সবখানে নির্যাতনের চিহ্ন

‘আয়নাঘর’ পরিদর্শন প্রধান উপদেষ্টার  কোন কক্ষে ছিলেন শনাক্ত করলেন উপদেষ্টা আসিফ ও নাহিদ

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৭:০৬ এএম

গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্যাতনের জন্য ‘আয়নাঘর’ নামে কুখ্যাতি পাওয়া তিনটি গোপন বন্দিশালা পরিদর্শন করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ সময় ভুক্তভোগীরা নির্যাতনের ভয়াবহতার প্রতীক হিসেবে কচুক্ষেত বন্দিশালার দেয়ালগুলো দেখান। এ ছাড়া আগারগাঁওয়ের বন্দিশালায় নির্যাতনের সময় বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত একটি চেয়ার দেখানো হয় প্রধান উপদেষ্টাকে। স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার শাসনামলে এসব গোপন বন্দিশালায় জিজ্ঞাসাবাদের নামে আটক ব্যক্তিদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো হতো। গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শুরু করে একে একে রাজধানীর আগারগাঁও, কচুক্ষেত ও উত্তরা এলাকায় তিনটি আয়নাঘর পরিদর্শন করেন সরকারপ্রধান।

এ সময় নির্যাতন পেরিয়ে বেঁচে ফিরে আসা আটজন ভুক্তভোগী, সরকারের ছয়জন উপদেষ্টা, গুম হওয়াদের সন্ধানে গঠিত কমিশনের সদস্য এবং প্রেস উইংয়ের সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ছিলেন। তবে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভি এবং বিদেশি দুটি গণমাধ্যম ছাড়া আর কোনো সাংবাদিককে সঙ্গে নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত এবং বেঁচে যাওয়াদের বৃহত্তর একটি অংশকে সঙ্গে নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তারা।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, শেখ হাসিনার আমলে আট থেকে নয় বছরে নিরাপত্তা বাহিনী আয়নাঘর ও গোপন বন্দিশালায় হাজার হাজার ব্যক্তিকে গুম করে আটকে রেখেছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, শেখ হাসিনা নিজেই গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এমন টর্চার সেল আছে সারা দেশে : গোপন বন্দিশালা পরিদর্শন শেষে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আইয়ামে জাহেলিয়া (অন্ধকার যুগ) বলে একটা কথা আছে না, গত সরকার আইয়ামে জাহেলিয়া প্রতিষ্ঠা করে গেছে। এটা (গোপন বন্দিশালা) তার একটি নমুনা।’ বিভিন্ন সংস্করণে দেশ জুড়ে এমন বন্দিশালা রয়েছে, যেগুলোর সংখ্যা নিরূপণ করা যায়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বন্দিশালা ঘুরে দেখে প্রধান উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, ‘বীভৎস দৃশ্য! নৃশংস জিনিস হয়েছে এখানে। যতটাই শুনি মনে হয়, অবিশ্বাস্য, এটা কি আমাদেরই জগৎ, আমাদের সমাজ! যারা নিগৃহীত হয়েছেন, তারাও আমাদের সমাজেই আছেন। তাদের মুখ থেকে শুনলাম। কী হয়েছে, কোনো ব্যাখ্যা নেই।’

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের বিনা কারণে, বিনা দোষে উঠিয়ে আনা হতো। সন্ত্রাসী বা জঙ্গি বলে এখানে ঢুকিয়ে রাখা হতো। এরকম টর্চার সেল (নির্যাতনকেন্দ্র) সারা দেশে আছে। ধারণা ছিল, এখানে কয়েকটা আছে। এখন শুনছি বিভিন্ন ভার্সনে (সংস্করণে) দেশ জুড়ে আছে। সংখ্যাও নিরূপণ করা যায়নি।’

আয়নাঘরের চেয়ে মুরগির খাঁচাও বড় : ‘আয়নাঘরে’ বেশ কয়েকটি খুপরি দেখা যায়, যেখানে দিনের বেলাতেও আলো প্রবেশ করে না। নেই বাতাস চলাচলেরও কোনো ব্যবস্থা। এরকম একটি খুপরি দেখে তাকে মুরগির খাঁচার সঙ্গে তুলনা করেন প্রধান উপদেষ্টা।

মানুষকে সামান্যতম মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে উল্লেখ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘একজন বলছিলেন, খুপরির মধ্যে রাখা হয়েছে। এর থেকে তো মুরগির খাঁচাও বড় হয়। বছরের পর বছর এভাবে রাখা হয়েছে।’

সমাজকে এসব থেকে বের করে না আনা গেলে সমাজ টিকবে না বলে উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি নতুন সমাজ গড়া, অপরাধীদের বিচার করা ও প্রমাণ রক্ষার ওপর জোর দেন।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘ন্যায়বিচার যেন পায়, সেটা এখন প্রাধান্য।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন বাংলাদেশ ও নতুন পরিবেশ গড়তে চাই। সরকার সে লক্ষ্যে বিভিন্ন কমিশন করেছে। যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তার পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, সরকার সে লক্ষ্যে কাজ করবে।’

গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধানে গঠিত কমিশনের প্রতিবেদনে এ আয়নাঘরের ডকুমেন্টেশন বাধ্যতামূলক করা হবে জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, যারা এ ধরনের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল তাদের বিচার করা হবে। এসব তথ্য-প্রমাণ সিলগালা করে রাখা হবে এবং বিচারের জন্য ব্যবহৃত হবে।

আয়নাঘরে আটকে রাখা জায়গা চিনতে পারলেন নাহিদ ও আসিফ : জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় বর্তমান সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে তুলে নেওয়ার পর আয়নাঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। গতকাল প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আয়নাঘর পরিদর্শনে গিয়ে সেই দুই টর্চার সেল চিনতে পারার কথা জানান এ দুই উপদেষ্টা। জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় তাদের সাদা পোশাকে তুলে নেওয়া হয়।

আয়নাঘর পরিদর্শনের পর নাহিদ ইসলাম জানান, তাকে যে কক্ষে আটকে রাখা হয়েছিল সেই কক্ষের একপাশে টয়লেট হিসেবে একটি বেসিনের মতো ছিল। ৫ আগস্টের পর এই সেলগুলোর মাঝের দেয়াল ভেঙে ফেলা হয়, দেয়াল রঙ করা হয়।

আয়নাঘর পরিদর্শনের পর আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, তাকে যে কক্ষে আটকে রাখা হয়েছিল সেই কক্ষের দেয়ালের ওপরের অংশের খোপগুলোতে এক্সজস্ট ফ্যান ছিল, এখন নেই। তিনি আরও জানান, দেয়াল দেখে কক্ষটি চিনতে পেরেছেন। আগে অনেক ছোট ছিল, এখন মাঝের দেয়াল ভেঙে বড় করা হয়েছে। ওই কক্ষে তাকে চার দিন আটকে রাখা হয়েছিল। এ সময় বাইরের কারও সঙ্গে তাকে কথা বলতে দেওয়া হয়নি। টয়লেট ছিল কক্ষের বাইরে এবং চোখ বেঁধে টয়লেটে নিয়ে যাওয়া হতো।

নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে এসে ইন্টারোগেশন (জিজ্ঞাসাবাদ) করা হয়েছে অনেক। যখন চোখ খোলা হয়েছিল, তখন এরকম একটা রুম দেখেছি। যতক্ষণ রুমে থাকতাম, ততক্ষণ চোখ খোলা থাকত, হাতকড়া খুলে দিতে। রুম থেকে বের করার সময় চোখ বাঁধত, হাতকড়া বাঁধত। এখানে ছিল একটা কাঠের দরজা, তার সামনে একটা লোহার দরজা ছিল। দরজার নিচ দিয়ে খাবার দিত। রুমে গোল গোল হলুদ লাইট ছিল। প্রচুর সাউন্ড হতো বাইরে। একটা পটের মতো ছিল, প্রস্রাব করতে হলে এখানেই করতে হতো। লাগলে তারা ওয়াশরুমে নিয়ে যেত। কাঠের দরজা এবং সামনে বা পেছনে লোহার দরজা ছিল।’

শেখ হাসিনার আমলে গুমের শিকার জামায়াতে ইসলামীর নেতা গোলাম আযমের ছেলে আব্দুল্লাহিল আমান আযমী এবং দলটির কেন্দ্রীয় নেতা ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাতা মীর কাশেম আলীর ছেলে আহমেদ বিন কাশেম এ সময় সেখানে ছিলেন।

গত ১৯ জানুয়ারি এক বৈঠকে কয়েকটি গুমের ঘটনার নৃশংস বর্ণনা প্রধান উপদেষ্টার সামনে তুলে ধরা হয়। ছয় বছরের শিশু গুম হওয়ার ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে বলে জানান কমিশন সদস্যরা।

কমিশনকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘তারা বহু কষ্ট করেছে। গুম কমিশনকে এগুলো বের করে আনতে হয়েছে। কীসের মধ্যে ঢুকিয়েছিল, কারা কী করেছে।’

পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘ভুক্তভোগীর সংখ্যা আমাদের জানামতে সতেরোশ প্লাস। অজানা কত এটা তো আমরা জানি না। কেউ কেউ বলে এটা তিন হাজারের বেশি হবে।’

পরিদর্শনে যাওয়া ২১ বছরের এক নারীর উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “তার মেয়ে আপনাদের সামনেই ছিল আজকে। বলছে, ‘আমার মাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে ৯ বছর ধরে আমরা খোঁজ পাইনি’।”

আয়নাঘর ৭০০-৮০০, সব বের করা হবে : গতকাল বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘কেউ কেউ এসব আয়নাঘরে ৮-৯ বছর পর্যন্ত কাটিয়েছেন। বাংলাদেশে যত আয়নাঘর আছে, সব খুঁজে বের করা হবে। গুমবিষয়ক তদন্ত কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আমরা জেনেছি এটার সংখ্যা ৭০০-৮০০টি। এগুলো শুধু ঢাকায় নয়, দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রত্যন্ত অঞ্চলেও আয়নাঘর ছিল।’

এর আগে গত বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের সভায় দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ‘আয়নাঘর’ পরিদর্শনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু গতকালের পরিদর্শনে খুবই অল্পসংখ্যক সাংবাদিক সুযোগ পেয়েছেন। এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রেস সচিব বলেন, ‘আমরা যে জায়গাগুলোতে গেছি, সবগুলোর ছবি দিয়েছি। খুবই ছোট ছোট জায়গা। এগুলো খুঁজে বের করা চ্যালেঞ্জ ছিল। এ কারণেই বেশি সাংবাদিক নেওয়া সম্ভব হয়নি। আমাদের সঙ্গে বিটিভি ও পিআইবির ক্যামেরা ছিল। বাইরের নেত্র নিউজ ও আলজাজিরা ছিল।’

সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আজাদ মজুমদার বলেন, জাতিসংঘের সুপারিশ পরীক্ষা ও বিবেচনা করে কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তা দেখবে সরকার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত