বাংলাদেশের শুধুই আবেগ; আফগানদের আছে সব

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৫, ১১:২৬ এএম

‘লোকে বলে, আমাদের নাকি কিছুই নেই। স্টেডিয়াম নেই, একাডেমি নেই, সুযোগ সুবিধা নেই... যা সর্বৈব মিথ্যা। আমাদের সবই আছে। আমরা যখন ঘরোয়া ক্রিকেট খেলি, তখন স্টেডিয়ামগুলো ভরা থাকে। ৪০-৫০ হাজার মানুষ ঘরোয়া ক্রিকেট দেখতে মাঠে আসে!’ – চলতি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচের আগে এমনটাই বলেছেন আফগানিস্তান অধিনায়ক হাশমতুল্লাহ শাহিদি।

ক্রিকেট দুনিয়ায় আফগানিস্তান নিয়ে প্রচলিত ধারণা হলো এটা একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। গুলি-বোমার শব্দে ঘুম ভাঙে মানুষের। জীবনের নেই নিরাপত্তা। সেখানে আবার ক্রিকেট মাঠ, একাডেমি, ঘরোয়া লিগ আয়োজন কীভাবে সম্ভব? ভারত কিংবা দুবাইকে হোম গ্রাউন্ড বানিয়ে রশিদ খানেরা স্রেফ মনের জোরে ক্রিকেট দুনিয়ায় শক্তি প্রদর্শন করেন বলেও অনেকের ধারণা। তবে বাস্তবের সঙ্গে এসব ধারণার ন্যূনতম কোনো মিল নেই। আফগানিস্তানের যা আছে, সেটা প্রায় ২৫ বছর ধরে টেস্ট খেলে যাওয়া বিশ্বের চতুর্থ ধনী ক্রিকেট বোর্ড বিসিবিও বাস্তবায়ন করতে পারেনি!

আইসিসি ইভেন্টগুলো সবসময়ই বাংলাদেশের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে আসে। মুফতে পাওয়া একটি-দুটি জয় নিয়েই এদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা আবেগে ভাসে। অন্যদিকে মাত্র সাড়ে সাত বছর আগে টেস্ট মর্যাদা পাওয়া আফগানিস্তান দেখায় নিজেদের শক্তিমত্তা। চলতি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিই এর সবচেয়ে নিকটতম উদাহরণ। শিরোপা জয়ের ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশকে ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। শুনতে হয়েছে বিদ্রুপ। আর আফগানিস্তান দেখছে সেমিফাইনালের স্বপ্ন! কিংবা গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের কথাই ধরুন না। বাঘা বাঘা সব দলকে টপকে আফগানিস্তান উঠে গেল সেমিফাইনালে। আর বাংলাদেশ সেমিফাইনালে ওঠার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও আফগানদের বিপক্ষে লড়াই করার ন্যূনতম চেষ্টা পর্যন্ত করল না! তাহলে কি স্রেফ মানসিকতার কারণে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ? মোটেও না। বরং, আফগান ক্রিকেটের শেকড় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির আনাচে-কানাচে বিস্তৃত।

ঘরোয়া ক্রিকেট দিয়েই শুরু করা যাক। বাংলাদেশে সারা বছরে একটিমাত্র ওয়ানডে আসর হয় ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ। সেটা আবার অনুষ্ঠিত হয় পবিত্র রমজানের সময়। তার ওপর প্রচণ্ড গরমে বোলাররা হাঁপিয়ে যান, অনেক পেসারকে স্পিন বলও করতে দেখা যায়! এত সুবিধা থাকার পরও এখন পর্যন্ত এই লিগকে দিবা-রাত্রির করা যায়নি। অন্যদিকে এক পঞ্জিকাবর্ষে আফগানিস্তানের ঘরোয়া পর্যায়ে মোট ৭টি ওয়ানডে টুর্নামেন্ট হয়ে থাকে, যার একটি আবার বয়সভিত্তিক দলের জন্য। টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট হয়ে থাকে তিনটি। এছাড়া আছে প্রথম শ্রেণির এবং তিন দিনের টুর্নামেন্ট। বাংলাদেশে বিপিএল ছাড়া কোনো টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট নেই বললেই চলে।

আফগানিস্তানে তিনটি হাই পারফরম্যান্স সেন্টার আছে কাবুল, কান্দাহার এবং জালালাবাদে; যেটার পরিকল্পনা দিয়েছিলেন বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল। তবে বুলবুলের নিজের দেশে বিসিবি একাডেমি বলে একটা জিনিস আছে, যেটা আদতে ক্রিকেটারদের থাকার জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয়!

আফগানিস্তানের ক্রিকেট কাঠামোকে পাঁচটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে আমুয়া, বন্দে আমির, বুস্ত, স্পিন ঘর এবং মিস আয়নাক। প্রতিটি আঞ্চলিক দলের নিজস্ব হোম গ্রাউন্ড আছে। সবগুলো প্রদেশে আলাদা করে তিন ফরম্যাটের ক্রিকেট লিগ হয়। ২০২২ সালের একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সেবার মোট ৫৩৮টি ক্লাব অংশ নিয়েছিল ইন্টার ক্লাব ক্রিকেট কম্পিটিশনে। নিবন্ধন করেছিলেন প্রায় ৮ হাজার ক্রিকেটার। এই টুর্নামেন্টের সেরা পারফরমারদের নিয়ে তৈরি হয় প্রাদেশিক দলগুলো। পরের ধাপ আঞ্চলিক টুর্নামেন্ট। সেখানেও আছে প্রতিযোগিতা। ২৯টি প্রদেশের দল ৬টি গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলে ওয়ানডে ফরম্যাটের ওয়াজির মোহাম্মদ ‘গ্রেড-২’ টুর্নামেন্টে। প্রত্যেক গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন দল ‘গ্রেড-১’ টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ পায়। অর্থাৎ জাতীয় দলে আসতে একজন আফগান ক্রিকেটারকে অনেকগুলো ধাপ পেরিয়ে আসতে হয়।

মজার বিষয় হলো, বাংলাদেশের চল্লিশের বেশি জেলায় কোনো ক্রিকেট লিগ হয় না। স্কুল ক্রিকেট হয় নামকাওয়াস্তে। এদেশের ক্রিকেটার উঠিয়ে আনার পাইপলাইন বলে কিছু নেই। এ কারণেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চেনা মুখগুলোকেই জাতীয় দলে দেখা যায়। তার চেয়েও ভয়ংকর বিষয় হলো, এদেশের নবীন ক্রিকেটারদের জাতীয় দলে এনে তারপর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য প্রস্তুত করা হয়! আফগানিস্তানে বেতনভুক্ত ক্রিকেটার হওয়াটাও এত সহজ নয়। এজন্য নির্দিষ্ট মানদণ্ড অর্জন করতে হয়।

বহু বছর ধরেই এদেশের ক্রিকেট ঢাকা-কেন্দ্রিক হয়ে আছে। মিরপুর, চট্টগ্রাম আর হাল আমলে সিলেটের বাইরে দেশে কোনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এমনকি বিপিএল ম্যাচও হয় না। অন্যদিকে এসিবি স্টেডিয়াম তৈরির চেয়ে ক্রিকেট মাঠ তৈরিতে বেশি মনোযোগ দিয়েছে। তাদের প্রতিটি প্রদেশেই বিশেষায়িত ক্রিকেট মাঠ আছে। সেসব মাঠে ছোট্ট একটা ড্রেসিংরুম ছাড়া কোনো অবকাঠামো নেই বললেই চলে। তবে আছে পর্যাপ্ত উইকেট আর দারুণ আউটফিল্ড। এসব স্টেডিয়াম আর ক্রিকেট মাঠ তৈরিতে অর্থায়ন করেছে ভারত, ইউএসএইড এবং মধ্যপ্রাচ্যের কিছু ধনী দেশ। তবে উদ্যোগটা নিতে হয়েছে আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ডেরই। আমাদের কোটি কোটি দর্শক আছে, ধনী ক্রিকেট বোর্ড আছে, মিডিয়া হাইপ আছে, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা আছে, স্পনসর আছে, শুধু নেই আসল জিনিসটাই ক্রিকেট কাঠামো। দর্শকদের অকুণ্ঠ সমর্থন আর আবেগে ভর করেই ফুলেফেঁপে উঠছে বিসিবি। অন্যদিকে বিরূপ পরিবেশের মধ্যেও বিস্ময়কর ক্রিকেট কাঠামো তৈরি করে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে আফগানিস্তান। সেদিন হয়তো আর বেশি দূরে নেই, যেদিন আফগানিস্তান ঘরে তুলবে আইসিসির শিরোপা আর এদিকে ফুলেফেঁপে উঠবে বিসিবির কোষাগার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত