ইফতারির রাজত্বে মুঘল খাবার

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৫, ০৬:৩০ এএম

রমজান মাস মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য আত্মশুদ্ধি, সংযম ও ইবাদতের বিশেষ সময়। মুঘল আমলে রমজান পালন ও ইফতার আয়োজন এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করত। মুঘলদের দারুণ সব খাবারের কথা সমাদৃত। আমাদের খাবারেও আছে এর প্রভাব। এ বিষয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

ইফতার শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অনুষ্ঠানও হয়ে উঠেছে। ইসলাম ধর্মের এই পবিত্র বিধান উপমহাদেশের সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রমজান মাসের উৎসবমুখর পরিবেশ গড়ে তোলার পেছনে মুঘলদের অবদান ছিল অপরিসীম। মুঘলরা রমজানকে স্বাগত জানিয়ে, ইফতারের দস্তরখান সাজানোর যে রাজকীয় ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা দিল্লি, লক্ষেèৗ, হায়দরাবাদ থেকে বাংলায় পৌঁছে গেছে। মুঘল সম্রাটরা রমজান মাসে সাধারণত বিলাসীভোজন ও উৎসব আয়োজনের ক্ষেত্রে সংযত থাকতেন এবং অধিকাংশ সময় ইবাদতে মনোযোগী হতেন। তারা দরিদ্রদের মধ্যে দান-খয়রাত করতেন এবং রমজানের শেষে ঈদ উৎসবকে বিশেষ আড়ম্বরের সঙ্গে উদযাপন করতেন। আকবরের শাসনকালে রমজান মাসের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যদিও আকবর নিজে রোজা রাখতেন কি না, তা নিয়ে কিছু বিতর্ক আছে, তবে তিনি ইসলামি অনুশাসন ও ধর্মীয় আচারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। তার পরবর্তী শাসক, বিশেষ করে আওরঙ্গজেব ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ এবং রমজান মাসে কঠোর সংযম পালন করতেন।

মুঘলরা রোজার মাসকে একটি রাজকীয় উৎসবে পরিণত করেছিলেন, যা আজও এই অঞ্চলের খাবারের রীতিতে দেখা যায়। পবিত্র রমজান মাসের শুরু থেকে ইফতারের সময় পর্যন্ত মুঘলরা যে বিশাল বৈচিত্র্যময় খাবারের আয়োজন করতেন, তা এখনো বাংলায় রয়ে গেছে। এই ঐতিহ্য দিল্লি, লক্ষেèৗ এবং হায়দরাবাদ হয়ে ঢাকায় পৌঁছেছে এবং এখানকার মুসলমানদের ইফতার এবং সাহরি সময়ের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুঘলদের শাহী খাবারের মাধ্যমে রোজা কেবল এক পবিত্র মাসের পালা হয়ে ওঠেনি, বরং এক বিশাল সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা হয়ে গিয়েছিল।

মুঘলরা যেভাবে রোজার সময় খাবারের বৈচিত্র্য তৈরি করেছিলেন, তা অন্য কোনো অঞ্চলের রাজ-বাদশাহরা করতে পারেনি। বিশেষ করে সম্রাট শাহজাহানের শাহী বাবুর্চি, যিনি শতাধিক পোলাও তৈরি করতেন, তার রান্নাঘর ছিল পৃথিবীর অন্যতম সেরা। এমনকি আওরঙ্গজেব ও বাহাদুর শাহ জাফরের সময়, ইফতার ছিল এক বিশেষ সুযোগ, যেখানে সাধারণ মানুষও দরবারি খাবারের স্বাদ নিতে পারত। এতে, মুঘলদের রান্নার ধারা ভারতীয় উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং একসময় ঢাকায় এসে পৌঁছায়।

এ সময় এক ঐতিহাসিক খাবার হালিম সিরিয়া ও লেবাননের হারিসা থেকে এসে মুঘলদের রান্নাঘরে ভারতীয় মসলার ঘ্রাণে বিলীন হয়ে এক নতুন রূপ ধারণ করেছিল। হায়দরাবাদ থেকে ঢাকায় পৌঁছে যাওয়া এই খাবার এখন রোজার মাসে সবার পছন্দের তালিকায়। মুঘলদের শেষ সময়ে এসে এমনকি জালেবি বা জিলাপির মতো বনেদি খাবারও সাধারণ মানুষের ইফতারের থালায় স্থান পায়।

রমজান মাস আসার আগেই, শবেবরাতের পর থেকেই মানুষের মধ্যে ইফতারের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত। ঢাকায়, যখন রোজার চাঁদ দেখা যেত, তখন বাহাদুর শাহ জাফর এক বিশেষ রীতি অনুসরণ করতেন। তিনি হাতি নিয়ে যেতেন চাঁদ দেখতেন। আর যখন আকাশে এক ফালি চাঁদ দেখা যেত, তখন কামান থেকে তোপ ছুড়ে এবং ফাঁকা গুলি করে রমজান মাসের আগমন ঘোষণা করা হতো। ঢাকায় সুবেদার ইসলাম খান প্রথম তোপধ্বনি করে রোজাকে স্বাগত জানানোর রেওয়াজ শুরু করেছিলেন, যা পরবর্তীকালে ঢাকার নবাবরা পালন করতেন।

রাজকীয় মুঘল খাবার

মুঘল আমলে খাবারের পসরা ছিল একেবারে রাজকীয় গা ভরা রঙ, সুগন্ধ আর স্বাদের বিস্ময়। মুঘলদের রান্নাঘরে রুটির যা বৈচিত্র্য ছিল, তা দেখে সত্যি মনে হতো, কোনো এক জাদুকরের হাতে রান্না করা হচ্ছে। ‘চাপাতি’, ‘ফুলকা’, ‘পরাটা’, ‘রুগনি রুটি’, ‘বেসানি রুটি’, ‘খামিরি রুটি’, ‘নান’, ‘গাভ দিদা’, ‘গাভ জাবান’, ‘কুলচা’, ‘বাকর খানি’ এত রুটি যে, একদিনে খেয়ে শেষ করা যাবে না। আর মিষ্টির কথা তো না বললেই নয় ‘রুটির হালুয়া’, ‘গাজরের হালুয়া’, ‘কমলার হালুয়া’, ‘পেস্তার হালুয়া’, ‘কুমড়ার হালুয়া’ সবই একেকটি অরিজিনাল রেসিপি।

আর পোলাও। মুঘলরা যে পোলাওয়ের রাজা ছিল, তা তো বলাই যায়। ‘ইয়াখনি পোলাও’, ‘মতি পোলাও’, ‘নূর মাহালি পোলাও’, ‘নুকতি পোলাও’, ‘কিশমিশ পোলাও’, ‘ফলসাই পোলাও’, ‘মুরগি পোলাও’, ‘কোফতা পোলাও’ এভাবে নাম করে নামান্তর চলতে থাকত। আর যেনতেন পোলাও নয়, প্রত্যেকটি ছিল একেকটি মাস্টারপিস। মুঘলদের খাবারের ঐশ্বর্য এতটাই ছিল যে, তারা ‘বিরিয়ানি পোলাও’ এবং ‘আস্ত ছাগল পোলাও’ খেতেও মোটেও পিছপা ছিল না। আর হ্যাঁ, এসব খাবার গরম গরম পরিবেশন করতে তন্দুরের মতো একাধিক লোহার চুল্লি প্রস্তুত থাকত, যেন প্রত্যেকটি রুটি ও কাবাব তাজা আর গরম।

সালন তো ছিল মুঘল খাবারের অন্যতম চরিত্র। ‘কোরমা’, ‘কালিয়া’, ‘দো পেয়াজা’, ‘হরিণের কোরমা’, ‘মুরগির কোরমা’, ‘মাছ’, ‘বুরহানি’, আর ‘রাইতা’, সবই ছিল। তাদের আরও ছিল কাবাবের ভাণ্ডার। ‘শিক কাবাব’, ‘শামি কাবাব’, ‘গলি কাবাব’, ‘ফিজেন্ট কাবাব’, ‘কোয়েল কাবাব’ এগুলো ছিল মুঘলদের পছন্দের সেরা কাবাব।

হালুয়া, কাবাব, মোরব্বা আর শরবত এগুলো আসলে শুধু খাওয়ার জন্য নয়, মুঘলরা রান্নাকে নিয়ে গিয়েছেন একশ্রেণির শিল্পে। ‘আনারস মোরব্বা’, ‘হিবিস্কাস মোরব্বা’, ‘রাংতারে মোরব্বা’, ‘করলা মোরব্বা’ এগুলো মুঘলদের বৈচিত্র্যময় রুচির প্রমাণ। রমজান মাসে আরেকটি বিশেষ খাবারের ছিল দারুণ কদর শির বেরেঞ্জ। দুধ, মধু, কিশমিশ এবং মাওয়া দিয়ে তৈরি এই খাবারটি ইফতার ও সাহরির দুই বেলাতেই খাওয়া হতো। তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল রোজার সময় শরবত। একেক ধরনের বাদাম দিয়ে তৈরি একেক রকম শরবত আর এসব শরবতে থাকত জাফরান আর দামি সুগন্ধির ছোঁয়া। এক কাপ শরবত খেলে মনে হতো যেন সারা দিনকার উপাস তৃপ্ত হয়ে গেল। এবং ইফতারির সময় তো এক রহস্যময় পরিবেশ। মুঘল প্রাসাদে ৩টায় শুরু হয়ে যেত তন্দুরে ভাজা নান, রুগনি রুটি, কুলচা সাজানো, শিক কাবাব ও হুসেনি কাবাব বানানোর কাজ। এত নানান খাবার, এত বৈচিত্র্য ছিল যে, সবাই মুগ্ধ হয়ে সেগুলো উপভোগ করত।

মুঘল খাবারের বৈচিত্র্য পারস্যের প্রভাব, ভারতীয় সংস্কৃতি এবং ইসলামি ঐতিহ্যের এক অসাধারণ মিশ্রণের ফল। সম্রাট হুমায়ুনের পারস্যে নির্বাসনের সময় পারস্যের খাবারের প্রতি তার আগ্রহ মুঘল রন্ধনপ্রণালিতে প্রবাহিত হয়। এভাবে পার্সিয়ান রীতি, ভারতীয় ঐতিহ্য এবং ইসলামি প্রভাব মুঘল খাবারের সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করে। সম্রাট আকবরের শাসনামলে, বিভিন্ন দেশের বাবুর্চিরা একত্রিত হয়ে তাদের রন্ধনপ্রণালি শেয়ার করেন, ফলে মুঘল খাবারের বৈচিত্র্য আরও বৃদ্ধি পায়। পার্সিয়ান প্রভাবের মধ্যে দই মাখিয়ে রোস্ট, বাদাম এবং শুকনা ফল দিয়ে দুধ এবং গোলাপজল ব্যবহার করে খাবার তৈরি করা এবং নতুন কৌশলে শরবত তৈরি করা অন্তর্ভুক্ত ছিল।

আমাদের ইফতারে মুঘল খাবার

ইফতারের সময়, মুঘল খাবারগুলো একেবারে অপরিহার্য হয়ে ওঠে। শামি কাবাব, যা মূলত সিরিয়ার শাম অঞ্চলের খাবার, মুঘলদের দ্বারা ভারতীয় উপমহাদেশে আসে। এই কাবাবে গোশত, ছোলা, ডিম এবং মসলার ব্যবহার তাকে একটি সুস্বাদু এবং মসলাদার খাবারে পরিণত করে। রুহ আফজা, গোলাপসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি একটি জনপ্রিয় শরবত, যা মুঘল আমল থেকেই প্রচলিত এবং ইফতারে ঠাণ্ডা দুধ ও বরফের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ার প্রথা আজও রয়েছে। পাকোরা, যা বিশেষ ধরনের পেঁয়াজুর একটি রূপ, মুঘল খাবারের আরেকটি জনপ্রিয় পদ, যেখানে পেঁয়াজ কুচির সঙ্গে সবজি মিশিয়ে সোনালি রঙে ভাজা হয়।

সমুচা, যা মাংস, পেঁয়াজ, ডাল এবং মসলা দিয়ে তৈরি হয়, ইফতারে খুবই জনপ্রিয়। জিলাপি, ময়দা, ঘি, চিনি, গোলাপজল ও জাফরান দিয়ে তৈরি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় মিষ্টান্ন, যা রমজান মাসে বিশেষভাবে ইফতার আয়োজনে পরিবেশন করা হয়। ফিরনি, দুধ, চাল, বাদাম, কিশমিশ ও সুগন্ধি মসলা দিয়ে তৈরি একটি সুস্বাদু মিষ্টান্ন, যা রমজানে খাওয়ার জন্য আদর্শ। কিমা রোল, মাংস, ময়দা, পেঁয়াজ-রসুনসহ মসলার সমন্বয়ে তৈরি এক সুস্বাদু খাবার, যা উপমহাদেশের নানা জায়গায় জনপ্রিয়। ডিম রোল, কিমার পরিবর্তে ডিম ব্যবহার করে তৈরি করা হয়, যা ইফতারের একটি জনপ্রিয় খাবার।

মুঘলদের আমলে নয়, তবে তাদের কাছাকাছি সময়ে ঢাকায় রোজার মাসে এক দারুণ খাবারের কদর ছিল মোরগ মোসাল্লাম। মশলাযুক্ত মোরগের মধ্যে সেদ্ধ ডিম পুরে সুতা দিয়ে পেঁচিয়ে শিকে গেঁথে, তারপর তা সেঁকা হতো ঘি দিয়ে। এই বিশেষ খাবারটি ইফতারের সময় গরম গরম শিক থেকে সরাসরি পরিবেশন করা হতো, যেন মনে হতো কোনো রাজকীয় সজ্জা।

মুঘল বাবুর্চিখানায় হাজারো বিরিয়ানি তৈরি হতো, কিন্তু সঠিকভাবে কী ধরনের বিরিয়ানি তারা খেতেন, তা বেশ স্পষ্ট ছিল না। তবে ঢাকার নবাবদের রোজার সময়কার তালিকায় ছিল সিন্ধি বিরিয়ানি, লক্ষেèৗ বিরিয়ানি, তেহারি আর মোরগ-পোলাও এসব ছিল তাদের রোজার বিশেষ আয়োজন। এ ছাড়া ১৬৩৯ সালে শাহ সুজা যখন ঢাকায় শিয়া পরিবার নিয়ে আসেন, তখন খোরাসানি পোলাওয়ের প্রবেশ ঘটে। এ পোলাও এতই সুগন্ধি ছিল যে, এক বাড়িতে রান্না করলে পুরো মহল্লায় তার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত।

পুরান ঢাকার চকবাজার

মুঘল খাবারের বৈচিত্র্য শুধু একটানা খাবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা এক বিশেষ ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছিল। এসব খাবার শুধু একটি নির্দিষ্ট সময় বা মৌসুমে জনপ্রিয় ছিল না, বরং মুঘল যুগের রান্নার ধারা আজও আমাদের খাবার টেবিলে রয়েছে।

বিশেষত, পুরান ঢাকার চকবাজার, যেটিকে ‘বাদশাহী বাজার’ বলা হতো, তার নামই পুরান ঢাকার ইফতারির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। শতবর্ষ আগেও এখানকার ইফতারের দৃশ্য ছিল একেবারে আলাদা, যেখানে সেদিনকার ধনী-গরিব সব শ্রেণির মানুষ এক সঙ্গে বসে উপভোগ করতেন খাবারের এক মেলবন্ধন। মুঘল আমলের মেজবানি চালু হয়ে যাওয়ার পর, বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নামি বাবুর্চি ও হালইওয়ালারা ঢাকায় এসে গড়ে তোলেন এক শাহী খাবারের রাজ্য।

চকবাজারে তখন শুধু কাবাবের সমাহার ছিল না, বিভিন্ন ধরনের বিশেষ খাবারের সঙ্গে ভিড় জমত এক অনন্য খাবারের উৎসব। কাবাবের মধ্যে সুতি কাবাব, শামি কাবাব, নার্গিস কাবাব, খিরি কাবাব এবং আরও নানা স্বাদের কাবাব খুব জনপ্রিয় ছিল। এ ছাড়া ফালুদা ও লাচ্ছি ইফতারের মেনুতে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, যা মুঘল আমলের প্রভাবে ঢাকার জনসাধারণের কাছে পৌঁছেছিল। সে সময়ের এই খাবারের ঐতিহ্য আজও পুরান ঢাকায় রয়ে গেছে, যেখানে রোজার মাসে চকবাজারের বাতাসে এক বিশেষ খাবারের গন্ধ উড়ে বেড়ায়, যেন সময় থেমে গেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত