পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিপুল বকেয়ার কারণে আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) যে টানাপড়েন চলছিল, তা অনেকটাই স্বাভাবিক এখন। বন্ধ থাকা দ্বিতীয় ইউনিট চালুর মাধ্যমে চলতি সপ্তাহে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে ভারতীয় এই বিদ্যুৎ কোম্পানি।
ভারতের ঝাড়খন্ডে অবস্থিত আদানির দুই ইউনিটের বিদ্যুৎকেন্দ্রটির দিনে দেড় হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করার সক্ষমতা রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮৫ কোটি ডলারের বকেয়া আদায়ে গত ৩১ অক্টোবর একটি ইউনিট বন্ধ করে দেয় আদানি। অবশ্য এর আগেও বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমানোর পাশাপাশি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু শীতে বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকায় বাংলাদেশও এ নিয়ে অতটা আগ্রহ দেখায়নি।
আদানি গ্রুপের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা তো নভেম্বর থেকেই বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে চেয়েছিলাম। কিন্তু চাহিদা কম থাকায় তখন পিডিবি (বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড) দ্বিতীয় ইউনিটের বিদ্যুৎ নেয়নি। এখন চাহিদা বাড়তে থাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলেছে পিডিবি।’ বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধির প্রস্তুতি চলছে জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘দ্বিতীয় ইউনিটটি সোমবার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও টারবাইনে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে তা সম্ভব হয়নি। টারবাইনের মেরামত কাজ করছে জেনারেল ইলেকট্রিক। এটি ঠিক হলেই দ্বিতীয় ইউনিট থেকে অর্থাৎ চাহিদা অনুযায়ী পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করবে আদানি। আশা করছি এটা দুই-তিন দিন লাগবে। তবে যান্ত্রিক ত্রুটি যদি বড় হয় সে ক্ষেত্রে হয়তো আরও কিছুদিন সময় বেশি লাগতে পারে।’
পিডিবির কাছে বকেয়া পাওনার বিষয়ে আদানির গ্রুপের ওই কর্মকর্তা বলেন, তিন-চার মাস ধরে প্রতি মাসের যে বিদ্যুৎ বিল তা পরিশোধ করছে পিডিবি। পাশাপাশি পুরনো বকেয়াও কিছুটা পরিশোধ করেছে।
আদানির তথ্যমতে, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত পিডিবির কাছে তাদের বকেয়া ছিল ৭৫ কোটি ডলারের মতো। পরে জানুয়ারিতে আরও কিছু বিল পরিশোধ করায় বকেয়ার পরিমাণ এখন কমেছে। যদিও পিডিবির হিসাবে ডিসেম্বরে বকেয়া ছিল প্রায় ৬৫ কোটি ডলার। কারণ বিলে কয়লার দাম নিয়ে বিরোধ আছে। চুক্তিতে উল্লিখিত সূত্র অনুসারে কয়লার দাম হিসাব করছে আদানি আর কয়লার প্রকৃত দাম ধরে বিল হিসাব করছে পিডিবি।
পিডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মূলত ডলার সংকট এবং দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির কারণে বিগত সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল বকেয়া এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন আদানিকে নিয়মিত বিলের পাশাপাশি পুরনো বকেয়াও কিছু পরিশোধ করা হচ্ছে। প্রতি মাসে গড়ে সাড়ে আট কোটি ডলার করে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করছে পিডিবি। ফলে বকেয়ার পরিমাণ আগের চেয়ে কমে এসেছে। পর্যায়ক্রমে পুরনো বকেয়া পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। আদানির সঙ্গে এখন আর বড় কোনো ঝামেলা নেই।
গত মাসে পিডিবিকে দেওয়া এক চিঠিতে জুনের মধ্যে বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে নতুন সময় বেঁধে দেয় বহুল আলোচিত-সমালোচিত আদানি গ্রুপ। ওই সময়ের মধ্যে বকেয়া পরিশোধ করা না হলে চুক্তি অনুসারে পিডিবিকে বিলম্ব ফি দিতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছিল ভারতীয় প্রতিষ্ঠানটি।
আদানির বকেয়া নিয়ে এর আগে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান দেশ রূপান্তরকে বলেছিলেন, ‘আদানির বিদ্যুৎ নিয়ে অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সরকার মোটেও উদ্বিগ্ন নয়। তাদের যে বকেয়া আছে সেটা ধীরে ধীরে পরিশোধ করার উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। ইতিমধ্যে কিছু বকেয়া পরিশোধ করা হয়েছে। এরপরও যদি তারা বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দেয় বা বন্ধ করে দেয়, তাহলে আমরা বিকল্প উপায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করব। আমরা কোনো বিদ্যুৎ কোম্পানির কাছে দেশকে জিম্মি হতো দেব না।’ তিনি বলেন, ‘এটা কোনো জাতীয় ইস্যু নয়। পিডিবি আদানিকে ব্যবসা দিয়েছে। আদানি বিদ্যুৎ বিক্রি বাবদ পিডিবির কাছে টাকা পাবে। এটা তো একটা ব্যবসা। এখন ব্যবসায়িক এ বিষয়টি তো পিডিবি আর আদানির ব্যাপার।’
ফাওজুল কবির আরও বলেন, ‘বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে বিগত সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ বকেয়া পরিশোধে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। এখানে তো শুধু আদানি নয়, অন্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিপিসির তেল সরবরাহকারী রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনা করেই দেশে যাতে বিদ্যুৎ-জ্বালানি স্বাভাবিক রাখা যায়, সেই পরিকল্পনা করে আমরা এগোচ্ছি।’
পিডিবি সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বকেয়ার অর্থ আদায়ে আগের চেয়ে তৎপরতা বাড়িয়ে দেয় আদানি। বাংলাদেশকে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে আদানি। একপর্যায়ে কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে ৩০ অক্টোবরের মধ্যে বিদ্যুৎ আমদানিতে আদানির নামে ঋণপত্র (এলসি) খোলার কথা থাকলেও ডলার সংকটের কারণে তা সম্ভব হয়নি। তখন পিডিবির পক্ষ থেকে সময় চাওয়া হয়। এরই মধ্যে ৩১ অক্টোবর থেকে ১৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার কেন্দ্রটির একটি ইউনিট বন্ধ করে দেয় আদানি।
আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয় ২০২৩ সালের এপ্রিলে। দ্বিতীয় ইউনিট থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় একই বছরের জুনে। বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগেই কেন্দ্রটির কয়লার দাম ও চুক্তির শর্ত নিয়ে দেশ-বিদেশে শুরু হয় ব্যাপক সমালোচনা। একপর্যায়ে পিডিবির পক্ষ থেকে আদানিকে কয়লার চড়া দাম দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর দাম কমাতে রাজি হয় তারা। পায়রা ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে কম দামে কয়লা সরবরাহের প্রতিশ্রুতিও দেয়। কিন্তু এরপরও কয়লার দাম বেশি ধরছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট ভারতে পালিয়ে যান হাসিনা। এরপর গত সেপ্টেম্বরে শেখ হাসিনার সময়ে স্বাক্ষরিত প্রধান বিদ্যুৎ-জ্বালানি চুক্তিগুলো পরীক্ষা করার জন্য বিশেষজ্ঞদের প্যানেল নিয়োগ করে অন্তর্র্বর্তী সরকার। অন্যদিকে আদানির বিরুদ্ধে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে সরকার। এতে বলা হয়, ঝাড়খন্ডে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জন্য আদানি দিল্লি থেকে যে কর-সুবিধা পেয়েছিল, তা বাংলাদেশকে দেওয়া হয়নি।
যদিও আদানির কর্মকর্তাদের দাবি, সব নিয়মকানুন মেনেই বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে এবং সে অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয়ও কোনো কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় কম।
এদিকে গত বছর নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে সাড়ে ২৬ কোটি ডলার ঘুষ দেওয়ার মামলায় আদানি ও তার সাত নির্বাহীকে অভিযুক্ত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ওই অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে তখন উড়িয়ে দেয় আদানি।
