ব্যাংক থেকে লুটেরা গোষ্ঠীর লুটপাটের তথ্য আওয়ামী শাসনামলের ১৬ বছরে আড়াল করে রাখা হয়েছিল। নামে-বেনামে নেওয়া বিপুল পরিমাণ ঋণ অনেক আগেই খেলাপি হয়ে পড়েছিল। কিন্তু অবলোপন ও বারবার পুনঃতফসিলীকরণের মাধ্যমে এসবকে নিয়মিত দেখানো হচ্ছিল। রাজনৈতিক পট বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশিত হচ্ছে লুটপাটের প্রকৃত চিত্র। বর্তমানে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ প্রায় সাড়ে তিন লাখ কোটির কাছাকাছি চলে গেছে। গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংক আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছেন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। এ সময় ডেপুটি গভর্নরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ২০ দশমিক ২ শতাংশ। আলোচ্য সময় শেষে ব্যাংক খাতের ঋণস্থিতি ছিল ১৭ লাখ ১১ হাজার ৪০২ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকে মোট বিতরণ করা ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার কিছুটা বেড়েছে। এই হার আগের প্রান্তিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর) থেকে কিছুটা বেড়ে হয়েছে ৪২ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে এই হার ১৫ দশমিক ৬০ শতাংশ।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘আগেই বলেছিলাম, খেলাপি ঋণ বাড়বে। তবে এখনো খেলাপি ঋণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে বা চূড়ায় পৌঁছায়নি। ব্যাংক থেকে আমানতকারীদের টাকা পেতে কোনো সমস্যা হবে না। ব্যাংক থাকুক বা না থাকুক আমানতকারীরা টাকা ফেরত পাবেন। কোনো ব্যাংক দুর্বল থাকবে না। প্রয়োজনে এক ব্যাংকের সঙ্গে অন্য ব্যাংক মার্জ বা একীভূত করা হবে। দুর্বল ব্যাংকগুলো সবল করার চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে রেজুলেশন অ্যাক্ট খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। সেটা পাস এবং বাস্তবায়ন হলে ব্যাংক খাতে পুরোপুরি স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। যা ওই সময়ের মোট ঋণের ৯ শতাংশ। এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে এক লাখ ৯৯ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা।
খেলাপি ঋণ এত বাড়ার কারণ জানতে চাইলে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিগত সরকারের সময় খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা পরিবর্তন করে এটির পরিমাণ কম দেখানো হচ্ছিল। বর্তমান গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকৃত চিত্র তুলে আনার চেষ্টা করছেন। যে কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। তবে এখনো অনেক প্রচ্ছন্ন খেলাপি ঋণ প্রকাশ্যে আসেনি। সেগুলো হিসাবের আওতায় এলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৫ থেকে ২৬ শতাংশে পৌঁছে যেতে পারে।’
এমন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একটি সংস্কার কমিশন হয়েছে। সে কমিশন যে রিপোর্ট দেবে সেটি আমলে নিয়ে এ খাতে ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে যেসব আইনকানুনের ফাঁকফোকর দিয়ে বিগত সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে একটি মহল ব্যাংক খাতে লুটতরাজ করেছে, সেসব আইন সংশোধন করতে হবে। টাস্কফোর্স প্রতিবেদন ও শ্বেতপত্রেও এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।’
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন সরকার গঠন করে, তখন মোট খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। এর পর থেকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলছে। অর্থনীতিবিদরা অনেক দিন ধরেই অভিযোগ করছেন, তৎকালীন সরকারের ছত্রছায়ায় ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাট হয়েছে, যার একটা বড় অংশই বিদেশে পাচার হয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র বের হতে শুরু করেছে। সাবেক সরকারের আমলে ব্যাংক থেকে প্রভাবশালীদের বড় অঙ্কের ঋণ দিতে নানা সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ কাগজে-কলমে কম দেখাতে নেওয়া হয়েছিল একের পর এক নীতি। সরকার পরিবর্তনের পর সেই নীতি থেকে সরে এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ ও সমালোচিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হওয়া ব্যাংকগুলো ঋণের প্রকৃত চিত্র দেখাতে শুরু করেছে। তাদের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেশি বেড়েছে। একইভাবে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণও বেশ বেড়েছে। পাশাপাশি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তৎকালীন উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপ, এস আলমসহ আরও কিছু বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ঋণখেলাপি হয়ে পড়েছে। এতেও বেড়েছে খেলাপি ঋণ।
গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, ‘ব্যাংক খাত যেমন টিকে আছে ব্যবসায়ীদের কারণে আবার এ খাতকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে ঢালাওভাবে সব ব্যবসায়ীকে দোষারোপ করা ঠিক হবে না। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর কৌশলে লুকিয়ে রাখা খেলাপি ঋণের তথ্য বের হয়ে আসছে। এছাড়াও অবলোপন, পুনঃতফসিল ও আদালতে চলমান মামলার ঋণের পরিমাণ যুক্ত হলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বাড়বে। ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ঋণ নিয়ে একটি কোম্পানি চালু করে সেটি দেখিয়ে আরেকটি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এভাবে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান তৈরি করে দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করেছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোতে সীমাহীন দুর্নীতি হয়েছে। কাজেই ব্যবসায়ী এবং ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কেউ এর দায় এড়াতে পারেন না।’
