একজন দিনমজুরের চেয়েও কোচের দৈনিক ভাতা কম

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০১:০০ এএম

সদ্যসমাপ্ত জাতীয় অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে টাইমকিপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন সাবেক দ্রুততম মানব আব্দুল্লাহ হেল কাফি। তবে তার আসল পরিচয় তিনি একজন সফল স্প্রিন্ট কোচ। দেশের দ্রুততম মানব ও মানবী মোহাম্মদ ইসমাইল ও শিরিন আক্তার তার হাতেই গড়া। দেশের অ্যাথলেটিকস নিয়ে নিজের ভাবনা দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দ’র কাছে জানিয়েছেন কাফি

এবার তো দেখলাম টাইমকিপার হিসেবে ছিলেন। এই দায়িত্বে থাকাবস্থায় যখন দেখলেন নিজের প্রিয় ছাত্ররা একের পর এক সাফল্য পাচ্ছে, সে সময় কেমন অনুভূতি হয়?

আব্দুল্লাহ হেল কাফি : আসলে স্প্রিন্টের এই ইভেন্টগুলো আমি নিজেও এক সময় খেলতাম। এগুলো যখন চোখের সামনে হয় তখন অন্যরকম একটা অনুভূতি কাজ করে। আর কোচ হিসেবে খেলোয়াড়দের মতো আমাদের মধ্যেও একটা উত্তেজনা কাজ করে। তারপরও টাইমকিপারের কাজটাও তখন নিরপেক্ষভাবে করতে হয়। ঘড়ি ধরতে হয়। আসলে ওরা দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করে যখন সফল হয়, তখন মনে হয় ওদের পেছনে আমারও তো কিছু শ্রম আছে। সেটা ভাবলে খুব ভালো লাগে। মনে হয় এই যে পরিশ্রম করেছি সৃষ্টিকর্তা সেই পরিশ্রমের ফল দিয়েছেন।

সেই শুরু থেকেই শিরিনের মুখে শুনে আসছি কাফি স্যারের কথা। তিনি ১৬ বারের মতো দেশের দ্রুততম মানবী হলেন। এখনো কৃতজ্ঞতা জানাতে গিয়ে সবসময় আপনার কথা বলেন...

কাফি : আমি ২০০৯ সালে যখন বিকেএসপিতে কোচ হিসেবে যোগ দিই, তখন থেকেই শিরিন আমার কাছে। এর পর থেকে ওর আর কোনো কোচ পরিবর্তন হয়নি। ২০০৯ সালে শিরিন ক্লাস সেভেনে পড়ত। পাঁচ বছর পর ও ২০১৪ সালে ১০০ মিটার ও ২০০ মিটারে প্রথম সেরা হলো। এরপর থেকে একবার ছাড়া ও আর কখনো কোনো কোচের কাছে যায়নি। তবে একবার একটা ন্যাশনাল ক্যাম্প হয়েছিল। সেখানে আমাকে কোচ হিসেবে ডাকা হয়নি। ওই সময় অন্য একজন কোচকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সে সময় ও ওই কোচের অধীনে প্রশিক্ষণ করে। সেবার জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ও সুমাইয়া দেওয়ানের কাছে হেরে গিয়েছিল। কোনো মিটের আগে ওই একবারই ও আমার কাছে ট্রেনিং করেনি।

আপনি এখন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত। সেখানে থেকে দেশের সেরা স্প্রিন্টারদের নিয়ে কীভাবে কাজ করেন? কারণ অনেকেই তো বিভিন্ন বাহিনীর খেলোয়াড়?

কাফি : যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা খুব ভালোমানের জিম আছে। যখন ওদের কন্ডিশনিং ক্যাম্পের প্রয়োজন হয় তখন ওরা আমার কাছে যশোরে আসে। তাছাড়া শিরিন তো এখনো সেই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্রী। ফিটনেস উন্নতির জন্য ট্র্যাক বা মাঠের তেমন প্রয়োজন হয় না। আমরা জিমেই বেশি কাজ করি। ট্র্যাকে যখন ট্রেনিং প্রয়োজন হয়, তখন শিরিনকে বিকেএসপি পাঠিয়ে দিই। বিকেএসপিও ওকে বিশেষ সুযোগ দিয়েছে ট্রেনিং করার। আর ও যেহেতু দীর্ঘদিন আমার অধীনে আছে, আমার সব ভাষাই ও বোঝে। দূর থেকে বললেও সে বোঝে। দূরে থাকলে বিভিন্ন সেশনের ভিডিও করে ও আমাকে পাঠায় আমি সেগুলো দেখে যদি কিছু ঠিক করতে হয় বলে দিই। আসলে চেষ্টা, একাগ্রতা আর অধ্যবসায়ের কারণেই শিরিন সবার সেরা।

শিরিন সেই ছোটবেলা থেকেই আপনার কাছে আছে। আপনাদের সম্পর্কটাও তো অন্যরকম?

কাফি : ওর সঙ্গে আসলে আমাদের একটা পারিবারিক সম্পর্কের মতোই হয়ে গেছে। বলতে পারেন ও আমার মেয়ের মতো।

ইসমাইল জানালেন, ভার্চুয়ালি আপনার টিপস নিয়ে নিজেকে এই মিটের জন্য প্রস্তুত করেছে...

কাফি : গত বছর জুলাইয়ে জাতীয় দলের একটা ক্যাম্প হয়েছিল। তবে দুই মাস হওয়ার পর দেশের সার্বিক পরিস্থিতির করণে তা বন্ধ হয়। তখন থেকে ইসমাইল ভার্চুয়ালি আমার সিডিউল ও টেকনিক্যাল সেশনে নিজেকে প্রস্তুত করেছে। ক্যাম্প বন্ধ হওয়ার পর ইসমাইল আমাকে বলল স্যার এতদিন

কষ্ট করালেন, এখন যদি ছেড়ে দেন তাহলে তো ফিটনেস নষ্ট হয়ে যাবে। তখন আমি তাকে তার সংস্থার কোচদের থেকে অনুমতি নিতে বলি। সে সেটা নিয়ে আমার কথা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ নিয়ে এবার দ্রুততম মানব হয়েছে।

ব্যক্তিগতভাবে এই স্প্রিন্টারদের কোচিং করান। এদের কাছ থেকে তো বেতনও পান?

কাফি : ভুল কথা। আমি একেবারে বিনে পয়সায় কোচিং করাই। যে আমার কাছে সহায়তা চায় কারও কাছ থেকে কোনো পয়সা নিই না। দেখেন, আমি ভালো একটা চাকরি করি। আর বিকেএসপিতে যেহেতু দীর্ঘদিন কাজ করেছি, নিজেও অ্যাথলেট ছিলাম, কোচিং আমার কাছে একটা নেশা। তাছাড়া কোচিংয়ের শীর্ষ কোর্সগুলো আমার করা আছে। আমি চাই তাদের সহায়তা করতে যাতে দেশের অ্যাথলেটিকস ঘুরে দাঁড়ায়।

আপনি তো অনেকবার জাতীয় দলে কোচিং করিয়েছেন। সেটার অভিজ্ঞতা বলুন।

কাফি : ঘুরেফিরে অনেকবারই জাতীয় দল নিয়ে কাজ করা হয়েছে ঠিক। এটা ভীষণ সম্মানের। যদি বলেন ওই সম্মানটুকুর জন্যই কাজ করি। নইলে এদেশের কোচদের ফেডারেশন থেকে যে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়, সেটা কোনো বিদেশিকে দিলে এক মাসও টিকতে পারবে না।

কেমন সুযোগ-সুবিধা দেয় ফেডারেশন?

কাফি : দৈনিক থাকা-খাওয়ার বাইরে সম্মানী হিসেবে কোচকে দেয় ৫০০ টাকা। অথচ এখন একজন রাজমিস্ত্রির জোগালির দৈনিক মজুরি এক হাজার টাকা! আর জাতীয় দলের ক্যাম্পে থাকা অ্যাথলেটদের ৫০০ টাকার খাবার আর ১০০ টাকা দৈনিক হাত খরচা দেওয়া হয়। বর্তমান সময়ে একজন দিনমজুরের চেয়েও আমাদের দৈনিক ভাতা কম।

মাত্র ৫০০ টাকার খাবার কী সারা দিনের জন্য?

কাফি : হ্যাঁ। খেলোয়াড়দের একটা মিটের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সময়টায় পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি সাপ্লিমেন্টও খেতে হয়। এই টাকায় কোনোভাবেই সেটা সম্ভব নয়। ওরা বিভিন্ন সংস্থায় আছে বলেই নিজেদের টাকা দিয়ে খাবার কিনে খায়।

এদের কাছ থেকেই আমরা পদক আশা করি?

কাফি : দেখুন বললেই এখন আর এসএ গেমসে পদক জেতা সম্ভব নয়। এরজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। যেটা আমাদের ফেডারেশনের কখনই থাকে না। বর্তমান কমিটির সভাপতি নিজে খেলোয়াড় ছিলেন। তিনি জানেন, কীভাবে উন্নতি করা যায়। তাই একটু আশাবাদী। তাছাড়া বিকেএসপি যদি আরও একটু দায়িত্ব নেয়, তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভালো করা সম্ভব।

বিকেএসপি তো এমনিতেই অনেক করে অ্যাথলেটিকসের জন্য?

কাফি : তারা অনেক করে বলেই এখনো খেলাটা টিকে আছে। তবে তাদেরও একটা বাধ্যবাধকতা আছে। উচ্চমাধ্যমিকের পর ছাত্রদের বিকেএসপি ছাড়তে হয়। তখন এই ছেলে-মেয়েদের অনেকেই আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। খুব যারা ভালো তাদের হয়তো বিভিন্ন সংস্থা নেয়। বাকিরা ঝরে পড়ে। তাই যদি বিকএসপির একটা এলিট প্যানেল থাকে, যেখানে উচ্চমাধ্যমিকের পরও সেরারা দীর্ঘ সময় প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবে এবং বিকেএসপির বাইরেও প্রতিভাবানদের এনে ভালোমানের সুযোগ-সুবিধা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এটা করতে পারলে আমরা রেজাল্ট পাব।

এ ছাড়া ভালো করার উপায় কী?

কাফি : স্কুল-কলেজ পর্যায়ে খেলা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। আর অন্যান্য খেলার মতো যদি ক্লাব টুর্নামেন্ট করা যায়, তবে খেলোয়াড়রা একটা আর্থিক নিরাপত্তা পাবে। বাহিনীতে সেরারা খেলে। দ্বিতীয় স্তরের অ্যাথলেটরা তখন ক্লাবগুলোতে খেলতে পারবে। সেখানে যারা ভালো করবে তাদের বাহিনী ও সংস্থাগুলো তুলে নিতে পারবে। আর কোচিং কোর্স বাড়াতে হবে। প্রান্তিক পর্যায়ে কোচদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অভিজ্ঞ করে তুলতে হবে। এখন যেভাবে চলছে, সেভাবে এসএ গেমসেও আমরা ভালো করতে পারব না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত