৌথভাবে সরেজমিন পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দখিল করে।

ওই প্রতিবেদন এবং রেলওয়ের নথিপত্র পর্যালোচনা করে ভূ-সম্পত্তি বিভাগ জানায়, এ জমিতে বাংলাদেশ রেলওয়ে ভূ-সম্পত্তি নীতিমালা ২০০৬ এর অনুচ্ছেদ ৯ ধারা অনুযায়ী কিছু শর্তসাপেক্ষে ‘মহানগর ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর নামে ২১ হাজার ৬৬৬ বর্গফুট জমি বাণিজ্যিক হিসাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে হস্তান্তরজনিত কারণে সমিতির নাম ‘মহানগর বিজনেস অ্যাসোসিয়েট লিমিটেড’ করা হয়। এ জমির বিপরীতে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত খাজনা পরিশোধ আছে।

ওই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৩ সালের ৪ এপ্রিল ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মার্কেটটি পুড়ে যায়। বর্তমানে অস্থায়ীভাবে টিন, ত্রিপল ও বাঁশের মাচা তৈরি করে মালামাল রাখা আছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছর ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ সরকার। তীব্র গণরোষের মুখে দেশ ছাড়েন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর থেকে প্রশাসনের সব স্তরে আওয়ামী লীগ এবং ফ্যাসিবাদী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আওয়াজ ওঠে। অনেক নীতিতে পরিবর্তন আসে। কিন্তু এমন পরিস্থিতির মধ্যেই রেলওয়ের কিছু সুযোগ সন্ধানী কর্মকর্তা ‘মুজিববর্ষের’ দোহাই দিয়ে করা আবেদন বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে ওঠেন।

যার পরিপ্রেক্ষিতে ১১ নভেম্বর রেলওয়ের ঢাকা বিভাগীয় ভূ-বরাদ্দ কমিটির সভা হয়। ঢাকা বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক মহিউদ্দিন আরিফের সভাপতিত্বে সভায় ঢাকা বিভাগীয় প্রকৌশলী ওয়ালি-উল হক, ঢাকা বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা মহব্বতজান চৌধুরী এবং বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. আব্দুস সোবহান উপস্থিত ছিলেন।

সভার কার্যবিবরণীতে আগের প্রতিবেদনে থাকা বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়। এখানেও ‘মুজিববর্ষে’ রেলপথ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এ সভায় রেলওয়ে কল্যাণ ট্রাস্টের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বহুতল ভবন নির্মাণ হলে রেলওয়ের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ নিয়ে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের বিষয়ে একমত পোষণ করে সবাই কার্যবিবরণীতে স্বাক্ষর করেন।

অথচ ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২০’-এর ৩৮(ক) তে বলা হয়েছে, ‘কল্যাণ ট্রাস্টকে ইতোপূর্বে প্রদত্ত কোনো লাইসেন্স ফি বকেয়া থাকলে বা কিংবা লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করে থাকলে কোনোক্রমেই নতুন করে লাইসেন্স দেওয়া যাবে না। রেলওয়ে ভূ-সম্পত্তি বিভাগ কর্র্তৃক ইতিমধ্যে লাইসেন্স প্রদানকৃত কোনো জমি কল্যাণ ট্রাস্টের অনুকূলে বরাদ্দ প্রদান করা যাবে না।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফুলবাড়িয়ায় মহানগর শপিং কমপ্লেক্সের জায়গাটি মহানগর বিজনেস অ্যাসোসিয়েট লিমিটেডকে আগেই লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। বঙ্গবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা এখন বাঁশের মাচার ওপর ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম করছেন। তাছাড়া কল্যাণ স্ট্রাস্টের কাছে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত শুধু ঢাকা বিভাগে বকেয়া রয়েছে প্রায় ১৪ কোটি টাকা। এ অবস্থায় ফুলবাড়িয়ার ওই জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন সরকারের নীতিমালা লঙ্ঘন, তেমনি অন্যদিকে মুজিববর্ষের মতো অপচয় আর তোষামোদির মতো একটি ইস্যুকে সন্দেহের চোখে দেখছেন অনেকেই।

সংশ্লিষ্ট শাখায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রেলওয়ে (কর্মচারী) কল্যাণ ট্রাস্টকে নারায়ণগঞ্জ (প্রথম পর্ব), নারায়ণগঞ্জ (দ্বিতীয় পর্ব), তেজগাঁও (কারওয়ান বাজার শপিং কমপ্লেক্স), বিমানবন্দর-খিলক্ষেত প্রকল্প, ভৈরব বাজার (প্রথম প্রকল্প), ভৈরব বাজার (দ্বিতীয় প্রকল্প/মৎস্য), ভৈরব বাজার (তৃতীয় প্রকল্প), ভৈরব বাজার (চতুর্থ প্রকল্প) এবং সিলেট সিটি শপিং কমপ্লেক্সে বাণিজ্যিক জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এসব জায়গার বিপরীতে ২০২৩ সালের জুন মাস পর্যন্ত খাজনা পাওনা ছিল ১২ কোটি ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৪৪৪, ভ্যাট বাবদ ১ কোটি ৩৬ লাখ ৭৩ হাজার ৪৩৬ এবং আয়কর বাবদ ৪৫ লাখ ৫৭ হাজার ৬১৬ টাকা পাওনা রয়েছে।

মহানগর বিজনেস অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের চেয়ারম্যান আলহাজ আব্দুর রহমান বলেন, ‘বঙ্গবাজারে লাগা ভয়াবহ আগুনের রেশ এখনো কাটেনি। এখনো আগুনে পুড়ে যাওয়া ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ দিতে পারিনি। মাচা পেতে ব্যবসা শুরু করেছেন তারা। এগুলো নিয়েই নানা ঝামেলার মধ্যে আছি।’

এ ব্যবসায়ী নেতা আরও বলেন, ‘এ মার্কেটের জায়গা সরকারের কাছ থেকে লিজ নেওয়া। আমরা নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করছি। এমনকি লিজের কোনো শর্ত ভঙ্গ করিনি। ছাত্র-জনতার রক্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত এ সরকার অন্যায় কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যবসায়ীদের ওপর জুলুম করবে বলে আমার মনে হয় না। আমরা বিশ্বাস করি আইন ও নীতিমালার পরিপন্থী এ সিদ্ধান্ত রেলওয়ের কর্মকর্তারা প্রত্যাহার করে নেবেন।’

এ প্রসঙ্গে বক্তব্য নিতে ঢাকা বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আরিফের দপ্তরে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি। এ ছাড়া রেলওয়ের মহাপরিচালক এবং কল্যাণ ট্রাস্টের এমডির মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত