কথার রাজা মাঠের প্রজা

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৭:২১ এএম

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সংবাদ সম্মেলনগুলো খুব প্রাণবন্ত হয়। অনেক প্রশ্ন, অনেক সম্ভাবনার আশ্বাস জাগানো উত্তর; কিন্তু দিনশেষে ফল শূন্য। আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলতে দেশ ছাড়ার আগে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত বলেছিলেন শিরোপা জয়ের লক্ষ্যের কথা, তার আগে কোচ ফিল সিমন্সও শুনিয়েছিলেন একই গল্প। তবে ভারত এবং নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুটো ম্যাচে অসহায় আত্মসমর্পণ হাওয়ায় মিলিয়ে দিয়েছে সে সব কল্পকথা। টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেওয়ার পরও নিয়মরক্ষার ম্যাচ খেলার জন্য আরও দিনদুয়েক তাদের থাকতে হচ্ছে ইসলামাবাদে। হয়তো দুবাইয়ের মতো এখানেও কোনো বিখ্যাত রেস্তোরাঁয় নৈশভোজের আড্ডায় মেতে উঠতে দেখা যাবে তাদের। কারণ কোনো জবাবদিহিই যে নেই!

মাঠের খারাপ পারফরম্যান্সের জন্য কোনো জবাবদিহি না থাকলেও, সাংবাদিকদের প্রশ্নে বেশিরভাগ ক্রিকেটারেরই ‘হাজির জবাব’। বক্রোক্তিমূলক উত্তর থাকে ঠোঁটের ডগায়। ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ব্যাটিং ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন করায় শান্ত বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়, আপনারা যারা আছেন, আপনাদের চেয়ে আমরা হয়তো একটু বেশি জানি, কোন উইকেটে কোন শট খেলতে হবে। এখন আমি যদি আপনার জায়গায় বসে প্রশ্ন করা শুরু করি, হয়তো প্রশ্ন ভুল হবে। তো এটা একটা বোকামি।’ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির দলে না থাকা লিটন দাসও কথার খেলায় কম পারদর্শিতা দেখাননি। তার ব্যাটিং গড় ২৪, এই নিয়ে চিন্তিত কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, ‘কত করলে ফর্মে থাকব, এটা একটু বলেন তো। ২৫-২৬ (গড়) একেবারেই খারাপ না। ক্রিকেট একটা সিরিজ ভালো যাবে, আরেকটা সিরিজ খারাপ যাবে। তিন ফরম্যাট খেলছি, একটা ফরম্যাট খারাপ যেতেই পারে। বাড়তি কোনো চাপ নেই।’ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের দশম বর্ষে পা রেখেছেন লিটন, খেলেছেন দুটো বিশ্বকাপ। ওয়ানডের গড় তারপরও ৩০, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বছর তিনেকের উপস্থিতিতেই হ্যারি ব্রুক, রাচিন রবীন্দ্ররা যে হারে রান করছেন, তাতে এখনো নিজের নামের পাশে তরুণ এবং প্রতিভাবান শব্দগুলো শুনলে লিটনের লজ্জাই পাওয়া উচিত।

বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা কথার খেলাটা রপ্ত করেছেন সাকিব আল হাসানের কাছ থেকে। ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ সময় জুড়েই সংবাদ সম্মেলনে চাঁছাছোলা শব্দ আর প্রশ্নের উত্তরে পালটা প্রশ্নের খেলায় মেতেছিলেন এই অলরাউন্ডার। মাঠের সাকিবকে ‘আইডল’ মানা অনেকেই রপ্ত করেছেন মাঠের বাইরের অভ্যাসও। শুধু পার্থক্য হচ্ছে সাকিব কথার খেলার পাশাপাশি মাঠের খেলাতেও পারদর্শী ছিলেন, কিন্তু তার উত্তরসূরিদের আচরণে ব্যাধিরই সংক্রমণ হয়েছে, স্বাস্থ্যের হয়নি। তাই বেশিরভাগ ক্রিকেটারই ‘মুখেন মারিতং জগত’, বাস্তবে তারা কেবল অশ্বডিম্বই প্রসব করে চলেছেন।

মুশফিকুর রহিম এবং মাহমুদউল্লাহর অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন হয় না, এমন সংবাদ সম্মেলন কমই হয়। অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে অনভিজ্ঞ দলের কাছে হারের দৃষ্টান্তও অবশ্য কম নয়। সমালোচনা হলে সমালোচকদের আয়নায় মুখ দেখার পরামর্শ দিয়েছিলেন মুশফিক, পুঁচকে পাপুয়া নিউগিনির বিপক্ষে জয়ের পর মাহমুদউল্লাহ ক্রিকেটারদের আত্মত্যাগ বোঝাতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘দিনের পর দিন পেইন কিলার খেয়েই আমরা খেলি। হয়তো অনেকেই এগুলো জানেন না।’ তবে মাহমুদউল্লাহ হয়তো জানেন না, চোট আঘাত নিয়ে খেলে দলের পারফরম্যান্স নামিয়ে আনার চেয়ে শতভাগ সুস্থ কাউকে সুযোগ দেওয়াটাই উত্তম। অবশ্য এই সংস্কৃতিই যে তৈরি হয়নি। কারণ মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা তার চোটকে পুঁজি করেই হয়েছেন কিংবদন্তি। প্রতিটা ম্যাচের আগেই তাকে পাওয়া নিয়ে যে অনিশ্চয়তা, ম্যাচ জয়ের পর চোট উপেক্ষা করে খেলার মাহাত্ম্য এ সবের প্রচারই তাকে দিয়েছিল অতিমানবের তকমা। সেই জনপ্রিয়তার জোরেই খেলার মাঠ থেকে সংসদে পৌঁছে যান মাশরাফী, এক সময় দেশের সম্ভাব্য ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবেই তাকে দেখছিলেন অনেকে। অথচ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে পতিত স্বৈরাচারের দোসর আর কারচুপির ভোটের সাংসদ মাশরাফী এখন যাপন করছেন নিভৃত জীবন। তাকে ঘিরে নেই অজস্র মাইক্রোফোন আর ক্যামেরা।

এমন একটা দলের নেতৃত্বের উত্তরাধিকার পেয়েছেন শান্ত। তারও ব্যাটের চেয়ে মুখ বেশি চলবে, এটাই স্বাভাবিক। দেশ ছাড়ার আগে সংবাদ সম্মেলনে সাকিবকে নিয়ে প্রশ্ন করায় শান্ত জবাব দিয়েছিলেন, ‘এই প্রশ্নটা আপনি কেন করলেন আমি জানি না। আমরা সবাই জানি, এই উত্তর অনেক খেলোয়াড় দিয়েছে। অবশ্যই আমরা সাকিব ভাইকে মিস করব। উনি থাকলে ভালো হতো। এই প্রশ্নের উত্তর আপনারা অনেকবার পেয়েছেন। তাই আমার মনে হয় না, এত বড় একটা টুর্নামেন্টে যাওয়ার আগে এই প্রসঙ্গে কথা বলাটা যৌক্তিক হবে।’

তবে নিউজিল্যান্ডের কাছে হারের পর খুব সম্ভবত বাস্তবের দুনিয়ায় ফিরে এসেছেন শান্ত। বুঝতে পেরেছেন দলের সামর্থ্য কতখানি আর বাকিদের সঙ্গে পার্থক্যটাও। তাই তো সামনের দিনে ব্যাটিংয়ে কিছু পরিবর্তন আনার কথাও বলেছেন ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে, ‘আমাদের ব্যাটিং ইউনিট এবং ফিল্ডিং সাইড হিসেবে আরও উন্নতি করতে হবে, এই কথাটা আমি অনেকবার বলেছি। কিন্তু সেই একই ভুল আমরা করেই চলেছি। আমাদের ব্যাটিং আরও কীভাবে উন্নত করা যায় সেদিকে আমাদের অনেক অনেক মনোযোগ দিতে হবে। আশা করছি এই টুর্নামেন্টের পর আমাদের ব্যাটিং ইউনিটে কিছু পরিবর্তন আনব আর উন্নতির জন্য ভিন্নভাবে চিন্তা করব, চেষ্টা করব ব্যাটিংয়ের উন্নতি করার।’

অবশ্য এ সবও কথার কথা। চ্যাম্পিয়নস ট্রফি থেকে দেশে ফিরেই ক্রিকেটাররা ব্যস্ত হয়ে পড়বেন ঢাকা লিগ খেলতে। কোনো বিদেশি ক্রিকেটারবিহীন, একপেশে, পক্ষপাতযুক্ত আম্পায়ারিং, রাজনৈতিক প্রভাবযুক্ত দল আর ক্লাব কাউন্সিলরের রাজনীতির এই আসরে চৈত্রের গরমে রোজা রেখে খেলবেন ক্রিকেটাররা। সেখানেই একগাদা রান করবেন কেউ কেউ, এর মাধ্যমেই ব্যাটিংয়ের উন্নতি খোঁজার চেষ্টা চলবে!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত