মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দাবিতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন যারা, বায়ান্নর সেই শহীদদের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্মরণ করেছে জাতি।
মাতৃভাষার চেতনা সমুন্নত রাখার প্রত্যয়সহ যথাযথ মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মাধ্যমে নানা আয়োজনে গতকাল শুক্রবার দেশ জুড়ে পালিত হয়েছে মহান একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক
মাতৃভাষা দিবস। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের ভিন্ন প্রেক্ষাপটে স্মৃতির মিনারে ফুলেল শ্রদ্ধায় ভাষাশহীদদের স্মরণ করেছে দেশবাসী।
একুশের প্রথম প্রহরে ঘড়ির কাঁটায় বৃহস্পতিবার রাত ১২টা ১ মিনিটে রাজধানী ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শুরু হয় এ শ্রদ্ধা নিবেদন। এরপর সারা দিন দেশের সব শহীদ মিনার ভরে ওঠে শ্রদ্ধার ফুলে।
প্রভাতফেরি, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ সারা দেশের শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ, ভাষাশহীদদের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন, কালো ব্যাজ ধারণ, শহীদদের স্মরণ এবং আলোচনা সভাসহ নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে রাজধানীসহ সারা দেশে দিবসটি পালিত হয়। জাতীয় জীবনে এ দিবসটি শোক ও বেদনার। অন্যদিকে মায়ের ভাষার অধিকার আদায়ের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত। ১৯৫২ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে পূর্ববাংলার (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ছাত্র ও যুবসমাজসহ সর্বস্তরের মানুষ সে সময়ের শাসকগোষ্ঠীর চোখ রাঙানি ও প্রশাসনের ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসে। ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিকসহ আরও অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। গতকাল ছিল মাতৃভাষার জন্য আন্দোলনের ৭৩ বছর।
একুশের প্রথম প্রহরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষাশহীদদের উদ্দেশে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে একুশের কর্মসূচি শুরু হয়। ভাষাশহীদদের প্রতি পৃথকভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। রাত ১২টার পর প্রথমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতি। এরপর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টা ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এর আগে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টাকে স্বাগত জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা শ্রদ্ধা নিবেদনের পর প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিরা, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন, সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
এরপর অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান ফুল দিতে আসেন শহীদদের বেদিতে। তারপর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে একে একে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলমসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানরা।
এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খানের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার শ্রদ্ধা জানায়। এ ছাড়া জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আহতরা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও সিন্ডিকেটের সদস্যরা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীরা এবং বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন শ্রদ্ধা জানায়। তারপর সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার উন্মুক্ত করা হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রভাতফেরিসহ হাতে ফুল এবং মুখে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ সুর তুলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আসতে থাকেন শ্রদ্ধা জানাতে। শ্রদ্ধা জানাতে আসে শিশুরাও। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা শহীদবেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানান। একপর্যায়ে ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় শহীদ মিনারের বেদি। বিএনপি এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলো, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিরা, জাতীয় নাগরিক কমিটি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে আসেন।
রাত ১টা ৩৫ মিনিটে শ্রদ্ধা জানায় জাতীয় নাগরিক কমিটি। আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং সদস্য সচিব আখতার হোসেনের নেতৃত্বে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের সময় আরও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, মুখপাত্র সামান্তা শারমিনসহ অনেকে। ১টা ২৭ মিনিটে মুখপাত্র উমামা ফাতেমার নেতৃত্বে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
১২টা ৪৫ মিনিটে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে ছাত্রদল। সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরের নেতৃত্বে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।
বাঙালি জাতিসত্তার প্রাথমিক স্তম্ভ ২১ ফেব্রুয়ারি : একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, ‘বাঙালি জাতিসত্তার একটি প্রাথমিক স্তম্ভ একুশে ফেব্রুয়ারি। একাত্তর-উত্তর রাষ্ট্র গঠনের মৌলিক এবং অন্যতম অনুপ্রেরণা একুশে।’ তিনি আরও বলেন, ‘একুশের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে এক আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে আমার। কারণ আমার মা একজন ভাষাসৈনিক ও ভাষাকন্যা।’
একুশের চেতনা রুখবে ‘ফ্যাসিজম’র উত্থান : গতকাল সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নেতৃত্বে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন দলটির নেতাকর্মীরা। পরে রিজভী সাংবাদিকদের বলেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনা অমøান, এ চেতনা কোনোদিন মøান হবে না। যদি আবারও দেশে কোনো ফ্যাসিজমের উত্থান ঘটে, কোনো ধরনের ডিক্টেটরের (স্বৈরাচার) উত্থান ঘটে, তবে একুশের চেতনা বুকে ধারণ করে এ দেশের জনগণ আবারও রাজপথে লড়াইয়ে নামতে উদ্বুদ্ধ হবেন।’ এ সময় দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আমানউল্লাহ আমান, আবদুস সালাম, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহেল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে ভোর সাড়ে ৬টায় নিউ মার্কেটের কাছে বলাকা সিনেমা হলের সামনে থেকে প্রভাতফেরিসহ আজিমপুর কবরস্থানে যান বিএনপি নেতাকর্মীরা। সেখানে ভাষাশহীদদের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং ফাতেহা পাঠ করেন তারা।
ঢাকার পাশাপাশি সারা দেশে প্রথম প্রহরেই শহীদ মিনারে শুরু হয় শ্রদ্ধা জানানোর পালা, ফুলে ফুলে ভরে উঠতে শুরু করে স্মৃতির মিনার।
খুলনায় শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রথম প্রহরে নগরীর শহীদ হাদিস পার্কের শহীদবেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে দিবসটির বিভিন্ন কর্মসূচির সূচনা হয়। সকালের আলো ফুটতে না ফুটতেই হাজার হাজার মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় ফুলে ফুলে ভরে ওঠে শহীদবেদি। সকালে প্রভাতফেরি, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং দোয়া মাহফিলসহ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচিতে দিবসটি পালিত হয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কেডিএসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পৃথকভাবে আলোচনা সভা, শোভাযাত্রা, দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে।
সিলেট নগরীর চৌহাট্টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একুশের প্রথম প্রহর থেকে শুরু হয় শ্রদ্ধা নিবেদন। পরে সকাল থেকেও নানা শ্রেণি-পেশার বিপুলসংখ্যক মানুষ শহীদ মিনারে গিয়ে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন দিবসটি উপলক্ষে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রথম প্রহরে বরিশালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষাশহীদদের প্রতি প্রথম শ্রদ্ধা জানান বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রায়হান কাওছার। এরপর প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
