মতবিরোধের শেষ কোথায়?

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৫, ০১:৫৩ এএম

রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশ তার অগ্রযাত্রায় বারবার হোঁচট খেয়েছে। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরে এসেও তেমনি একটা সময়ে আজ আমরা দাঁড়িয়ে। এখনো পশ্চাৎমুখী ধ্যানধারণা নিয়েই বসে আছি। দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিলে, দেশমাতৃকার প্রতি দায়িত্বশীল হলে এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। আমরা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় চলছি। কিন্তু কথাবার্তা আচার-আচরণে গণতন্ত্রের বড় অভাব। বিশেষ করে রাজনৈতিক মতবিরোধ এবং মতানৈক্য আমাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। আমরা এগোতে পারছি না। প্রশ্ন হচ্ছে, এর শেষ কোথায়? আমরা খাদের কিনারে দাঁড়িয়েও কি বাগাড়ম্বরতায় ব্যস্ত থাকব? আমাদের কি কোনোকালে হুঁশ হবে না? জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশে একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একনায়কতন্ত্রের পথ থেকে গণতন্ত্রের পথে উত্তরণের। কিন্তু আমরা কি সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রস্তুত? অবস্থাদৃষ্টে সেটি মনে হচ্ছে না। বরং দিন দিন পরিস্থিতি ঘোলাটে হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। মব আতঙ্ক চারদিকে। অথচ ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনের কথা বলছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। সে জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজ, নাগরিক, সর্বস্তরে মতপার্থক্য কমিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের কণ্ঠে তেমন কথারই প্রতিধ্বনি হলো। পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করে ঐক্যের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ২০০৯ সালে তৎকালীন বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) সদর দপ্তর পিলখানায় সংঘটিত নির্মম হত্যাকাণ্ডে শাহাদাতবরণকারী সেনা কর্মকর্তাদের স্মরণে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি এক অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান এ আহ্বান জানান। জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেছেন, ‘আজকে যে উপদেশ, সেটা যদি আপনারা গ্রহণ করেন, আপনারা লাভবান হবেন। আমি এটা আপনাদের নিশ্চিত করছি। আমরা নিজেরা ভেদাভেদ সৃষ্টি না করি। আমরা নিজেরা ইউনাইটেড (ঐক্যবদ্ধ) থাকি। আমাদের মধ্যে যদি কোনো সমস্যা থেকে থাকে, কোনো ব্যত্যয় থেকে থাকে, কোনো গ্রিভেন্সেস (দুঃখ-দুর্দশা) থাকে, সেটা আমরা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করব। এটার জন্য ডানে-বাঁয়ে দৌড়িয়ে কোনো লাভ হবে না। নিজের ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ হবে না। আমি আপনাদের এই জিনিসটা নিশ্চিত করে দিচ্ছি।’ বর্তমান সময়ে তা এই বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখন সংশ্লিষ্টরা এর মহিমা বুঝলেই হলো।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৬তম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন তার গেটিসবার্গ বক্তৃতায় গণতন্ত্র সম্পর্কে যে কথাটি বলেছিলেন সেটিকেই এখন পর্যন্ত সর্বজন গ্রাহ্য গণতন্ত্রের সংজ্ঞা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৮৬৩ সালের ১৯ নভেম্বরে দুই মিনিটকাল স্থায়ী প্রদত্ত বক্তৃতায় তিনি ‘গণতন্ত্র’ বলতে ‘জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা পরিচালিত সরকার এবং জনগণের স্বার্থে পরিচালিত সরকার’কে বোঝান। (অব দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল)। এরপর বহু দেশে বহু ধরনের সরকার ব্যবস্থা কায়েম হয়েছে। গণতন্ত্রের সংজ্ঞায়ও এসেছে নানা পরিবর্তন। সেনাশাসকরাও জোর করে ক্ষমতা দখল করে নিজেদের গণতান্ত্রিক সরকার বলে দাবি করেছে। জাতিসংঘসহ বিশ্বের মোড়ল রাষ্ট্রগুলোয়ও অনেক সময় অনির্বাচিত সরকার, ক্ষমতাদখলকারী সরকারকে সমর্থন করেছে তাদের হীন স্বার্থে। বলা যায়, বিশ্ব এখন ক্ষমতাশালীর পক্ষে, সেটা যেভাবেই হোক না কেন। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে গণতন্ত্র বলতে আমরা বুঝি মতপ্রকাশের অবাধ স্বাধীনতাকে। তাই যেমন ইচ্ছা কথা বলতে পারাই এখানে গণতন্ত্র। কথার ফুলঝুরি ফোটাতে এখানে কারও কোনো জুড়ি নেই। টিভির টকশো থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গাঁয়ের গলির চা দোকানেও কথায় কথায় রাজা-উজির মারা চলে। সুতরাং কাজীর গরু গোয়ালে না থাকলেও কেতাবে ঠিকই আছে। আমাদের দেশে সেই কেতাবি গণতন্ত্র নিয়ে এখন আমরা আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছি। এখানে জোটের রাজনীতি আর ভোটের রাজনীতিই প্রাধান্য পায় বেশি। জনস্বার্থ কতটা সংরক্ষিত হলো সেদিকে কারও কোনো নজর থাকে না। যেনতেন উপায়ে ক্ষমতায় যাওয়াটাই মুখ্য ব্যাপার।

এ কথা ঠিক, রাজনৈতিক দলগুলো এনজিও নয়। তারা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যই রাজনীতি করে। তাই ক্ষমতায় যাওয়ার মধ্যে কিংবা যেতে চাওয়ার মধ্যে দোষের কিছু নেই। কিন্তু সেখানে জনমানুষকেই সবার আগে স্থান দিতে হবে। এমনকি রাজনৈতিক দল চালাতে গিয়েও দিতে হবে গণতন্ত্রের পরিচয়। দলেই যদি গণতান্ত্রিক চর্চা না থাকে তাহলে দেশে গণতন্ত্রের চর্চা হবে কী করে? দিন শেষে রাজনৈতিক দলগুলোই তো দেশ চালায়। তাদের সম্মিলিত আচরণই  শাসনব্যবস্থায় প্রতিফলিত হয়। কিন্তু রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েই গেছে। অনেক সময় এমন সব কথাবার্তা বলা হয়, যা তার বা তাদের অবস্থানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতেই একটি আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়। পরস্পরের প্রতি আস্থা বিশ্বাস এবং শ্রদ্ধাবোধ না থাকলে সেখানে গণতন্ত্রের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করাও অসম্ভব হয়ে পড়ে। নেতানেত্রীদের সম্মিলিত আচরণই আসলে সেই সমাজ বা দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বিকশিত করতে সহায়তা করে। কাজেই নেতা বা নেত্রীর একক আচরণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ নেতানেত্রীদের আচরণ দ্বারা অন্যরাও উৎসাহিত হন। সেটা ইতিবাচক বা নেতিবাচক যাই হোক না কেন। এ জন্য তাদের আচরণের মধ্যে দায়িত্বশীলতার পরিচয় থাকতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরমতসহিষ্ণুতা এবং পরস্পরের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। শুধু তাই নয়, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভাষায়ও রয়েছে শিষ্টাচারের অভাব। কে কার চেয়ে বড় কিংবা কাকে কীভাবে ছোট করা যায় সব সময় এ ধরনের অসহিষ্ণু মানসিকতার বহির্প্রকাশ দেখা যায় রাজনীতিবিদদের কথাবার্তায়। কিন্তু গণতান্ত্রিক একটি সমাজব্যবস্থায় এ ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও মানসিকতা কোনো অবস্থায়ই কাম্য নয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং অপরের মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়াই আসলে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। আমাদের দেশে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের চর্চা যত বাড়বে গণতন্ত্রের ভিত্তি ততই মজবুত হবে। প্রসঙ্গত, ভলতেয়ারের সেই বিখ্যাত উক্তির কথা স্মরণ করতে হয়। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি তোমার মতের সঙ্গে একমত নাও হতে পারি, কিন্তু তোমার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য জীবনও দিতে পারি।’ গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় এই ধরনের মানসিকতা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিক বৈরিতাপূর্ণ সমাজে বাকসংযম এবং তাতে শালীনতা রক্ষা একান্ত অপরিহার্য। দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তির কথাবার্তায় দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন এমনটিই স্বাভাবিক। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, মাঝেমধ্যেই এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে।

খুচরা দল তো বটেই, দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের বিশিষ্ট নেতারা প্রায়ই একে অপরের প্রতি উসকানিমূলক বক্তব্য রাখেন। কথার ফানুস উড়িয়েই চমক সৃষ্টি করতে চান। জনসভায় কিংবা টিভি টকশোতে জনতার হাততালি কুড়াতে অনেকেই কথার লাগাম টানতে চান না। কিন্তু বক্তার ব্যক্তিত্ব যে এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেটি কি সংশ্লিষ্টরা বুঝতে অক্ষম? রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বক্তব্য হবে ধীশক্তিসম্পন্ন। মানুষজন বিশেষ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তা থেকে শিখবে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী, শেখ মজিবুর রহমানের মতো নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতি এখনো জাতিকে নতুন দিশা দেয়। তাই রাজনীতিবিদদের বক্তব্যে, কথাবার্তায়, আচার-আচরণে এমন বিষয় থাকা উচিত, যা অনুসরণযোগ্য, প্রেরণামূলক ও জনকল্যাণকর। গত ৫৪ বছরে সামাজিক ও অর্থনৈতিক নানা সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে গেলেও রাজনৈতিক অনৈক্য, সংঘাত, সহিংসতা, সন্দেহ, অবিশ্বাস এক প্রধান সমস্যা হিসেবেই এখানে রয়ে গেছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকটের মূলে আছে নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে আস্থাহীনতা। সেটা জাতীয় নির্বাচনই হোক আর স্থানীয় নির্বাচনই হোক। নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে হবে কিংবা কার অধীনে হবে এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছতে পারছে না। এ অবস্থায় মনে রাখতে হবে, যখন সংকটের মূলে যখন নির্বাচনব্যবস্থা; তখন নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও জাতীয় নির্বাচন জনপ্রত্যাশার মূলে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আসলে সবাই নির্বাচন কমিশনের ঘাড়ে বন্দুক রেখে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চায়। কেউ নিজ নিজ দায়িত্বের ব্যাপারে আগ্রহী নন। নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার জন্য অনেক নিয়ামক কাজ করে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, সমর্থক, ভোটার, স্থানীয় প্রশাসন সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হওয়া সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে সব পক্ষকেই দায়িত্বশীল হতে হবে। নতুন নির্বাচন কমিশনকেও আস্থা ফিরিয়ে আনতে কাজ করতে হবে।

আমাদের দেশে ওয়ান ইলেভেন এসেছে। গণআন্দোলন-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক সরকারের পতন হয়েছে। গণতান্ত্রিক মানসিকতা ধারণ করতে না পারলে এর পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে। গণতন্ত্র সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ মতামত হচ্ছে, “গণতন্ত্র বলতে কোনো জাতিরাষ্ট্রের (অথবা কোনো সংগঠনের) এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে নীতিনির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিক বা সদস্যের সমান ভোটাধিকার থাকে। গণতন্ত্রে আইন প্রস্তাবনা, প্রণয়ন ও তৈরির ক্ষেত্রে সব নাগরিকের অংশগ্রহণের সমান সুযোগ রয়েছে, যা সরাসরি বা নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে হয়ে থাকে। ‘গণতন্ত্র’ পরিভাষাটি সাধারণভাবে একটি রাজনৈতিক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হলেও অন্যান্য সংস্থা বা সংগঠনের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য, যেমন বিশ্ববিদ্যালয়, শ্রমিক ইউনিয়ন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি।” দুঃখজনক হচ্ছে, আমরা কেবল অন্যের কাছে বিশেষ করে সরকারের কাছে গণতন্ত্র চাই। কিন্তু নিজেরা আচরণের কোনো পরিবর্তন করি না। যে যেখানে যতটুকু দায়িত্ব পেয়েছেন সেই চেয়ারকে তারা একক ক্ষমতার শীর্ষে নেওয়ার চেষ্টা চালান। সম্মিলিত এই স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতারই প্রতিফলন ঘটে জাতীয় জীবনে। সুতরাং সর্বাগ্রে নিজেকে গণতান্ত্রিক হতে হবে, অন্যের মতকে গুরুত্ব দিতে হবে। তবেই সম্ভব একটি গণতান্ত্রিক বাতাবরণ তৈরি করা। কথায় বলে, ‘আপনি আচরি ধর্ম পরকে শেখাও’। 

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত