তারুণ্য শক্তির শুভযাত্রা

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৫, ০১:৫৯ এএম

পৃথিবীতে বড় ধরনের যত রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে, তার মূলে ছিল সম্মিলিত ছাত্রশক্তি। সভ্যতার প্রথম থেকেই ধাপে ধাপে আমরা এসেছি ২০২৫ সালে। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে বিশে^র দেশে দেশে আন্দোলন হয়েছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ইতিহাস পুরনো। নিজেদের অধিকার ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে বিভিন্ন সময় পৃথিবীর নানা প্রান্তে অসন্তোষ ছড়িয়েছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে। ছাত্র আন্দোলন প্রথম হয় চীনে, ১৬০ খ্রিস্টাব্দে। ইমপেরিয়াল বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তখন সরকারের কয়েকটি নীতির প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিলেন। তাদের আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন কিছু মেধাবী শিক্ষার্থী।

১৭৮৯ সালের ৫ মে ফরাসি বিপ্লবের মূল সেøাগান ছিল ভ্রাতৃত্ব, সমতা ও স্বাধীনতা। তখন ফ্রান্সের শিক্ষার্থীরা সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে। তারা নতুন এবং গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাস্তায় নামে। ১৯৬৮-১৯৭০ এবং ১৯৮০-এর দশক জুড়ে দক্ষিণ আফ্রিকায়  জাতিবিদ্বেষবিরোধী আন্দোলন, ১৯৮৯ সালে তিয়েন আনমেন স্কোয়ার আন্দোলন, ১৯৮৯ সালে ভেলভেট রেভল্যুশন, ১৯৯৯ সালে ইরানের ছাত্র বিক্ষোভসহ অসংখ্য গণতান্ত্রিক আন্দোলন হয়েছে ছাত্রদের হাত ধরেই। আমাদের দেশে বাংলা ভাষার দাবিতে ছাত্রদের নেতৃত্বেই আন্দোলনের গোড়াপত্তন হয়েছিল ১৯৫২ সালে। এরপর ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা দাবির পক্ষে দেশব্যাপী তীব্র গণআন্দোলনে ছাত্রদের ভূমিকা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রদের অবদান সবাই জানেন। তারপর আসে ১৯৯০। সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনে ছাত্রদের ভূমিকাও জানা। স্বাধীনতার পর একদলীয় শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র আসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। এরপর ছাত্রলীগ ভেঙে মেধাবী শিক্ষার্থীদের একটি অংশ গড়ে তোলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল  (জাসদ)। তারপর অনেক ছাত্র সংগঠন হয়েছে। কিন্তু গণমানুষের আকাক্সক্ষাকে ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৮ সালে, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের।

বিভিন্ন সময় আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ হয়েছে। যার মূল চালিকাশক্তি ছিল তরুণ নেতৃত্ব। এবার গত শুক্রবার বিকেলে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের সমন্বয়ে গঠিত নতুন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) আত্মপ্রকাশ করেছে। দলের আহ্বায়ক করা হয়েছে সাবেক তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামকে। সদস্য সচিব হয়েছেন আখতার হোসেন। দলটির পক্ষ থেকে দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি, জামায়াত, নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি, লেবার পার্টি, জেএসডি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। নাহিদ ইসলাম ঘোষণাপত্রে বলেছেন ‘আমরা মনে করি, জুলাই-২০২৪ গণঅভ্যুত্থান আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার লড়াই সূচনা করেছে। একটি গণতান্ত্রিক নতুন সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে আমাদের সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সব সম্ভাবনার অবসান ঘটাতে হবে। সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার জন্য গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন আমাদের অন্যতম প্রাথমিক লক্ষ্য। আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিকে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। ভেঙে পড়া রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় গড়ে তোলা এবং তাদের গণতান্ত্রিক চরিত্র রক্ষা করা হবে আমাদের রাজনীতির অগ্রাধিকার। এর মধ্য দিয়েই কেবল আমরা একটি পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হতে পারব।’

গত শুক্রবার যে সংগঠনের আত্মপ্রকাশ হয়েছে চলমান রাজনীতির ধারায় এটি ব্যতিক্রম। এবার সম্ভবত গণতান্ত্রিক ধারায় রাজনীতি অগ্রসর হবে। আমরা চাই, দেশে যেমন সরকারি পক্ষ থাকবে, তেমনি বিরোধী পক্ষও থাকবে। আমাদের প্রত্যাশা, সার্বক্ষণিক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চার মাধ্যমে দেশের রাজনীতি একটা সুষ্ঠু ধারায় ফিরে আসবে, সমর্থন পাবে সব পক্ষের। মোদ্দা কথা, অর্থনীতি এবং রাজনীতি সুষ্ঠু ধারায় আসুক। জনগণ যেন রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়বদ্ধ করতে পারে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। দলের চেয়ে দেশের স্বার্থ প্রাধান্য পাক, জনগণ এমনটিই চায়। জাতীয় নাগরিক পার্টির যাত্রা শুভ হোক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত