যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বাগযুদ্ধ এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার তুঙ্গে। কোনো রুদ্ধদ্বার বৈঠকে নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমের সামনে দুটি দেশের শীর্ষ নেতার মধ্যে নজিরবিহীন বাগবিত-ার ঘটনায় তাই নতুন চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণের জন্য বিশ্বজুড়ে সমালোচনায় বিদ্ধ হচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে ট্রাম্পের আচরণকে মাফিয়া বসের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এমনকি ট্রাম্প-জেলেনস্কি বিবাদের পর যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে ইউক্রেনের পক্ষে বিক্ষোভ করেছে শত শত মানুষ।
শুক্রবার হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসের বৈঠকটি এক বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এ ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র-বিশেষ করে ইউরোপীয় নেতাদের হতবাক করেছে। ফলে সমর বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত পাশে থাকার পর এবার জেলেনস্কির হাত পুরোপুরি ছাড়তে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আর এর পেছনে ট্রাম্পের বড় কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ট্রাম্প-ভ্যান্সের এমন আচরণকে মোটেই ভালোভাবে নেয়নি ইউরোপের শীর্ষ সংবাদমাধ্যমগুলো। জেলেনস্কির প্রতি ট্রাম্পের আচরণের সমালোচনা করে ইউরোপের সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, ট্রাম্প ও তার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ওভাল অফিসে রাষ্ট্রনায়কের মতো আচরণ করেননি। বরং মাফিয়া নেতার মতো আচরণ করেছেন।
যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ বলছে, পশ্চিমাদের ঐক্য এখন অপরিহার্য। এই উত্তপ্ত বাগবিতণ্ডার ভয়াবহ দৃশ্য দেখে ব্রিটেন এবং ইউরোপের যে কেউ তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হবেই। ফরাসি দৈনিক লে ফিগারো ট্রাম্পকে একজন রুশ শাসকের সঙ্গে তুলনা করেছে। পত্রিকাটি লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় এখন একজন জার এসেছেন। যিনি গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ভুলেছেন এবং পশ্চিমাদের পতন চান। জার্মানির ডের স্পিগেল পত্রিকা লিখেছে, ট্রাম্প ও জেলেনস্কির মধ্যে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আলোচনা দেখে মনে হয়েছে আমরা একটি নতুন বিশ্বে বাস করছি। পশ্চিমা বিশ্বের এখন তার পুরনো শীর্ষ বন্ধুর বলয় থেকে বের হয়ে আসার সময় হয়েছে। ইতালির সংবাদপত্র কোরিয়ের ডেলা বলেছে, ইউরোপ এখন নিজেদের সবচেয়ে খারাপ আশঙ্কাকে সত্য হতে দেখছে। কিয়েভকে তার ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। আটলান্টিকের অপর পারে যাদের বন্ধু ভাবা হতো, তারা আদতে শত্রু। স্প্যানিশ সংবাদপত্র এল পাইস লিখেছে, ওভাল অফিস থেকে একটি স্পষ্ট বার্তা এসেছে, তা হলো যদি আমাদের জরুরি প্রয়োজন ও নিরাপত্তা সম্পর্কে কোনো সংশয় থাকে, তাহলে বিশ্বে আমাদের বন্ধু কারা, সেই বিষয় পুনর্বিবেচনা করতে হবে। সুইজারল্যান্ডের সংবাদপত্র নিউ জুরচার জেইতুং লিখেছে, যদি ইউরোপীয়রা সত্যিই ইউক্রেনে টেকসই শান্তি চায়, তাহলে সম্ভবত তাদের নিজেদেরই নেতৃত্ব কাঁধে নেওয়ার সময় এসেছে। ওয়াশিংটনের ভরসা ও আশ্বাসে বিশ্বাস করার কোনো সুযোগ নেই। এদিকে, ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্প ও ভ্যান্সের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে ইউক্রেনের সমর্থনে বিক্ষোভ দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস ও বোস্টনে ইউক্রেনের সমর্থনে হওয়া বিক্ষোভে শত শত মানুষ অংশ নিয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিসি। ভারমন্ট রাজ্যে পরিবার নিয়ে অবকাশ পালনে যাওয়া দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও তার পরিবারের সদস্যদের অজ্ঞাত স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভারমন্টের ওয়েটসফিল্ডে ইউক্রেনের সমর্থনে লেখা নানা স্লোগান, প্রতীক ও প্ল্যাকার্ড হাতে দেখা গেছে বিক্ষোভকারীদের। যদিও ওয়েটসফিল্ডে এই বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছিল জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের আগেই। তবে শনিবারের কর্মসূচিতে থাকা প্ল্যাকার্ড, ব্যানারে ওভাল অফিসের বৈঠকের বিষয়ই বেশি অগ্রাধিকার পেয়েছে। রাজ্যটিতে এই বিক্ষোভের আয়োজন করেছিল ইন্ডিভিজিবল ম্যাড রিভার ভ্যালি। সংস্থাটির মুখপাত্র জুডি ডেলি বলেন, শুক্রবার হোয়াইট হাউজের নেতিবাচক কাণ্ড আরও বেশি মানুষকে আজ বিক্ষোভে টেনে এনেছে। কোরি গিরক্স নামের আরেক বিক্ষোভকারী বলেন, ভ্যান্সই সীমা অতিক্রম করেছিলেন।
ইউক্রেনে হামলা : ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর ক্রামাতোরস্কে রাতভর রাশিয়ার গোলাবর্ষণে এক ব্যক্তি নিহত এবং আরও দুইজন আহত হয়েছেন। রবিবার ইউক্রেনীয় কর্র্তৃপক্ষ জানায়, রুশ বাহিনী রাতভর ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর ৭৯টি ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে ৬৩টি ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিট ড্রোন ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি দেশটির বিমান বাহিনীর। দক্ষিণ-পশ্চিম ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়ায় রাশিয়ার এক ড্রোন হামলায় এক বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ওই অঞ্চলের গভর্নর ইভান ফেদোরভ।
