ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে চায় বিএনপি। পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতিও এ সময়ের মধ্যে সেরে রাখার প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছে দলটি। একটি নির্দিষ্ট সময়ের ওপর ফোকাস করে আগামী সংসদ নির্বাচন হওয়া উচিতÑ এমনটি ইতিমধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) জানানো হয়েছে। চলতি সপ্তাহে ইসি ও সরকারের সঙ্গে বৈঠকে দলটির নেতারা এমন আভাস দেন। ভোটের দিনক্ষণ দ্রুতই সরকারের পক্ষ থেকে জানানোর জন্য চাপ রয়েছে দলটির। একই সঙ্গে মাঠের কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও তাদের। সেই ধারাবাহিকতায় আজ বুধবার থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে আট দিনে ৬৭ সাংগঠনিক জেলায় সমাবেশের পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি শুরু করেছে বিএনপি।
জানা গেছে, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে বিএনপিকে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সরকারপ্রধানের এমন কথাবার্তায় আশ^স্ত হয়েছে দলটি। এতে বিএনপি বেশ উৎফুল্লও। গতকাল মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহও সাংবাদিকদের জানান, ‘আগামী ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি। তবে দলটির নেতারা মনে করেন, তারপরও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে বাধা আসতে পারে। কারণ, নির্বাচন প্রলম্বিত করতে সরকারের ওপর একধরনের চাপ আছে। তাই পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে দ্রুততম সময়ে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ চায় বিএনপি। এজন্য সরকারকে চাপে রাখতে পূর্বঘোষিত ঢাকাসহ দেশব্যাপী সভা-সমাবেশের কর্মসূচি পালন করবে দলটি।
গত সোমবার রাজধানীর গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এমন আলোচনা হয়েছে। রাত পৌনে ৯টা থেকে পৌনে ১১টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বৈঠকে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি সংযুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর আজ বুধবার থেকে রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামছে বিএনপি। নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো, নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা এবং ফ্যাসিবাদীদের নানা ষড়যন্ত্র মোকাবিলাসহ বিভিন্ন জনদাবিতে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঢাকাসহ দেশের ৬৭টি সাংগঠনিক জেলায় সভা-সমাবেশ করবে দলটি। এই কর্মসূচিতে চারটি লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও মূলত আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবিকেই ‘মূল ফোকাস’ হিসেবে তুলে ধরতে চায় তারা। দাবিগুলো হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সহনীয় পর্যায়ে রাখা, অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, দ্রুত গণতান্ত্রিক যাত্রাপথে উত্তরণের জন্য নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা এবং রাষ্ট্রে পতিত ফ্যাসিবাদের নানা চক্রান্তের অপচেষ্টা মোকাবিলা। আজ প্রথম দিনে ছয় জেলায় সমাবেশ হবে। খুলনায় সমাবেশে স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, লালমনিরহাটে স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সিরাজগঞ্জে স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লা বুলু, সুনামগঞ্জে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরী এবং পটুয়াখালীতে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল প্রধান অতিথি থাকবেন।
এদিকে দেশব্যাপী এই কর্মসূচি শুরুর আগে সরকারকে দ্রুত নির্বাচনের বিষয়ে তাগিদ দিতে গত সোমবার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বিএনপির শীর্ষ স্থানীয় তিন নেতা বৈঠক করেন। বৈঠকে নির্বাচন প্রশ্নে দলীয় অবস্থান ও মনোভাব প্রধান উপদেষ্টাকে জানান বিএনপি নেতারা। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে বৈঠকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ ও হাফিজ উদ্দিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর ওইদিন রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সরকারের সঙ্গে আলোচনার বিষয়বস্তু স্থায়ী কমিটির সভায় অবহিত করেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা। তারা জানান, প্রধান উপদেষ্টা এবং তার সঙ্গে যারা ছিলেন, তারা আশ্বস্ত করেছেন, অতি দ্রুত নির্বাচনের ব্যবস্থা করছেন। তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) বলেছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের ব্যবস্থা করার জন্য কাজ করছেন। তারা রোডম্যাপের ব্যাপারে সম্ভাব্য ১৫ তারিখের (ফেব্রুয়ারি) মধ্যেই কিছু একটা বলতে পারেন।
নির্বাচন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার এমন আশ্বাসের পরও বিএনপি নেতারা মনে করছেন, এরপরও বাধা আসতে পারে। কারণ দ্রুত নির্বাচন না দেওয়ার জন্য প্রধান উপদেষ্টার ওপর একধরনের চাপ রয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্ররা নির্বাচন প্রলম্বিত করতে চান। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের পর সারা দেশে সংগঠন গোছানো ও সুসংহত করতে তাদের বেশ সময়ের প্রয়োজন। অন্যদিকে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জামায়াতও এখন তৃণমূলে সংগঠনকে গোছানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিএনপি নেতাদের অভিমত, এমন অবস্থায় দ্রুত নির্বাচন দাবিতে বিএনপি দেশব্যাপী কর্মসূচির মধ্য দিয়ে কৌশলে পাল্টা চাপ সৃষ্টি করলে ড. ইউনূসের ভীতি কাটতে পারে। এর ফলে তিনি রোডম্যাপ ঘোষণা ইস্যুতে একধরনের ভরসাও পাবেন। কারণ, ব্যাপক জনসমাগমে সভা-সমাবেশের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হবে, বিএনপির মতো একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল ও নেতাকর্মীরা তার সঙ্গে রয়েছেন এবং তারা নির্বাচন দাবিতে রাজপথেও নেমেছেন। তাই কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি সমাবেশ ব্যাপক জনসমাগমের মধ্য দিয়ে সর্বাত্মকভাবে সফলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন নেতাকর্মীরা।
বিএনপি মনে করে, প্রধান উপদেষ্টার আশ্বাসে নির্বাচনের যে আলো দেখা গেছে, দ্রুত রোডম্যাপ ঘোষণা হলে তা আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে। একই সঙ্গে সব ধরনের সংকট কেটে যাবে, নির্বাচন নিয়ে শঙ্কাও দূর হয়ে যাবে। কারণ, রোডম্যাপের পর পুরো দেশ তখন নির্বাচনমুখী হয়ে পড়বে। দলটির নেতারা মনে করেন, পতিত ফ্যাসিবাদের দোসরদের নানামুখী ষড়যন্ত্রের পরিপ্রেক্ষিতে অবিলম্বে একটি গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনই হতে পারে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ। দেশব্যাপী সমাবেশের কর্মসূচি রমজান শুরু হওয়ার আগেই সম্পন্ন হবে।
জানা গেছে, আসন্ন রমজানে রাজপথে কোনো কর্মসূচি থাকবে না বিএনপির। তবে ওই মাসে ইফতার মাহফিলের মধ্য দিয়েও একই দাবি তুলে ধরা হবে। আর এ সময়ের মধ্যে সংস্কার এবং জাতীয় নির্বাচনের দিনক্ষণ সুনির্দিষ্ট না হলে রমজানের পর রাজপথে কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে দলটি। তখন দেশব্যাপী বিভাগ ও মহানগরে সমাবেশের কর্মসূচি আসতে পারে।
সূত্রগুলো বলছে, স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে আশা প্রকাশ করা হয় সভায়। এ ছাড়া ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরসহ দেশ জুড়ে সংঘটিত ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। বিএনপি নেতারা বলেন, গণঅভ্যুত্থানের এত দিন পর এসে তারা কোনো নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিকে সমর্থন করেন না। দলীয় এই অবস্থান তারা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তুলে ধরবেন।
গত সোমবার প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করার পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের জানান, ‘দ্রুত নির্বাচনের জন্য আমরা সরকারকে আবারও তাগাদা দিয়েছি। সংস্কার কমিশনগুলোয় সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে ন্যূনতম সংস্কার করে দ্রুত নির্বাচনের কথা বলেছি।’
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিএনপির জোটসঙ্গী নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনের সময় ঠিক করার পর সরকারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি ভালো ভোটার তালিকা করে সুষ্ঠু নির্বাচন দেওয়া। যাতে মানুষ নির্বিঘেœ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। এই লক্ষ্যে যতটা সংস্কার দরকার, সেটুকু করেই নির্বাচন আয়োজনে মনোনিবেশ করাই পরবর্তী ধাপের পদক্ষেপ হওয়া উচিত। বিএনপি বলেছে, ডিসেম্বরের বিষয়ে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে। কিন্তু তার প্রেস সচিব কিন্তু অন্য দলগুলোর রাজি হওয়ার বিষয়টিও তুলেছেন। সেটিও ভাবতে হবে।’
