ভারতকে পেছনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ড এগিয়ে

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৪:৫৩ এএম

সাধারণত চিকিৎসাসহ বিভিন্ন কাজে প্রতি বছর ভারতে ভ্রমণ করেন কয়েক লাখ বাংলাদেশি। এজন্য সে দেশে ক্রেডিট কার্ডে বাংলাদেশিদের খরচ অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে থাকে। কিন্তু গত বছর আগস্টে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দৃশ্যপট বদলে গেছে। দেশটিতে ধারাবাহিকভাবে খরচ কমছে বাংলাদেশিদের। গত নভেম্বর মাসেও বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ড লেনদেনে ভারত ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিসেম্বর মাসে তা চতুর্থ অবস্থানে নেমে যায়। এ ক্ষেত্রে শীর্ষে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য থেকে জানা যায়, দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে ফের বাড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার। দেশের অভ্যন্তরে গত ডিসেম্বরে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বেড়েছে ১৫ দশমিক ১১ শতাংশ। আর বিদেশে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বেড়েছে ১৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজনৈতিক নেতারা এসব দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। তারাই সবচেয়ে বেশি খরচ করছে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে। যদিও সরকার পতনের পর কয়েক মাস এ হার কমেছিল।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরে দেশের অভ্যন্তরে বাংলাদেশিরা ক্রেডিট কার্ডে খরচ করেছেন ৩ হাজার ২১৫ কোটি টাকা। নভেম্বরে যার পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। সেই হিসাবে নভেম্বরের তুলনায় ডিসেম্বরে দেশের ভেতরে ক্রেডিট কার্ডে খরচ বেড়েছে ৪২২ কোটি টাকা বা ১৫ দশমিক ১০ শতাংশ। একইভাবে ডিসেম্বরে বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ডধারীরা বিদেশে খরচ করেছেন ৪৯১ কোটি, নভেম্বরে যার পরিমাণ ছিল ৪৩১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে নভেম্বরের তুলনায় ডিসেম্বরে বিদেশে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ডে খরচ বেড়েছে ৬০ কোটি টাকা বা ১৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত ডিসেম্বরে ব্যাংকগুলো ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে নানা অফার দিয়ে থাকে, সে কারণে প্রতি বছরের ডিসেম্বরেই কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন বাড়ে। কার্ডের মাধ্যমে ফরেন কারেন্সি লেনদেন বেড়েছে, এর অন্যতম কারণ হলো এ মাসে বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। অনেকেই তাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে বিদেশে ঘুরতে যান। এ ছাড়া বর্তমানে ডলারের প্রবাহ স্বাভাবিক হওয়ায় লেনদেনের সীমা আগের জায়গায় নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ একজন গ্রাহক চাইলে ১২ হাজার ডলার পর্যন্ত অ্যান্ডোর্স করতে পারছেন।

প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ডিসেম্বর মাসে বিদেশে বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ডের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। ওই মাসে দেশটিতে বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে খরচ করা হয়েছে ৭৪ কোটি টাকা। নভেম্বরে যার পরিমাণ ছিল ৬৮ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বেড়েছে ৮ দশমিক ৮২ শতাংশ। আর মোট খরচের ১৫ দশমিক ১২ শতাংশই এখানে খরচ করা হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে থাইল্যান্ড। এখানে খরচ করা হয়েছে ৬৪ কোটি টাকা, যা মোট খরচের ১৩ দশমিক ১৮ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে সিঙ্গাপুর। সেখানে ব্যয় করা হয়েছে ৪১ কোটি টাকা। আর চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে ভারত। সেখানে খরচ হয়েছে ৪০ কোটি টাকা। আগের মাসে যা ছিল ৪৭ কোটি টাকা। সেই হিসাবে ভারতে বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে। গত জুলাইয়ের পর থেকেই ভারতে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার কমতে থাকে।

গত কয়েক মাসের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, সাধারণত দেশের বাইরে বাংলাদেশিরা ক্রেডিট কার্ডে সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ করেন ভারতে; কিন্তু গত জুলাই মাসে তার ব্যতিক্রম দেখা গেছে। বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের কারণে জুলাইয়ে দেশটি ভিসা কার্যক্রম সীমিত করে ফেলে। এর ফলে জুলাইয়ে বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসা বা ভ্রমণের জন্য বাংলাদেশিরা ভারত যেতে পারেননি, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। এ কারণেই দেশটিতে ক্রেডিট কার্ডে বাংলাদেশিদের খরচ কমেছে বলে মনে করছেন ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা।

বিদেশে বাংলাদেশিরা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ করেন ডিপার্টমেন্ট স্টোরে। ডিসেম্বরে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে খরচের পরিমাণ ছিল ১৫৩ কোটি টাকা। বিদেশের মাটিতে ক্রেডিট কার্ডের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যবহার ছিল রিটেইল আউটলেট সার্ভিসে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে ডিসেম্বরে বাংলাদেশিরা খরচ করেছেন ৮২ কোটি টাকা। উভয় ক্ষেত্রেই খরচ নভেম্বরের তুলনায় অনেক বেশি হারে বেড়েছে।

একই সময়ে বাংলাদেশেও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার অনেক বেশি বেড়েছে। এ সময় তারা ২৪০ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন, যা আগের মাস নভেম্বরে ছিল ২০২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে নভেম্বরের তুলনায় ডিসেম্বরে খরচ বেড়েছে ৩৮ কোটি টাকা বা ১৮ দশমিক ৮১ শতাংশ। এ সময় তারা সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছেন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। যার পরিমাণ ৯৩ কোটি টাকা।

এর আগে গত বছর জুলাই মাস জুড়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও সেটিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সংহিসতার জেরে দেশ-বিদেশে বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার কমেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগ দেশের ক্রেডিট কার্ড ইস্যুকারী ৪৪টি ব্যাংক ও ১টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। প্রতিবেদনে দেশের অভ্যন্তর ও বিদেশে বাংলাদেশের নাগরিকদের এবং দেশের ভেতরে বিদেশি নাগরিকদের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের তথ্য তুলে ধরা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত