মুসলিমদের জন্য রমজান মাস বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী রোজা রাখা হয়। তবে, সংস্কৃতিভেদে বিভিন্ন দেশে কিছু আলাদা রীতি পালন করা হয়ে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এমন কিছু রীতি নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব
তুরস্কের দাভুল
রমজানের সাহরির সময় মানুষজনকে জাগিয়ে তোলার একটা অদ্ভুত ও মজাদার ঐতিহ্য অনেক দেশের মধ্যে দেখা যায়। বাংলাদেশে যেমন মসজিদের মাইক দিয়ে ‘সাহরির সময় হয়েছে, উঠুন, বলে ডাক পড়ে, তেমনি বিশে^র অন্য প্রান্তেও সাহরিতে জাগানো হয় ভিন্ন আর আকর্ষণীয় উপায়ে।
তুরস্কে এই প্রথাটি সত্যি রাজকীয়। সেখানে ‘দাভুল’ নামে এক বিশাল ঢোল বাজিয়ে শহরের অলিগলিতে ঘুরে সাহরির সময়ে জাগানো হয়। সেই ঢোলের শব্দ শুনে যে কেউ ঘুম থেকে উঠে সাহরির প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।তারা এর বিনিময়ে বকশিশও পায়। একদম পুরনো ঐতিহ্য। আর সাহরি শেষে, তুর্কি জাগোয়া বন্ধুদের একসঙ্গে খাবারের জন্য আমন্ত্রণ জানাতে ভুলে না মনে মনে সবাই জানে, খাবারের পরপরই বিশাল এক আনন্দের সময় আসবে।
এ ছাড়া আলবেনিয়ার রোমা মুসলিমদেরও এক আলাদা রীতি রয়েছে। সেখানে তারা ‘লোদ্রা’ নামে এক বিশেষ ড্রাম ব্যবহার করে, যেটি ভেড়া বা ছাগলের চামড়ায় মোড়ানো থাকে। আর এই ড্রামের সঙ্গে গীতিনাট্য ও খোশমেজাজে এক অন্যরকম পরিবেশ তৈরি হয়। রমজানে দিনের শুরু আর শেষ ঘোষণা করার সময় এই চর্চা তাদের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এভাবে রমজানের সময় পৃথিবী জুড়ে নানা দেশে নানা রীতিতে সাহরির সময়ে জাগানো হয় কখনো ঢোল, কখনো মাইক, কখনো গান, কখনো আবার চমৎকার গীতিনাট্য।
মিসর, জর্ডান ও মরক্কোর নাফারস
রমজানের সময় মিসর, জর্ডান এবং মরক্কোতে যে ঐতিহ্যগুলো রয়েছে, তা একেবারে চমকপ্রদ এবং মজাদার। মিসর ও জর্ডানে সাহরির আগে বিশেষ কিছু মানুষ প্রতিবেশীদের ঘুম থেকে ওঠানোর জন্য এলাকায় ঘুরে ঘুরে ডাক দেন। তাদের বলা হয়, মেসাহারাতি, যারা ঢোলের মৃদু শব্দের সঙ্গে ‘সাহরি খাওয়ার সময় হয়ে গেছে।’ বলে ঘুম ভাঙান। একটু মিষ্টি আওয়াজের সঙ্গে এই কাজ করতে তারা একেবারে পটু।
এদিকে মরক্কোতে এই কাজ করেন ‘নাফারস’ নামে কিছু লোক। তারা ঐতিহ্যবাহী পোশাক যেমন গান্দোরা, টুপি এবং একজোড়া চপ্পল পরে ধীরগতিতে হাঁটতে হাঁটতে শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে সাহরি সময় ঘোষণা করেন। রমজানের শেষ রাতে এই ‘নাফারস’দের সম্মানীও দেওয়া হয়, যাতে তারা তাদের ঐতিহ্য বজায় রাখতে পারেন। মরক্কোর এই দৃশ্য সত্যিই এক অদ্ভুত রঙিন ঐতিহ্য।
আর মিসরে রমজানের সবচেয়ে রঙিন ঐতিহ্য, ‘ফানুস’। এই রঙিন লণ্ঠনগুলো মিসরের রাস্তাঘাট, বাড়ি আর পাড়াকে আলোকিত করে, যেন পুরো শহর রমজানের আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এটি শুরু হয়েছিল ফাতেমীয় সাম্রাজ্য থেকে, যখন খেলাফত আল-মুই লি-দিন আল্লাহ কায়রোতে এসে রঙিন ফানুস দিয়ে স্বাগত পেতেন। আজকাল মিসরের এই লণ্ঠনটি রমজানের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর তার বিচিত্র নকশা পৃথিবী জুড়ে পরিচিত।
ইন্দোনেশিয়ার পাদুসান
ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপের মুসলমানদের রমজানের প্রস্তুতি নিয়ে একটি মজার ঐতিহ্য রয়েছে, যা হলো ‘পাদুসান’। এই পদ্ধতির মাধ্যমে, রমজানের আগে মুসলমানরা প্রাকৃতিক পুকুরে গিয়ে এক বড় গোসল সেরে নিজেদের শুদ্ধ করেন।
এটা শুধু শরীরের শুদ্ধতা নয়, বরং আত্মিক শুদ্ধতারও ব্যাপার। তবে আধুনিক যুগে অনেকেই আর পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ে গোসল করেন না। অনেকেই ভাবেন, ‘বাড়িতেই তো স্নানটা হয়ে যাচ্ছে, তা আর পুকুরে গিয়ে কষ্ট কেন?’ কিন্তু পুরনো পদ্ধতি এখনো অনেকের মধ্যে চলছে আর পাদুসান করা মানেই যেন রমজানের পবিত্রতা শুরু।
হক আল লায়লা
রমজান শুরু হওয়ার আগেই সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি বিশেষ উৎসব শুরু হয়, যেটির নাম ‘হক আল লায়লা’। এই আয়োজনটা মূলত শিশুদের জন্য, যারা শাবান মাসের ১৫ তারিখে রঙিন পোশাক পরে প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মিষ্টি সংগ্রহ করে। আর তখন তারা সুর করে গায়, ‘আতোনা আল্লাহ ইউতিকোম, বাইত মক্কা ইউদিকুম,’ যার মানে, ‘আপনারা আমাদের দিন, আল্লাহ আপনাদের পুরস্কৃত করবেন এবং মক্কা পরিদর্শনের তৌফিক দেবেন।’
পুরো পাড়া তখন উৎসবের রঙে রাঙিয়ে ওঠে। আর এই ‘হক আল লায়লা’ শুধু আমিরাতেই নয়, কুয়েতেও রমজান শুরুর সময় এমনকি মাঝখানে তিন দিনব্যাপী চলে, যেখানে শিশুরা গানের সঙ্গে মিষ্টি এবং চকলেট সংগ্রহ করে। কুয়েতে একে ‘গারগিয়ান’ বলা হয়। কে না চাইবে, এমন মিষ্টি মিষ্টি গানের সঙ্গে রমজান আসুক?
মেহাবেস
রমজানে ইরাকিরা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মাঝেও একটু মজা করার সুযোগ পায়, আর সেটা আসে তাদের ঐতিহ্যবাহী খেলা ‘মেহাবেস’ বা আংটি খেলায়। খেলাটা বেশ জমজমাট ৪০ থেকে ২৫০ জন পর্যন্ত অংশ নিতে পারে। এক দল আংটি লুকিয়ে রাখে, আর অন্য দলকে অনুমান করতে হয় সেটা কার কাছে আছে। বাড়ির বাইরে পুরুষরা খেললেও, ঘরের মধ্যে নারীরাও এই খেলায় অংশ নেন। রমজানে একটু আনন্দ-যুদ্ধের কারণে বন্ধ হলেও, এখন আবার ফিরেছে এই ঐতিহ্য। ইফতার হয়ে গেল, আর আংটি খুঁজতে শুরু।
কামানের তোপধ্বনি
লেবাননে রমজানের সময় কামানের তোপধ্বনি দিয়ে ইফতারের সময় জানানো হয়, যা সম্ভবত বিশ্বের প্রাচীনতম রমজানের ঐতিহ্যগুলোর একটি। একবার এক রমজানে মিসরের শাসক এক দুর্ঘটনায় সূর্যাস্তের সময় কামানের গোলা ছুড়ে ফেলেছিলেন এবং সারা কায়রো শহর জুড়ে এই শব্দের প্রতিধ্বনি হতে থাকে। লোকজন এটাকে রোজা শেষ হওয়ার সংকেত মনে করে আনন্দিত হয়ে ওঠে। এবং সেই ‘ভুল’ পরে ঐতিহ্যে পরিণত হয়। ২০০ বছর পরেও এই চমৎকার প্রথা লেবানন ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে অব্যাহত রয়েছে, যাকে ‘মিদফা আল ইফতার’ বলা হয়। আজও লেবাননে ১৯শ শতকের বিশেষ একটি কামান রয়েছে, যা শুধু ইফতারের সময় তোপধ্বনি দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে একসময় কামান অস্ত্র হিসেবে বাজেয়াপ্ত করা হলে, এই ঐতিহ্য হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধের পর লেবানিজ সেনাবাহিনী আবার কামানকে পুনরায় ‘ইফতার সংকেত’ হিসেবে ফিরিয়ে আনে এবং এখনো চলমান এই ঐতিহ্য। তবে শুধু লেবানন নয়, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও সাহরি ও ইফতারের সময় কামানের তোপধ্বনি দেওয়া হয়।
মরক্কোর রমজানের প্রাণ
মরক্কোর রমজান শুরু হওয়ার ২-৩ সপ্তাহ আগেই এক অবাক প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় ঘরের কোণে কোণে নতুন রঙ, রান্নাঘরের সব কিছু চকচকে আর বাড়ির চারদিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। মনে হয় যেন পুরো শহর এক বিশাল খাবারের বাজারে পরিণত হয়ে যায়। আর ইফতার তো এক ব্যাপারই। মরক্কোতে এটাকে বলে ‘এফতোর’, আর এখানকার মানুষ একটু সময় নিয়ে, হ্যাঁ, একদম ধীরেসুস্থে ইফতার করেন। রিজ্জা, ক্রাচেল, মিসসামেন, হারিরা এগুলো ছাড়াও আরও কত কত ঐতিহ্যবাহী খাবারের আমেজ।
এদিকে মরক্কোর রাস্তায় আর অলিগলিতে একটা বিশেষ মিশন শুরু হয় সাহরির আগের রাত থেকে। ‘নাফর’ নামক একদল মানুষ তারা স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত হন মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে, মাথায় টুপি, পায়ে জুতা, আর সুরেলা গলায় প্রার্থনা গেয়ে সুরে সুরে অলিগলি ঘুরে ঘুরে সবাইকে জাগিয়ে তোলেন। তাদের তো আর ঠেকানো যায় না। রমজানের শেষে নাফরদের মিষ্টি পুরস্কৃতও করা হয়।
ব্রুনাইয়ের সোংকাই
ব্রুনাইতে ইফতার শুধু খাবার নয়, এটা একেবারে উৎসবের মতো। এখানকার স্থানীয় ভাষায় ইফতারকে বলা হয় ‘সোংকাই’, যা সাধারণত গ্রামীণ মসজিদগুলোতে আয়োজন করা হয়। সরকার ও স্থানীয়রা মিলে দারুণভাবে এই আয়োজন সম্পন্ন করে।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এখানে ইফতারের সময় জানানোর জন্য কেউ মাইক নিয়ে হাঁকডাক করে না, বরং বাজানো হয় ‘বেদুক’ নামে এক ধরনের বিশাল ঢোল। ঢোলের গমগমে শব্দ শুনলেই সবাই বুঝে যায় ‘এই সময় হয়ে গেছে, খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হও।’ আর রাজধানী বন্দর সেরি বেগাওয়ানে ব্যাপারটা আরও নাটকীয় সোজা কামান থেকে গুলি ছুড়ে ঘোষণা করা হয় যে ইফতার শুরু হয়েছে। সময় দেখার ঝামেলা নেই, শুধু অপেক্ষা একটা বিশাল ধামাকার।
দেশ-বিদেশের আইনি বাধ্যবাধকতা : রোজার মাসে নিয়ম ভাঙলেই শাস্তি। কিছু কিছু মুসলিম দেশে রমজানে রোজা রাখা শুধু ধর্মীয় অনুশাসনই নয়, বরং আইনও বটে। শরিয়তের ওজর ছাড়া প্রকাশ্যে রোজা না রাখার কথা ভাবাই যায় না।
সৌদি আরব : এখানে রমজানে রোজা না রাখা এক প্রকার ‘অসম্ভব চিন্তা’। শরিয়তের ওজর ছাড়া দিনের বেলায় পানাহার বা ধূমপানের কথা কল্পনাও করা যায় না।
মিসর : রমজান মাসে মদ বিক্রি পুরোপুরি নিষিদ্ধ, কেউ চাইলেও পাবেন না।
কুয়েত : দিনের বেলায় কেউ প্রকাশ্যে খেলে বা ধূমপান করলে সর্বোচ্চ ১০০ কুয়েতি দিনার জরিমানা অথবা এক মাসের কারাদণ্ড বা দুটিই একসঙ্গে হতে পারে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত : প্রকাশ্যে খেলে ১৫০ ঘণ্টার কমিউনিটি সার্ভিস করতে হবে, মানে বিনা পারিশ্রমিকে সমাজের বিভিন্ন কাজ করতে হবে।
মালয়েশিয়া : এখানে ধর্মীয় পুলিশ আছে। রোজার দিনে প্রকাশ্যে খেলে তারা ধরে নিয়ে যায়, আর যারা খাবার বিক্রি করবে, তাদের জন্য রয়েছে ১০০০ রিঙ্গিত জরিমানা ও ৬ মাসের জেল।
আলজেরিয়া : রমজানে রোজা না রাখলে হতে পারে অর্থদণ্ড বা কারাদণ্ড, কারণ সেখানে এটি আইনিভাবে বাধ্যতামূলক।
সুতরাং এসব দেশে গিয়ে কেউ যদি ‘আজকে একটু খেয়ে নিই’ বলে ভাবেন, তবে সাবধান। কারণ রোজা রাখা না রাখার সিদ্ধান্ত আপনার হতে পারে, কিন্তু আইন ভাঙলে শাস্তি এড়ানোর সিদ্ধান্ত আপনার হাতে নেই।
