বাংলাদেশের ক্রিকেটের পরমবন্ধু খ্যাত জগমোহন ডালমিয়ার মস্তিষ্কপ্রসূত যে ধারণা থেকে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির শুরু ঢাকায় ১৯৯৮ সালে এরপর কেনিয়া, শ্রীলঙ্কা হয়ে এ প্রতিযোগিতার চতুর্থ আসর বসে ইংল্যান্ডে, ২০০২ সালে। শ্রীলঙ্কার মতো ইংল্যান্ডে চতুর্থ আসরেও অংশ নেয় ১২টি দেশ। ওই দুই আসরে পুল কিংবা গ্রুপে ভাগ করে খেলা পরিচালিত হওয়ায় দেখা যায় বেশ কিছু কম গুরুত্বের ম্যাচও আয়োজন করতে হচ্ছে। যেহেতু অর্থ সংগ্রহই এ প্রতিযোগিতার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল, তাই পঞ্চম আসরে এই বিষয়টিকে মাথায় এনে ফরম্যাটে পুনরায় বদল আনার পথে হাঁটে আইসিসি। ২০০৬ সালের আয়োজনের আগে সেই চিন্তা থেকেই চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে অংশ নেওয়া দল কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয় ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। ততদিনে ক্রিকেটের ছোট ফরম্যাট টি-টোয়েন্টির সঙ্গেও পরিচিতি ঘটে ক্রিকেট বিশ্বের। ২০০৪ সালের জুলাইতে ইংল্যান্ডের দুই কাউন্টি ক্লাব মিডলসেক্স ও সারে এই ফরম্যাটে ম্যাচ খেলে। পরের বছরের ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে আয়োজিত হয় প্রথম আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচের। তবুও নিয়মিত আয়োজনের অংশ হিসেবে ২০০৬ সালে বসে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পঞ্চম আসর।
ভারতে ২০০৬ আসর
২০০৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত চূড়ান্ত ছিল না পঞ্চম আসর কোথায় অনুষ্ঠিত হবে। অবশেষে ভারতীয় সরকার ট্যাক্স মওকুফের সিদ্ধান্তে সহমত হলে তাদেরই আয়োজক হিসেবে বেছে নেয় আইসিসি। ৭ অক্টোবর থেকে ৫ নভেম্বরের এই আসরে ১২ থেকে ১০-এ নেমে আসে অংশ নেওয়া দেশের সংখ্যা। ১ এপ্রিল ২০০৬ পর্যন্ত আইসিসি ওয়ানডে র্যাংকিংয়ের শীর্ষ দশে থাকা দেশগুলোর একটি হয়ে শেষ মুহূর্তের সমীকরণে কেনিয়াকে টপকে বাংলাদেশ জায়গা করে নেয় এই আসরে।
টুর্নামেন্টের ফরম্যাটেও বদল আসে পঞ্চম আসরে। দশ দেশ অংশ নিলেও দুই গ্রুপে ভাগ করে আটটি দেশ নিয়ে রাউন্ড রবিন লিগ পদ্ধতিতে মূল পর্ব আয়োজন করা হয়। সেক্ষেত্রে র্যাংকিংয়ের শীর্ষ ছয়ে থাকা দলগুলো সরাসরি মূল পর্বে জায়গা করে নেয়। আর শেষ চারটি দল অংশ নেয় কোয়ালিফায়িং রাউন্ডে। বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়েকে পেছনে ফেলে কোয়ালিফায়িং থেকে মূল পর্বে জায়গা করে নেয় শ্রীলঙ্কা ও গতবারের চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ওই পর্বে শাহরিয়ার নাফীসের সেঞ্চুরিতে জয়পুরে জিম্বাবুয়েকে ১০১ রানে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে এটিই ছিল বাংলাদেশের প্রথম জয়। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির এই আসরটি এতটাই অনিশ্চয়তাপূর্ণ ছিল যে ইংরেজ লেখক টিম ডি লিসলে একে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘মজার আসর’ নামে। বিশেষ করে ভারতের উইকেটে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ইতিহাসে সর্বনিম্ন দশ দলীয় সংগ্রহের পাঁচটিই এসেছিল এই আসরে। সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়া নিউজিল্যান্ডকে এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে ওঠে ফাইনালে। গ্রুপ পর্বে উইন্ডিজের কাছে হেরেছিল অজিরা। কিন্তু মহাগুরুত্বের ফাইনালে ১৩৮ রানেই ধসে পড়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংস। ডার্কওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে অস্ট্রেলিয়ার লক্ষ্য দাঁড়ায় ৩৫ ওভারে ১১৬ রান। যা ৮ উইকেট হাতে রেখেই ছুঁয়ে ফেলে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়নস ট্রফির শিরোপা ঘরে তোলে অস্ট্রেলিয়া। আসরে সর্বোচ্চ রান করে ক্রিস গেইল হন প্লেয়ার অফ দ্য সিরিজ।
দক্ষিণ আফ্রিকায় ২০০৯ আসর
দুই বছর অন্তর আয়োজনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে ২০০৮ সালে ষষ্ঠ আসর হওয়ার কথা ছিল পাকিস্তানে। কিন্তু দেশটির সেই সময়কার নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে বাতিল করতে হয় আয়োজন। পরের বছর ২০০৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় সরে আসে এই আসরটি। ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবরের এ আয়োজনে খেলা হয় সেঞ্চুরিয়ন ও জোহানেসবার্গে। এই আসর থেকেই শুরু হয় আধুনিক চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পথচলা। অংশগ্রহণকারী দল দশ থেকে নেমে আসে আটে। মানদণ্ড ঠিক করা হয় ১ আগস্ট ২০০৯ পর্যন্ত দেশগুলোর ওয়ানডে র্যাংকিংয়ের অবস্থান। আর আয়োজনকারী দেশ অংশ নিতে পারে সরাসরি। তাই র্যাংকিংয়ে সেরা আটে না থাকায় বাংলাদেশ ঝরে পরে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির এই আসর থেকে। এবারও সেমিতে ইংল্যান্ডকে হারায় অস্ট্রেলিয়া। আর পাকিস্তানকে হারায় নিউজিল্যান্ড। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির আগের পাঁচ আসরে পাঁচ নতুন চ্যাম্পিয়ন পেলেও এবারই প্রথম শিরোপা ধরে রাখে অস্ট্রেলিয়া। শেন ওয়াটসনের সেঞ্চুরিতে কিউইদের ৬ উইকেটে হারায় অজিরা। সর্বোচ্চ ১১টি উইকেট নেন প্রোটিয়া বোলার ওয়েইন পারনেল। সর্বোচ্চ রানের সুবাদে আসরসেরা হন রিকি পন্টিং।
