মদমত্ত গাড়ি ও আকাঙ্ক্ষা

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৫, ০১:৩৮ এএম

পশ্চিমবঙ্গে গতকাল (শনিবার) থেকে খবর একটাই। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সভায় গিয়েছিলেন রাজ্যের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ব্র্যাত্যবসু। তিনি বিশিষ্ট নাট্যকার, অভিনেতা। কলকাতার বাবু ভদ্রলোক সমাজের নয়নমণি। এহেন সর্ব গুণান্বিত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী গিয়েছিলেন দলের এক সভায়। মনে রাখবেন, দলের সভায়। দলের নেতা হিসেবে। মন্ত্রী হিসেবে যাননি। সেখানে একাধিক বামপন্থি ছাত্র সংগঠন তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখায়। তাদের মূল দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র সংসদের নির্বাচন বন্ধ রাখা হয়েছে। এবার যেন সেই নির্বাচন করা হয়। হতে পারে মন্ত্রী মশাইয়ের সঙ্গে ছাত্রদের বিতণ্ডা হয়েছিল। দুপক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত তর্ক-বিতর্ক হয়েছিল। ছাত্রদের মনে ছিল না, উপমহাদেশে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোয় শাসকের মুখে মুখে তর্ক করতে নেই। শাসককে প্রশ্ন তুলতে নেই। প্রশ্ন তুললে তো তোলাই যায় যে, ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে কেন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের নির্বাচন বন্ধ করে রাখা হয়েছে, ঠিক কী উদ্দেশ্যে! নির্বাচিত সংসদ নেই অথচ প্রত্যেক কলেজে ইউনিয়ন রুম দখল করে মৌরসী পাট্টা কায়েম করে রেখেছে তৃণমূল কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন। সম্পূর্ণ বে-আইনিভাবে এই তৃণমূলী ছাত্ররা কলেজের নানা অনুষ্ঠানের নাম করে বিপুল টাকা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আদায় করে। কলেজ সোশ্যাল অনুষ্ঠানে খরচ করা হয় লাখ লাখ টাকা। অধিকাংশ সোশ্যাল অনুষ্ঠানেই বিশৃঙ্খলা চরমে ওঠে। কয়েক বছর আগে এমন এক অনুষ্ঠানে গান গাইতে এসে প্রাণ দিতে হয়েছিল বিখ্যাত গায়ক কে কে- কে। প্রশ্ন তো তোলাই যায়, শিক্ষা মন্ত্রীকে পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষার প্রতিটি স্তরে দলীয়করণ হওয়ার পেছনে কোন স্বার্থসিদ্ধি কাজ করা যায়!  ওয়েবকূপা নামের তৃণমূল কংগ্রেসের অধ্যাপকদের যে সংগঠন তা সারা রাজ্যে নিতান্তই শক্তিহীন। অধ্যাপকদের প্রাচীন সংগঠন ওয়েবকটা এখনো অনেক বেশি শক্তিশালী। কূটা মোটের ওপর বাম মনোভাবাপন্ন হলেও সর্বস্তরের প্রতিনিধিই সেখানে রয়েছেন। আর কূপা তৈরি করা হয়েছে কূটা ভেঙে অনুগত অধ্যাপকদের নিয়ে।

প্রশ্ন তো উঠবেই, পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থার আজ বেহাল দশা কেন! কিন্তু কোথাও কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না। পুলিশ প্রশাসন দলীয় কর্মীদের দিয়ে ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করা হবে। পশ্চিমবঙ্গের খবর নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের আগ্রহ যথেষ্ট। কিন্তু কতটুকু সত্যি খবর আমরা পৌঁছে দিতে পারি আপনাদের! আপনি সত্যি লিখতে বা বলতে পারবেন না। আপনাকে ট্যাগ দিয়ে দেওয়া হবে। আপনি মাওবাদী হয়ে যাবেন। আর্বান নকশাল হবেন। বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী চুপ করে থাকবেন। অথবা গাজায় বোমাবর্ষণ বা কুম্ভস্নানের মাহাত্ম্য নিয়ে প্রবন্ধ লিখবেন। মঞ্চে ফ্যাসিস্টবিরোধী নাটক মঞ্চস্থ করে হাততালি কুড়াবেন। আর এখন তো আবার প্রগতিশীল হওয়ার নতুন মাপকাঠি হয়েছে বাংলাদেশ কীভাবে নষ্ট হয়ে গেল, তা নিয়ে হা-হুতাশ করে ফেসবুকে পোস্ট করতে পারা। সন্ধ্যাবেলায় টিভিতে চলবে জ্ঞান বিতরণ ও পারস্পরিক দোষারোপ পালা। এ রাজ্যে রেপ হয়েছে। তা তো হতেই পারে। কৈ অমুক রাজ্যে যে হচ্ছে তা কি আপনাদের চোখে পড়ে না! এ রাজ্যে ধর্মীয় উন্মাদনা বাড়ছে। অন্য রাজ্যের পরিস্থিতি তো আরও খারাপ। তৃণমূল বিজেপির দিকে আঙুল তুলবে। সিপিআইএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্টের চৌত্রিশ বছরের কূশাসন নিয়ে সোচ্চার হবে, তারা যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি কলেজকে আক্রমণ করবে, বিজেপি দিল্লির জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটি বা জামিয়া মিলিয়াকে টার্গেট করবে। পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা সগর্বে বলবেন, আমি হিন্দু, পাল্টা মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দেবেন যে তিনি শুধু হিন্দু নন, একেবারে ব্রাহ্মণকন্যা। একুশ শতকের ভারত নতুন করে ভাগাভাগি হতে থাকবে হিন্দু ও মুসলমানে, দলিত ও বামুনে। উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রে আঘাত করা শাসকের পরিকল্পনা। দিল্লিতেও তাই জেএনইউতে ছলে-বলে কৌশলে বিজেপি অনুপ্রবেশ করতে চায়। এ রাজ্যেও একই কারণে কখনো সংঘ পরিবার হানা দেয় যাদবপুরে, কখনো প্রেসিডেন্সি তছনছ হয় তৃণমূলী সৌজন্যে। যে বাবুল সুপ্রিয় সংঘ পরিবারের মাথা হয়ে কয়েক বছর আগে যাদবপুরে হামলা চালিয়েছিল, সেই তিনি কিন্তু রাতারাতি ভোল পাল্টে এখন তৃণমূল নেতা। ক্ষমতা বড় মধুর। তার কোনো দল হয় না। প্রশ্ন তো আবার তোলা যায় রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রীকে উদ্দেশ করে। গতকাল (শনিবার) যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়েবকূপার সম্মেলনে অধ্যাপক ছাড়া বাইরে থেকে কয়েকশ লোক আনা হয়েছিল কী উদ্দেশ্যে! মন্ত্রী বিরোধী ব্যানার, পোস্টার ছিঁড়ে প্রথম থেকেই আসর গরম করার চেষ্টা ঠিক কোন পরিকল্পনার অংশ! আগামী বছর পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন। এবার নির্বাচনে শাসক তৃণমূল ও বিরোধী বিজেপির মুখ্য ইস্যু ধর্ম। ইতিমধ্যেই দিল্লি ও অন্যত্র নির্বাচনেও ঘুরে ফিরে আসছে বাংলাদেশ। পাশের দেশ ‘জঙ্গি’ হয়ে গেলে কি আর ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ভারত চুপচাপ থাকতে পারে! পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে তো বাংলাদেশ আসবেই। ফলে নির্বাচনের ঢাকে কাঠি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো না পড়লেও জোর চাপানোতর শুরু হয়ে গেছে। ভোটার তালিকায় বাংলাদেশের নাগরিকদের নাম ঢোকানোর অভিযোগ তুলে তৃণমূলের বিরুদ্ধে বাজার গরম করতে খোলাখুলি সাম্প্রদায়িক কার্ড খেলছে বিরোধী বিজেপি। তৃণমূল চেষ্টা করে যাচ্ছে সে আসলেই সহি হিন্দু তা প্রমাণ করতে। যতদিন যাচ্ছে রাজ্যের বাম শক্তি তত গুরুত্বহীন, অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে। অতি নিয়মতান্ত্রিক পথে গেলে বামেদের যে আগামী দিনে অস্তিত্ব আরও বিপন্ন হবে তা বোঝার ক্ষমতা বাম নেতাদের নেই। হতে পারে বিজেপির ধর্মীয় উন্মাদনায় ঈষৎ কোণঠাসা তৃণমূল ইচ্ছা করেই যাদবপুর ইস্যু তৈরি করেছে। যাতে মিডিয়া অ্যাটেনশন অন্তত কিছুদিনের জন্য ধর্মীয় বিভাজন থেকে সরে যায়।

আরজি কর কান্ড ইতিমধ্যেই ইতিহাস হয়ে গেছে। মেয়েটি কীভাবে খুন হলেন, তা ক্ষমতাধরদের সক্রিয়তায় কোনো দিনই হয়তো আর জানা যাবে না। যাদের গেল তাদেরই গেল। সারা জীবন এখন হতভাগ্য মা-বাবা মেয়ের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকবেন। শাসক ব্যস্ত থাকবে রাজনৈতিক তরজায়। গতকালের (শনিবার) ছাত্র বিক্ষোভ ছিল শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে। এই বিক্ষোভ চিরকাল কলকাতায় হয়ে এসেছে। তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একদা বর্ষীয়ান সমাজবাদী নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণের গাড়ির বনেটে নেচে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। কিন্তু মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ইতিহাস সৃষ্টি করলেন গাড়ির সামনে থাকা ছাত্রদের গায়ের ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দিয়ে। দুজন ছাত্র সংকটজনক অবস্থায় হসপিটালে ভর্তি। অনেক দিন আগে এই মার্চ মাসেই আমি প্রথম মেয়ের মুখ দেখেছিলাম, তরুণ এক নাটক অন্তপ্রাণ তরুণের হাত ধরে। সেদিন বড় উজ্জ্বল ছিল ওই তরুণের মুখ। সেদিনের সেই তরুণ ব্র্যাত্য বসুই আজ পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষামন্ত্রী। আমাদের পথ কবেই আলাদা হয়ে গেছে। তবুও পুরনো দিন মনে করে, বুকের ভেতর কেমন যেন ব্যথা করছে।

ক্ষমতা বোধহয় এভাবেই মানুষকে পাল্টে দেয়। কত কত সময় আমরা দুজনে আড্ডা মেরেছি। কত খাবার ভাগ করে খেয়েছি। আমার মা-বাবা বড় ভালোবাসতেন ব্র্যাত্যকে। ব্র্যাত্য গাড়ি চালিয়ে দিচ্ছে তরুণ ছাত্রদের ওপরে, এই দৃশ্য ভাগ্যিস তাদের দেখতে হয়নি। বেঁচে থাকলে তাদের রক্তক্ষরণের কথা চিন্তা করেই আঁতকে উঠছি। ব্র্যাত্যের মা বড় নরম মনের ছিলেন। অথচ সেই মায়ের ছেলে কীভাবে বদলে গেল। আমি জানি, এ লেখা ঠিক কেউ পৌঁছে দেবে মাননীয় মন্ত্রীকে। যারা দেবে তারা কেউ-ই ওর বন্ধু নয়। চাটুকার। তেল দিয়ে নিজের আখের গোছাবার মতলবে ক্ষমতার পাশে ঘোরাঘুরি করে। অনেকে বলছেন, এ কোনো হঠাৎ ঘটনা নয়। মন্ত্রী বরাবরই এ রকম নিষ্ঠুর। হতে পারে, আমি তো চিনতাম নাটকপাগল এক কিশোর বা তরুণকে। আসলে এই বদলে যাওয়ার রোগ তো শুধু ব্র্যাত্যর একার নয়। এপার, ওপার দুই পারের ছবিটা একই। ক্ষমতার দম্ভ। চোখ বুজলে আপনি কোনো এক ব্যক্তি নয়, দেখতে পারেন অনেক অনেক দাম্ভিক সব স্বৈরশাসক কে। চেনা সব মুখ। কেউ নাটক করতেন, কেউ বিপ্লবী ছাত্রনেতা, কেউ আবার গীতিকার বা সুরকার। ঠিকই তো, কোনো কিছু হঠাৎ হয় না। আজকের ঘটনার শিকড় লুকিয়ে থাকে অতীতে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যা, এ বঙ্গেও তাই-ই। তৃণমূল কংগ্রেসের তরুণ এক নেতা দেখছি সদম্ভে বলছে, চাইলে দুই মিনিট লাগবে যাদবপুরের তথাকথিত লালদুর্গ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে। মনে পড়ে গেল আমাদের কিশোর বয়সে ওই তরুণের পূর্ব সুরিরা দেওয়ালে লিখত রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠায় রাবণ বধে আমরা কুণ্ঠিত না অথবা পশ্চিমবঙ্গ কখনো ভিয়েতনাম হবে না, হলে ইন্দোনেশিয়া হবে। সেই ইন্দোনেশিয়া যেখানে এক রাতে কয়েক লাখ কমিউনিস্ট কর্মী-সমর্থকদের খুন করা হয়েছিল। কয়েক দিন আগে নাটক দেখলাম, আন্তিগোনে। কীভাবে ক্ষমতার দম্ভ বদলে দিল শিল্প সাহিত্য অনুরাগী রাজা ক্রেয়নকে। আড়াই হাজার বছরের পুরনো আখ্যান। আজও প্রাসঙ্গিক। স্বৈরতন্ত্র কোনদিনই, কোথাও চিরস্থায়ী হয় না। জনগণের শক্তি অসীম। মুশকিল হচ্ছে কুর্সিতে বসলে এই চিরন্তন সত্য শাসকেরা ভুলে যান। ছাব্বিশ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচনে তৃণমূল বা বিজেপি কেউ একজন জিতবে। জনগণের খিদে থেকে মুক্তি, বাসস্থানের দাবি, স্বাস্থ্যচিন্তা ও অধিকারের লড়াই কিন্তু চলতেই থাকবে। মদমত্ত গাড়ির সাধ্য কি জনাকাক্সক্ষাকে পিষে মারার!

লেখকঃ ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত