ডায়াবেটিস সচেতনতা দিবস

জলবায়ু পরিবর্তন ও ডায়াবেটিসের বিস্তার

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৪:৫১ এএম

দেহে বহু ব্যাধির আহ্বায়ক, নীরব ঘাতক রোগ ডায়াবেটিসের অব্যাহত অভিযাত্রায় শঙ্কিত সবাইকে এটি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে যথাসচেতন করে তুলতেই অন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশন আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৯১ সাল থেকে ১৪ নভেম্বরকে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস হিসেবে পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। আর বাংলাদেশ ২৮ ফেব্রুয়ারিকে ডায়াবেটিস সচেতনতা দিবস হিসেবে পালন করছে। বিগত শতাব্দীর শেষার্ধে সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে গোটা বিশ^ উঠে পড়ে  লেগেছিল। গুটিবসন্ত কলেরা যক্ষ্মা ম্যালেরিয়ার মতো মহামারী নির্মূলে তারা সফল হলেও, অ-সংক্রামক ব্যাধি ডায়াবেটিসের বিস্তার রোধ ও নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তি সচেতনার অনিবার্যতা এবং এর জন্য সুপরিকল্পিত সর্বজনীন উদ্যোগ গ্রহণে তৎপর হয়। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাগ্রহণের আবশ্যকতায় ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান সমস্যা ও সীমাবদ্ধতাগুলোর প্রতি বিশ্ব দৃষ্টি আকর্ষণ এবং সব সরকার ও জনগণের পক্ষে সংহত ও সমন্বিত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে ঐকমত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই বাংলাদেশ ২০০৬ সালে জাতিসংঘকে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণকল্পে প্রস্তাব গ্রহণের আহ্বান জানায়। মূলত বাংলাদেশের প্রস্তাবে এবং যৌক্তিকতার প্রচারণা-প্রয়াসে ১৪ নভেম্বরকে প্রতিষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস হিসেবে ঘোষণা দিয়ে জাতিসংঘ ২০০৭ সালে  ৬১/২২৫নং প্রস্তাব গ্রহণ করে। সেই থেকে জাতিসংঘের সব সদস্য দেশে, বিশ্ব ডায়াবেটিক ফেডারেশনের দুশর অধিক সদস্য সংগঠনে, বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য সংস্থা কোম্পানি পেশাজীবী সংগঠন ও ডায়াবেটিস রোগীদের মাঝে ডায়াবেটিস দিবস নানান প্রাসঙ্গিক প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে উদযাপিত হচ্ছে এবং জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রসঙ্গটি উঠে এসেছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নিরিখে।

ঘাতকব্যাধি ডায়াবেটিস ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা মানুষের  জন্য প্রধানতম ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে এবং দেবে। জলবায়ুর পরিবর্তনে ঘটে খরা, সুপেয় পানির দুষ্পাপ্যতা এবং ডিহাইড্রেশন। এর ফলে শরীরচর্চার সুযোগ সীমিত হয় বা শারীরিক শ্রমে বাধাগ্রস্ততা সৃষ্টি হয়, যা প্রকারান্তরে ডায়াবেটিসের প্রকোপ বাড়ায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষুধা ও দরিদ্রতা বৃদ্ধি পায়। এমতাবস্থায় সবাইকে, বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলাদের এমন পুষ্টিহীনতায় পেয়ে বসে যে, তার গর্ভের সন্তানেরও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। যারা টাইপ-২ ডায়াবেটিসে ভোগেন তাদের ওষুধ, সুষম খাবার সংগ্রহ ও শরীরচর্চায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। নগরায়ণ ও জনসংখ্যা আধিক্যের কারণে স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান খাদ্যাভ্যাস অবলম্বন করা সম্ভব না হওয়ায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ডায়াবেটিস বৃদ্ধি পায়। উন্নয়নের অভিঘাতে নগরজীবনে ব্যস্ততা বাড়ে, হাঁটাচলার পথঘাট সংকুচিত হয়, বাসায় তৈরি সুষম খাবারের চেয়ে ফাস্ট ফুডসহ বাইরের খাবার গ্রহণ থেকে শুরু করে সর্বত্র একটা কৃত্রিমতা এসে ভর করে। এর ফলে সুষম খাদ্য গ্রহণ ও শরীর চর্চার ব্যাঘাত ঘটে শরীর মেদবহুল ও স্থুলকায় হয়ে যায়। এটিই ডায়াবেটিস হওয়ার অন্যতম কারণ।

বিশ্বব্যাপী উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে জলবায়ুর যে পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে তার সঙ্গে ডায়াবেটিসের বিস্তারের আন্তঃসম্পর্কটি ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বাতাসে নিঃসৃত কার্বনের পরিমাণ বেড়ে গিয়ে পরিবেশগত সমস্যায় জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটার প্রমাণ এখনই মিলছে। ২০৫০ সালের মধ্যে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ ৫২ শতাংশে বৃদ্ধি পেয়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও ভয়াবহরূপে বাড়িয়ে পৃথিবীকে বাসের অযোগ্য করে তুলতে পারে। ধনী দেশগুলো সবচেয়ে বেশি গ্যাস নিঃসরণ করলেও দরিদ্র দেশগুলো এর প্রতিক্রিয়া ভোগ করে বেশি। এ অবস্থার প্রতিকার না হলে প্রতি তিন বছরে জিডিপির ৫-২০ শতাংশ অর্থ ব্যয়িত হবে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায়। এর ফলে পুষ্টিহীনতা, সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের বিস্তার, দারিদ্র্য ও বৈষম্য বৃদ্ধি পাবে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলেও জলবায়ুর পরিবর্তন ত্বরান্বিত হচ্ছে। দ্রুত ও দুর্বল নগরায়ণের ফলে বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যা এখন শহরে বাস করে। এখানে আছে যন্ত্রচালিত পরিবহন ব্যবস্থা, চলছে বিস্তর বিস্তার, শরীর চর্চাবিহীন যাপিত জীবনে বাড়ছে বয়োবৃদ্ধ জনসম্পদ, হচ্ছে বনজ প্রাকৃতিক সম্পদ উজাড়, প্রাণিজ ও সুষম খাদ্যের জায়গা দখল করছে কলকারখানায় প্রক্রিয়াজাত কৃত্রিম অস্বাস্থ্যকর খাবার, পরিবর্তিত হচ্ছে আহার প্রক্রিয়া, বাড়ছে বিশ^খাদ্য কৃষির ব্যবসা ও বিপণনে প্রতিযোগিতা। ২০৩০ সালের মধ্যে ৮ বিলিয়ন বিশ্ব জনসংখ্যার ৫ বিলিয়ন বাস করবে শহরে, যাদের মধ্যে ২ বিলিয়নই বাস করবে বস্তিতে। ফলে জীবনযাত্রায় জটিলতা বাড়তেই থাকবে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা নানান অনিয়ম ও ব্যবস্থাপনার কাছে নতি শিকার করতে বাধ্য হবে। ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্ব জনসংখ্যা ৭ থেকে ৯ বিলিয়নে বৃদ্ধি পাবে এবং এশিয়া ও আফ্রিকাতেই ঘটবে এর ব্যাপক বিস্তার। সার্বিকভাবে বিশ^ জনসংখ্যায় প্রবীণের প্রাধান্য পেলেও উন্নয়নশীল দেশে নবীনের পাল্লা হবে ভারী। জনমিতিতে এহেন অসম পরিবর্তন প্রবণতায় ইতিমধ্যে সম্পদের অপ্রতুলতায় পরিবেশ দূষণে, নানান রোগের প্রাদুর্ভাবে ও বিস্তারকে প্রভাবিত করছে। এ পটভূমিতে বর্তমানে বিশে^ ৩৬৬ মিলিয়ন মানুষ ডায়াবেটিসে ভুগছে। ২০৩০ সাল নাগাদ এর পরিমাণ অর্ধ বিলিয়নে দাঁড়াবে। বছরে ৪.৬ মিলিয়ন মানুষ এ রোগে মারা যায়। ডায়াবেটিসে সবচেয়ে বড় ক্ষতি কর্মক্ষমতা হারানো, এ রোগের পেছনে বার্ষিক ব্যয় হয় ৪৬৫ বিলিয়ন মা. ড.। ৫ জনের মধ্যে ৪ জন ডায়াবেটিস রোগী বাস করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে। এ রোগ পরিবারকে অসচ্ছল করে, শ্রমশক্তি বিনষ্ট করে এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে পর্যুদস্ত করে। রিও-২ খ্যাত জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন সংক্রান্ত বিশ্ব সম্মেলনে এ বিষয়টি প্রতিভাত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, স্বাস্থ্যই অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাবিকাঠি এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিবেচনাই টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত। আর্থসামাজিক ও পরিবেশগত বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনায় এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, স্বাস্থ্যই সকল সুখ বা উন্নয়নের হাতিয়ার। সুতরাং জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন বিধান এবং তার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়ানো উন্নয়নই হবে টেকসই উন্নয়ন। ডায়াবেটিস যেহেতু মহামারী আকার ধারণ করে জনশক্তির, বিশেষ করে গণউৎপাদিকা শক্তির অপচয় এবং একই সঙ্গে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে বর্ধিত ব্যয় নির্বাহে আর্থিক ব্যয়বৃদ্ধি ঘটায়, সেহেতু ডায়াবেটিসকেই শনাক্ত করা হয় বিশ^ অর্থনীতি এবং এর উন্নয়নের জন্য অন্যতম বাধা হিসেবে।

বাংলাদেশে ডায়াবেটিক চিকিৎসা আন্দোলনের পথিকৃৎ প্রাণপুরুষ জাতীয় অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম (১৯১৭-১৯৮৯) ১৯৫৬ সালে  সেগুনবাগিচায় নিজের বাসভবনের আঙিনায় ছোট টিনের ঘরে দেশের ডায়াবেটিস চিকিৎসার যে উদ্বোধন ঘটিয়েছিলেন আজ তার সেই প্রতিষ্ঠান, জাতির গর্বের প্রতীক ‘বারডেম’। বারডেম এশীয় প্রশান্ত অঞ্চলে ডায়াবেটিস চিকিৎসার মডেল বা সেরা কেন্দ্র এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৮২ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠানটিকে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও  নিয়ন্ত্রণ এবং গবেষণার ক্ষেত্রে তাদের একান্ত সেরা সহযোগী সংস্থা হিসেবে

স্বীকৃতি, সম্মান ও সমীহ করে আসছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ রোগ থাকতে এ রকম একটা মাইনর রোগ নিয়ে তিনি আলাদা চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করতে চান কেন। সে সময় প্রায়ই এ ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন  হলে ডা. ইব্রাহিম বলতেন, ‘রোগটা মোটেই মাইনর নয়। যেদিন কারও ডায়াবেটিস হবে, সেদিনই বুঝতে হবে যে, একসময় ওই লোকটা অন্ধ হয়ে যাবে কিংবা প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হবে। এমনকি তার হার্ট অ্যাটাকও হতে পারে। কিন্তু যদি যথারীতি চিকিৎসা ও পরিচর্যার ভেতর তাকে রাখা যায়, তাহলে আজীবন সে সুস্থ থাকবে। রোগীর হয়তো ত্রিশ-চল্লিশ বছর, কিন্তু এই রোগের ফলে দশ বছরের মধ্যেই তার সবকিছু অকেজো হয়ে যাবে। তবে যথারীতি চিকিৎসা ও পরিচর্যা করলে এবং নিয়ম মেনে চললে সে ষাট বছর পর্যন্ত সুস্থ থাকবে এবং প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে।’ এ প্রসঙ্গে উপমা দিয়ে তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘আমরা গাড়ি বিকল হলে তবে গ্যারেজে ঠিক করতে আনি, এটা  বোকামি। সময় থাকতে যদি নিয়মিত মেইনটেন বা চেকআপ করানো হতো, তাহলে হয়তো গাড়ি গ্যারেজে আনার প্রয়োজনই পড়ত না।’ তিনি ব্রত গ্রহণ করেন, ‘দেশের কোনো ডায়াবেটিস রোগীকে বিনা চিকিৎসায় কর্মহীন হয়ে অসহায়ভাবে করুণ পরিণতির দিকে যেতে দেওয়া যাবে না। চিকিৎসা ব্যয়বহনের ভার নিয়ে হলেও সবাইকে এ রোগ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকবে।’ তার এ মিশন ও ভিশনের পতাকা তারই গড়া বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি (বাডাস) দৃঢ় প্রত্যয়ে অত্যন্ত সযতেœ বহন করে চলছে। বারডেমে নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যা এখন চার লাখের বেশি।  প্রতিদিন তিন হাজারের বেশি (এর মধ্যে ৭৫ থেকে ১০০ জন নতুন) রোগী  চিকিৎসাসেবার জন্য এখানে আসে। দেশের প্রায় সব জেলায় বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির অধিভুক্ত শাখা রয়েছে যেখানে স্থানীয়ভাবে স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে অগণিত ডায়াবেটিস রোগী।  উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সরকার সমিতির প্রধান অবকাঠামো নির্মাণে অর্থায়ন করেছে আর সমিতি নিজস্ব উদ্যোগে সেই অবকাঠামোয় তুলে ধরেছে স্বাস্থ্যসেবার ডালি। বাডাস দাতাসংস্থার সাহায্যনির্ভর না হয়ে আয়বর্ধক নানান কর্মসূচি গ্রহণ করে ‘ক্রস ফাইন্যান্সিং’-এর মাধ্যমে স্বয়ম্ভরতা অর্জনে প্রয়াসী-প্রত্যাশী। ডায়াবেটিসের মতো মহামারী নিয়ন্ত্রণে মহতী উদ্যোগের মেলবন্ধন সুস্থ দেশ ও জাতি নির্মাণের দ্বারা  জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি সুনিশ্চিত হবে সন্দেহ নেই।

লেখক: সাবেক সচিব ও চেয়ারম্যান সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত